বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ডুর্খেইম বলেছেন, যত দিন সমাজের অস্তিত্ব থাকবে তত দিন সমাজে অপরাধের উপস্থিতি থাকবে। এ বিষয়টি অনুধাবন করেই সরকারের উচিত জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সমাজবদ্ধ মানুষগুলো আবার বিভিন্ন কারণে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।
সিজার বেকারিয়া বলেছেন, মানুষ সাধারণত ফ্রি উইলের (ব্যক্তিগত ইচ্ছা বা অনিচ্ছা) কারণে অপরাধ করে থাকে। ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বাতন্ত্র্যবোধ থেকে মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার পরবর্তী ধাপেই অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
বেকারিয়া আরও বলেছেন, মানুষ সাধারণত লাভ–ক্ষতির হিসাব নির্ধারণ করেই অপরাধের সঙ্গে নিজেদের জড়ায়। অর্থাৎ ক্ষতির তুলনায় লাভ বেশি হলে মানুষ অপরাধে জড়ায়, ঠিক তেমনিভাবে লাভের তুলনায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি হলে মানুষ উক্ত অপরাধে জড়ায় না। আবার রাষ্ট্রসমূহ অপরাধকে নিরাময় করতে নানাবিধ কৌশল ও উদ্ভাবন রপ্ত করেছে। এমন সব কৌশল উদ্ভাবন করা উচিত, যেখানে অপরাধীদের অপরাধ সংঘটনে লাভের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপরাধীদের অনুপ্রবেশ একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরাধীরা কেবল অনুপ্রবেশেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, রাজনৈতিক দলের সমর্থনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কেউ কেউ আবার নির্বাচিত হয়ে জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করছে। শুধু তা–ই নয়, দলে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যে এ শ্রেণিটির বলয় ও প্রভাব রাজনৈতিক দলে বৃদ্ধি পায়। এই শ্রেণির রাজনীতিবিদদের কারণেই সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে পড়ছে এবং তাদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের একটি বোঝাপড়া থাকে।
এ ধরনের উদাহরণ বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতির জন্য অশনিসংকেত। একবার এক প্রবীণ রাজনীতিবিদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই, রাজনীতি চলে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে। একেবারে তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত অপরাধীদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে সবাইকে ঐকমত্যে আসতে হবে। এ ছাড়া কোনোভাবেই রাজনীতিতে অপরাধীদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করা যাবে না।
অন্যদিকে দেখা যায় রাজনীতির স্বাভাবিক গতিধারা ক্রমান্বয়ে কলুষিত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র মেনে দলগুলো পরিচালিত হচ্ছে না। অর্থের বিনিময়ে দলীয় পদগুলো বিভাজিত হচ্ছে। দলীয় গঠনতন্ত্র মেনে দল পরিচালিত হচ্ছে না। শীর্ষ পদগুলোতে ইলেকশনের তুলনায় সিলেকশন জারি আছে।
রাজনীতি কলুষিত হওয়ায় রাজনীতিবিদদের অর্থের বিনিময়ে খুব সহজেই কবজা করা যায়। জনশ্রুতি রয়েছে, রাজনৈতিক দলে অর্থের প্রভাব বেড়েই চলছে। এ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ছে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধপ্রবণতার জন্য একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। দেখা যাচ্ছে, একের পর এক অপরাধের ঘটনা ঘটেই চলছে; কিন্তু অপরাধীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এ ধরনের উদাহরণ কেবলমাত্র অপরাধীদের প্রলুব্ধ করছে না বরং সাধারণ মানুষের মনে সন্ত্রাসীদের সম্বন্ধে ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি করে, আতঙ্ক তৈরি করে সাধারণ মানুষের মনে। ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে নির্বিঘ্নে ঘরে ফেরত আসার পরিবেশ চায় মানুষ, এর হেরফের মূলত তখনই হয় যখন সন্ত্রাসীদের আস্ফালন চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
সন্ত্রাসীদের ভয়ে মানুষ অপরাধের তথ্য পুলিশের কাছে প্রেরণ করছে না। কেননা যে বা যারাই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করছে, পরবর্তী সময়ে তাদের অবর্ণনীয় নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়।
রাজনীতিতে অপরাধীদের নিষিদ্ধ করতে হবে, যেসব রাজনীতিবিদ অপরাধীদের আশ্রয়–প্রশ্রয় দিয়ে থাকে তাদের বিরুদ্ধে স্ব স্ব দল থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, আইনানুগ কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি প্রদান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে থাকে সন্ত্রাসীরা, অনেক সময় দেখা যায় চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধপ্রবণতায় জড়িয়ে পড়ে। তারা ক্রিমিনোজেনিক কালচার থেকে বের হয়ে আসতে পারে না, সমাজে অপরাধ সংঘটিত করার সুযোগ থাকায় সন্ত্রাসীরা অধিক লাভের আশায় অপরাধকে বেছে নেয়।
আবার দেখা যায় যারা প্রথম পর্যায়ের, মানে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা কারাগারে থাকলেও তাদের গ্রুপের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মীদের দ্বারা দল পরিচালনা করে থাকে। শীর্ষ সন্ত্রাসী জেলখানায় থাকলে তাদের দোসররা তাদের কাজকর্ম ঠিকই চালিয়ে নেয়।
এ শিকলকে ভাঙার চেষ্টা করতে হবে, সাধারণ মানুষ ভয়ে তাদের নিকট জিম্মি থাকে। মুখ খুলতে গেলে বিপদের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে অপরাধকে দেখেও না দেখার ভান করে সহ্য করে থাকে। সামাজিকভাবে অপরাধকে মোকাবিলা করার কোনো চেষ্টা করা হয় না। চোখের সামনে অপরাধ হলেও মানুষ সেটি নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করে না, বরং সেটিকে সহ্য করে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে অপরাধীদের সঙ্গে কিছু পুলিশ কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। সাধারণ মানুষ মনে করে ও বিশ্বাস রাখে যে রাষ্ট্র থেকে ক্ষমতাধর কেউ হতে পারে না। আর রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে দায়িত্বশীলদের কাজই হচ্ছে যথাযথ দায়িত্ব পালন করা। এই দায়িত্ব পালনকালে যাঁরা নিজেদের কর্তব্য থেকে চ্যুত হয়ে পড়েন, তাঁদের মাধ্যমেই সন্ত্রাসীরা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। তাঁদের চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয়ভাবে শাস্তির মুখোমুখি করা উচিত।
সন্ত্রাসবাদ কর্মকাণ্ডগুলো সাধারণত পূর্বপরিকল্পিত এবং রাজনৈতিকভাবে মদদপুষ্ট হয়ে থাকে। সন্ত্রাসীদের একটি বিশেষ লক্ষ্য হচ্ছে, তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারের নজরে আসা এবং সরকারকে মধ্যস্থতায় বসতে বাধ্য করে যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করা যায়।
এ ধরনের দেন–দরবার প্রকাশ্যে না ঘটলেও সন্ত্রাসবাদ সংজ্ঞায়নে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন তার মানে এটির অস্তিত্ব রয়েছে। তা ছাড়া কিছু রাজনীতিবিদের সঙ্গে অপরাধীদের যোগসূত্রতার খবরও বিভিন্ন সময়ে দেখা গিয়েছে। স্থানীয় প্রভাব প্রতিপত্তি ধরে রাখা কিংবা প্রতিপক্ষ দমনের জন্যই অনেক রাজনীতিবিদ সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দিয়ে থাকে। এ ধরনের ঘটনার নজির রাজনীতিতে রয়েছে, যার কারণে অনেক সময় দাগি আসামি বা চিহ্নিত আসামিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে আশ্রয় গ্রহণ করে। এ ধরনের উদাহরণ যে বাংলাদেশে একেবারে নেই কিংবা ছিল না তা কিন্তু নির্দ্বিধায় বলা যাবে না।
বিভিন্ন সময়ে থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাওয়ায় সন্ত্রাসীরা ক্রমে বেপরোয়া হয়ে পড়ছে। প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে, সাধারণ মানুষ ভয়ে পুলিশের সামনে মুখ খুলছে না। প্রয়োজনীয় আলামতের অভাবে অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারছে না পুলিশ, আবার অনেক সময় মামলাও হচ্ছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে জামিন নিয়ে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে যুক্ত হয়ে পড়ছে সন্ত্রাসীরা।
এ ছাড়া অস্ত্রের সহজলভ্যতা, অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামাদির প্রতুলতা অপরাধীদের ক্রমে ভয়ংকর করে তুলছে। চাঁদাবাজিতে সন্ত্রাসীরা সামান্য বাধাগ্রস্ত হলেই মানুষকে অস্ত্র দিয়ে হত্যা করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচিত হবে, সন্ত্রাসবাদে যারা যুক্ত হচ্ছে তাদের যুক্ত হওয়ার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে সমস্যার সমাধানে মনোনিবেশ করা, তাহলেই একটি নির্দিষ্ট সময় পরে দেখা যাবে বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদের হুমকি থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে আসবে।
সাধারণত মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, হতাশা এবং সমাজের নিয়মকানুনের প্রতি অশ্রদ্ধা থেকেই সন্ত্রাসবাদে সম্পৃক্ত হওয়ার নজির সুস্পষ্ট। সমাজে বসবাস করার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষকে সামাজিক জীব হয়ে বসবাস করতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় তাকে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রীতি, রেওয়াজ, নিয়ম, অনুশাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এ নিয়মগুলো প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে একজন মানুষ সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে সামাজিক মানুষ হিসেবে পরিচিতি পায়। যে মানুষের মধ্যে এ ধরনের অনুশাসনের অনুপস্থিতি রয়েছে তার মধ্যে অনিয়ম, অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদের বীজ লালিত হয়।
শুধু তা–ই নয়, বিচ্ছিন্নতা মানুষকে ক্রমান্বয়ে সমাজের সব ধরনের সংযুক্তি থেকে দূরে রাখে, বিশেষ করে কোনো ব্যক্তির জীবনে যদি চাওয়া–পাওয়ার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় কিংবা ইনপুট অনুযায়ী আউটপুট অসমান হয় তখনই মূলত ব্যক্তির মধ্যে বিচ্ছিন্নতা চলে আসে এবং মানুষ অপরাধপ্রবণতায় জড়িয়ে পড়ে। আবার অন্যদিকে কর্মহীনতা, বেকারত্ব, রাষ্ট্রের প্রতি অনীহা প্রভূত কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দেয় এবং সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়ে।
সন্ত্রাসীদের শক্ত হাতে দমন করতে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রচলিত আইনে সন্ত্রাসীদের বিচার নিশ্চিত করে সন্ত্রাসীদের মনে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করতে হবে। অপরাধের সুযোগ নষ্ট করে দিতে হবে, অস্ত্রের উৎসমুখ বন্ধ করতে হবে, অর্থের জোগানদাতাদের আইনের মুখোমুখি করতে হবে। রাজনীতিতে অপরাধীদের নিষিদ্ধ করতে হবে, যেসব রাজনীতিবিদ অপরাধীদের আশ্রয়–প্রশ্রয় দিয়ে থাকে তাদের বিরুদ্ধে স্ব স্ব দল থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, আইনানুগ কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি প্রদান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
মো. সাখাওয়াত হোসেন সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব