ক্রিকেট নিয়ে রাজনীতি, না বিচক্ষণ চিন্তার ঘাটতি

মার্কিন রাষ্ট্রনায়ক ও বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছিলেন, ‘ক্রোধে যার শুরু, লজ্জায় তার শেষ।’ কথাটা যদি আমাদের ক্রিকেটকর্তারা উপলব্ধি করতেন, তাহলে গত কদিনের ‘ক্রিকেট-পীড়ন’ থেকে আমরা রক্ষা পেতাম। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের যাওয়া নিয়ে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে বাংলাদেশ দল যদি শেষ পর্যন্ত ভারতে খেলতে যেত, সেটা হতো খুব লজ্জার। বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়াটাও অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অনেকে বলবেন, যেভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটাও কম লজ্জার নয়।

ক্রিকেট অনুরাগীদের বাইরেও অনেককে ক্রিকেট নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়। আছে ক্রিকেট আমলা ও ক্রিকেট বোর্ড, তাদের কথামতোই দেশের ক্রিকেট চলে। তার ওপর আছেন ক্রীড়ামন্ত্রী বা উপদেষ্টা, তাঁরা ক্রিকেট নিয়ে ‘ফাইনাল কথা’ বলেন, যাঁর ওপর অন্যরা আর কিছু বলতে পারেন না।

আরও একদল লোক আছেন। তাঁরা মনে করেন, নিজের দেশের ‘মান-সম্মান ও ক্রিকেটের ভালো-মন্দ’ তাঁরাই সবচেয়ে ভালো বোঝেন। আজকাল অনেক দেশের মতো ভারতেও তাঁদের দৌরাত্ম্য বেশি দেখা যাচ্ছে। সেখানে এ ধরনের লোকদেরই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রথম গুগলিটা ছুড়তে দেখা গেছে।

আইপিএল নিলামে ৯ কোটি রুপি দিয়ে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) মোস্তাফিজকে কিনেছিল। এরপরই ভারতের আধ্যাত্মিক গুরু দেবকীনন্দন ঠাকুর মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে সোচ্চার হলেন। শুধু দেবকীনন্দনই নন, ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থক বেশ কয়েকজন হিন্দুত্ববাদী নেতাও একযোগে জানিয়ে দিলেন, আইপিএলে যদি বাংলাদেশি কেউ খেলেন, তাহলে তাঁরা খেলার মাঠের পিচ নষ্ট করে দেবেন।

এ অঞ্চলের সব ক্রিকেট বোর্ডই রাজনীতিবিদদের কথায় ওঠবস করে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডও তা-ই। তারা মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার জন্য কেকেআরকে বাধ্য করে। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের ক্রিকেটভক্ত জনগণ ও বাংলাদেশের ক্রিকেটের নেতারা ক্রোধে ফেটে পড়লেন। মোস্তাফিজকে যখন আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়, তখন বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া (বিসিসিআই) কোনো কারণ দেখায়নি। সবাই যে যাঁর মতো করে কারণ আন্দাজ করে নিয়েছেন।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের দায়িত্ব ছিল কারণটা জেনে নেওয়া। কারণটা জেনে নিলে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের জন্য প্রতিকার খোঁজা সহজ হতো। বাংলাদেশের ক্রিকেটকর্তারা সংকট ও সমাধানটা আইপিএল ও দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারতেন; অন্তত চেষ্টা করতে পারতেন। কিন্তু কারণ নির্ণয় না করে, দুই বোর্ডের সমঝোতার চেষ্টা না করে, বাংলাদেশের ক্রিকেটকর্তারা আইপিএল ও বিশ্বকাপ খেলাকে গুলিয়ে ফেললেন। তার সঙ্গে যুক্ত হলো রাজনৈতিক স্লোগান, ‘গোলামির দিন শেষ’। মোস্তাফিজের আইপিএল খেলা না-খেলার সঙ্গে ‘গোলামির’ সম্পর্ক কী, সেটা সত্যি ভাবার বিষয়।

বিশ্বকাপে ভারতে আমাদের ক্রিকেটারদের পাঠানো নিরাপদ কি না কিংবা ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে দেশের কোনো অসম্মান হবে কি না, সেই বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। কিন্তু সেগুলোকে রাজনীতির সঙ্গে না গুলিয়ে বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে, পদ্ধতিগতভাবে আরও বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেত। ক্রিকেটের লাভ-ক্ষতি, দলের নিরাপত্তা ও দেশের সম্মান—সবই অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ ভারতে যাচ্ছে না এবং টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলছে না। ভারতের উগ্রপন্থীদের দ্বিগুণ বিজয় হলো। তারা চেয়েছিল মোস্তাফিজকে আইপিএলের বাইরে রাখতে, এখন তারা বাংলাদেশ দলকেই বিশ্বকাপের বাইরে ছিটকে ফেলে দিল। একেই বলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা।

আমাদের ক্রীড়া উপদেষ্টা ঘোষণা করলেন, বাংলাদেশ দল ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর ফলাফল কী হতে পারে, তা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা শোনা গেল না। প্রশ্ন তুললে কী হয় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। ক্রিকেটের স্বার্থের কথা বলতে গিয়ে তিনি ‘ভারতীয় দালাল’ হয়ে গেলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের ক্রিকেটাররা স্থানীয় খেলা বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যদিও সাময়িকভাবে তাঁরা মাঠে নেমেছেন, তবে খেলোয়াড়েরা দারুণ ক্ষুব্ধ। আমাদের ক্রিকেট অভিভাবকদের কারণে শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নয়, ঘরোয়া ক্রিকেটও হুমকির মুখে!

ক্রিকেট-রাজনীতির এসব জটলায় বিশ্বকাপে না খেললে বাংলাদেশ ক্রিকেটের কী লাভ-ক্ষতি হবে, তা কারও বিবেচনায় এল না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) যাঁরা কর্মকর্তা, তাঁরা সবাই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অ্যালামনাই। আইসিসির চেয়ারম্যান জয় শাহ ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে। তাঁরা যে বাংলাদেশের অনুরোধে কোনো পাত্তা দেবেন না, বিষয়টি সবার আগে বোঝা উচিত ছিল।

আইপিএলে মোস্তাফিজ। চেন্নাই সুপার কিংস
ফাইল ছবি

আইসিসির সর্বমোট রাজস্বের ৮০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। মোট ৩৮ শতাংশ অবশ্য ভারত পায়। এটা কোনো অজানা কথা নয়, বিসিসিআই যে বিশাল আর্থিক অনুদান আইসিসিকে দেয়, তার বিনিময়ে ভারতীয় বোর্ড আইসিসির সময়সূচি, রাজস্ব বিতরণ এবং টুর্নামেন্ট আয়োজনের বিষয়ে সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করে। ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোকে এসব মেনে চলতে হয়। ক্রিকেট নিয়ে ভারতের ‘জমিদারি’ আচরণ নতুন কিছু নয়।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ২০২৫ সালের ১৭ জুন ক্রিকেট নিয়ে একটা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শিরোনাম ছিল, ‘ভারত ক্রিকেটবিশ্বে রাজত্ব করছে, কিন্তু তাদের এই আধিপত্য কি খেলার জন্য ভালো?’ তাতে বলা হয়েছে, ‘ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে এই ক্রমবর্ধমান বিশ্বাসের কারণে যে ভারত, যারা আইসিসি দ্বারা অর্জিত মোট রাজস্বের প্রায় ৪০ শতাংশ পায়, তারা খেলার সার্বিক মঙ্গলের বৃহত্তর দায়িত্বের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে ক্রমে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।’

অনেককেই বলতে শোনা গেছে, বিশ্বকাপে না গেলে দেশের ক্রিকেটের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। আমাদের ক্রিকেটের জাঁকজমক চাকচিক্যের বিরাট রাজস্ব আসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে, বিশেষ করে আইসিসি থেকে। আর আন্তর্জাতিক মর্যাদার এই অবস্থানে পৌঁছাতে সবচেয়ে বড় অবদান হলো দেশের ক্রিকেটারদের।

আরও পড়ুন

শুধু আর্থিক লোকসানের কথা চিন্তা করলে লম্বা টাকাকড়ির হিসাব বের হয়ে আসবে। বিশ্বকাপে প্রস্তুতির জন্য আইসিসির কাছ থেকে এরই মধ্যে পাঁচ লাখ ডলার পেয়ে গেছে বিসিবি। বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়াতে আশা করি আইসিসি এই টাকা ফেরত চাইবে না।

বিশ্বকাপে পয়েন্ট তালিকার ভিত্তিতে দলের জন্য যে প্রাইজমানি, বাংলাদেশ তা-ও হারাবে। আইসিসির রাজস্ব বণ্টন খাত থেকে বাংলাদেশ যে ২৬ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার পায়, সেটাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আর্থিক ক্ষতি হবে ক্রিকেটারদেরও। কারণ, বিশ্বকাপ থেকে প্রাইজমানি এবং ম্যাচ ফি হিসেবে যে টাকা পেতেন খেলোয়াড়েরা, সেটি তাঁরা পাবেন না। প্রতিটি খেলায় ক্রিকেটাররা ম্যাচ ফি পান।

এত কিছুর মধ্যে ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দল ভারতীয় টিমের বিরুদ্ধে জিম্বাবুয়ের বুলাওয়েতে আইসিসি অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলেছে। সেখানে খেলায় বাংলাদেশের অধিনায়ক জাওয়াদ আবরার খেলার আগে ভারতীয় অধিনায়কের সঙ্গে হাত মেলাননি। বিসিবি এর অনেক লম্বা-চওড়া ব্যাখ্যা দিয়েছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ভারতে যাচ্ছে না এবং টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলছে না। ভারতের উগ্রপন্থীদের দ্বিগুণ বিজয় হলো। তারা চেয়েছিল মোস্তাফিজকে আইপিএলের বাইরে রাখতে, এখন তারা বাংলাদেশ দলকেই বিশ্বকাপের বাইরে ছিটকে ফেলে দিল। একেই বলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা। বিশ্বকাপে খেলতে যেতে না পারাতে খেলোয়াড়দের মনোভাব ও মনোবল কেমন, তা সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশের খেলোয়াড়, যাঁদের মুখ বন্ধ, তাঁদের মনের অবস্থা স্বভাবতই তছনছ।

বাংলাদেশের আবেদন বিবেচনা করতে আইসিসি বোর্ড সভায় উপস্থিত ছিলেন আইসিসির ১৫ জন পরিচালক। ভোটাভুটিতে বাংলাদেশের পক্ষে মাত্র এক ভোট পড়েছে। শুধু পাকিস্তান বাংলাদেশের আবেদনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। প্রশ্ন করা যেতে পারে, বাংলাদেশের দাবি নিয়ে আমাদের ক্রিকেটকর্তারা কেন অন্য কোনো দেশ থেকে সমর্থন আদায় করতে পারেননি?

এখন বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের একমাত্র বন্ধু পাকিস্তান। সবচেয়ে বড় শঙ্কা, বাংলাদেশ ক্রিকেটকে হয়তো পাকিস্তানের মতো একঘরে হয়ে থাকতে হবে বহুদিন। পাকিস্তান খুশি, একজন সাথি পেয়ে। কিন্তু আমাদের কি খুশি হওয়ার কোনো কারণ আছে?

  • সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব