সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে যা করতে হবে

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের এই গ্রাফিতিছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশ খুব দ্রুতগতিতে ইতিহাস গড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও বিশ্ব একসঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বেদনাদায়ক প্রয়াণ প্রত্যক্ষ করল। এর জন্য আমি তাঁর পরিবার এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

মার্কিন কূটনীতিক হিসেবে বাংলাদেশে আমার ছয় বছরের দায়িত্বকালে (এর মধ্যে তিন বছর ছিলাম রাষ্ট্রদূত হিসেবে) বেগম জিয়া বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন। ওই সময়টাতে খুব সহজেই তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ করার বা যোগাযোগ করার সুযোগ ছিল। তিনি খুব খোলামেলা, আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করতেন। বাংলাদেশের নানা অগ্রগতির বিষয়ে তিনি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অকপটে তুলে ধরতেন। আমি তাঁর আন্তরিকতাকে খুবই মূল্য দিতাম। তাঁর মৃত্যুতে আমি শোকাহত।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ আরও গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস রচনা করছে। কারণ, জুলাই বিপ্লব এখনো এগিয়ে চলেছে। মাঝেমধ্যে বিশ্বাসই হয় না—মাত্র দেড় বছর আগে সাহসী শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে তৎকালীন হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের গভীর হতাশা ও ক্ষোভের কথা প্রকাশ করেছিল। সেই প্রাথমিক আন্দোলনই পরে রক্তক্ষয়ী পাঁচ সপ্তাহের অভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং তার পরিণতিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে চড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা নিজেদের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে দেশকে পথ দেখানোর দায়িত্ব দেন আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে।

এই সংকটময় রূপান্তরকালে দেশকে নেতৃত্ব দিতে ইউনূসকে আহ্বান জানানোর জন্য আমি শিক্ষার্থীদের সাধুবাদ জানাই একই সঙ্গে এই অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং সময়ে নিষ্ঠাবান তত্ত্বাবধান ও নেতৃত্বের জন্য অধ্যাপক ইউনূসকেও অভিনন্দন জানাই।

এখন দেশ অন্তর্বর্তী সরকার থেকে জনগণের সরাসরি নির্বাচিত সরকারের দিকে রূপান্তরের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এটি সম্ভবত পুরো রূপান্তরপর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ, এই নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররাই ঠিক করবেন—কারা ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ভিত্তি গড়ে তুলবেন।

এই নতুন নেতৃত্বই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ কি ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত জন্মের পর থেকে যে স্বৈরাচারী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, সেখানে আবার ফিরে যাবে নাকি তারা একটি নতুন পথ বেছে নিয়ে এমন একটি গণতন্ত্র গড়ে তুলবে, যা প্রকৃত অর্থে অর্থবহ হবে এবং বাংলাদেশের মানুষের প্রজ্ঞা ও লক্ষ্যকে সত্যিকারের কণ্ঠ দেবে। আশা করি, দেশের নবীন নেতারা বাংলাদেশের জনগণের কথা শুনবেন এবং কার্যকর ও টেকসই গণতন্ত্র গড়ার পথে জনগণের ওপর আস্থা রাখবেন।

ভোটাররা যদি জুলাই সনদের পক্ষে রায় দেন, তাহলে আমার মতে নতুন সরকারের উচিত হবে দ্রুত এমন একটি প্রক্রিয়া শুরু করা, যার মাধ্যমে ভোটারদের ইচ্ছা অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরি করা হবে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে সংসদের কাঠামো কেমন হবে, কত মেয়াদের সীমা থাকবে, সংসদ ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য কী হবে, বিভিন্ন সংস্থার স্বাধীনতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে।

আমার দৃষ্টিতে নতুন সরকারকে অবশ্যই জনগণ থেকে দিকনির্দেশনা নিতে হবে। আমি আশাবাদী, ব্যালট বাক্সে বাংলাদেশের ভোটাররা একটি স্পষ্ট বার্তা দেবেন। সেই বার্তা হলো—তাঁরা সৎ ও মানুষের প্রয়োজনের সময় সাড়া দেন, এমন প্রতিনিধিই চান।

নতুন সরকার শুরু থেকেই অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এর মধ্যে দেশে একটি অর্থবহ ও কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি গড়ে তোলা তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। আমার ধারণা, জুলাই সনদ (জুলাই চার্টার) নিয়ে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটে ভোটাররা তাঁদের মতামত স্পষ্টভাবে ভোটের মাধ্যমে জানাবেন। এই জুলাই সনদ রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রায় সব পক্ষের সমর্থন পেয়েছে।

ভোটাররা যদি জুলাই সনদের পক্ষে রায় দেন, তাহলে আমার মতে নতুন সরকারের উচিত হবে দ্রুত এমন একটি প্রক্রিয়া শুরু করা, যার মাধ্যমে ভোটারদের ইচ্ছা অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরি করা হবে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে সংসদের কাঠামো কেমন হবে, কত মেয়াদের সীমা থাকবে, সংসদ ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য কী হবে, বিভিন্ন সংস্থার স্বাধীনতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকবে।

আরও পড়ুন

এ ধরনের মৌলিক পরিবর্তন যদি আন্তরিকভাবে জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ব্যাপক সমর্থন নিয়ে করা যায়, তাহলে তা বাংলাদেশের বিকাশমান গণতন্ত্রকে আরও শক্ত ও সুসংহত করতে পারে। আশা করি, নতুন সরকার এসব পরিবর্তনের পথে এগোতে গিয়ে ব্যাপক ঐকমত্য গড়ে তোলার চেষ্টা করবে এবং সেই তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন এড়িয়ে চলবে, যা আমার নিজের দেশসহ বিশ্বের বহু দেশে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়।

নতুন গণতন্ত্র গড়ে তুলতে গিয়ে নতুন সরকারকে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার নিয়েও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। যেমন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতারা জনগণের বিরুদ্ধে যে বাড়াবাড়ি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তার জন্য তাঁদের কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে? আবার, আওয়ামী লীগের কোটি কোটি সমর্থক, পেছনের সারির নেতা-কর্মী ও সহানুভূতিশীল মানুষদের কীভাবে আবার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা যাবে? এসব প্রশ্নের মীমাংসা করা তখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

আসলে এই প্রশ্নগুলোর সহজ কোনো উত্তর নেই। কিন্তু বাংলাদেশ যদি রাজনীতিতে স্থায়ী বিভাজন এড়াতে চায়, তাহলে এসব প্রশ্নের সমাধান খুঁজতেই হবে। এ ক্ষেত্রে নতুন সরকারকে সৃজনশীল হতে হবে। সম্ভবত দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ-পরবর্তী সময়ে নেলসন ম্যান্ডেলার সরকার যে ‘সত্য ও মীমাংসা প্রক্রিয়া’ (‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন প্রসেস’) চালু করেছিল, তা এসব প্রশ্নের সমাধানে কিছু দিকনির্দেশনা দিতে পারে।

আরও পড়ুন

নতুন বাংলাদেশের সাফল্যের জন্য স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থিতিশীলতা এগিয়ে নিতে নিরাপত্তা একটি স্পষ্ট ও অপরিহার্য বিষয়। নতুন সরকারকে চলমান নিরাপত্তা উদ্বেগ দ্রুততার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মানুষের আস্থা ফিরে পেতে হবে। সে জন্য তাদের পর্যাপ্ত জনবল, ভালো প্রশিক্ষণ এবং সঠিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। আমি বিশ্বাস করি, এটা সম্ভব। তবে এর জন্য নতুন সরকারের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা যেন সৎ হন এবং জনসেবায় আন্তরিক থাকেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্যই এসব কাজ একদিনে সম্ভব নয়।

স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য ধরে রাখার জন্যও অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানি অনেকটাই নির্ভর করে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থার ওপর। ক্রেতারা নিশ্চিত হতে চান যে বাংলাদেশ সময়মতো পণ্য তৈরি ও পাঠাতে পারবে, আর বাজারগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দাবি জানাচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, বিশ্বে অনেক দেশ প্রস্তুত আছে বাংলাদেশের জায়গা নিতে এবং তৈরি পোশাক রপ্তানিতে নেতৃত্ব দিতে। তাই তৈরি পোশাক পণ্যের উৎপাদন ও রপ্তানি প্রক্রিয়া হতে হবে দ্রুত ও দক্ষ।

এই পটভূমিতে চট্টগ্রাম বন্দরের বেসরকারিকরণ নিয়ে নতুন সরকার চাইলে ভাবতে পারে।

নতুন সরকারের কর্মসূচিতে পররাষ্ট্রনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নেবে। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি হলো বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তোলা।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকটাই নির্ভর করবে—ভারত বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম অংশীদার হিসেবে কতটা গুরুত্ব দিয়ে কথা বলে, তার ওপর। একই সঙ্গে নতুন সরকার দিল্লিকে জানাতে পারে, ভারত গঠনমূলকভাবে এগোতে চাইলে বাংলাদেশও সম্পর্ক উন্নয়নে প্রস্তুত।

নতুন সরকারের উচিত পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে চলমান সম্পর্কও বজায় রাখা। আমি বিশেষভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগকে সাধুবাদ জানাই। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার এবং সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী।

ইউনূস ও তাঁর দল বোঝে যে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আছে, যা মূলত লেনদেনভিত্তিক। আমি আশা করি, নতুন সরকার বোয়িংয়ের আরও বিমান কেনা এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ভুট্টা, সয়াবিন ও প্রযুক্তি কেনার অঙ্গীকার বজায় রাখবে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে এভাবে আমদানি বাড়লে বাংলাদেশ উপকৃত হবে। এতে দেশটি রপ্তানিতে অগ্রাধিকারমূলক শুল্কসুবিধা ধরে রাখতে পারবে, এমনকি তা আরও উন্নতও হতে পারে। এই শুল্ক–সুবিধা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জের তালিকা অনেক দীর্ঘ। এর মধ্যে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মতো বড় বিষয়ও রয়েছে। তবে আমার কথা স্পষ্ট—নতুন সরকারকে একের পর এক গভীর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

এই চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করতে হলে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যে দল বা দলগুলোই জিতুক না কেন, নতুন সরকারের প্রয়োজন হবে বাংলাদেশের মানুষের ব্যাপক সমর্থন।

এই চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা নতুন সরকারকে একটি বড় সুযোগও দেয়। এ সুযোগ হলো—বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, স্বৈরশাসন পরিহার করা এবং তার পরিবর্তে এমন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া গড়ে তোলা ও শক্তিশালী করা, যা মানুষের প্রয়োজনের প্রতি সাড়া দেয় এবং কার্যকর শাসন নিশ্চিত করে।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ এর চেয়ে কম কিছুই প্রাপ্য নয়, এবং তারা সেটাই প্রত্যাশা করে।

  • ড্যান মোজেনা বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত

ইংরেজি থেকে অনুবাদ। মতামত লেখকের নিজস্ব