আমরা যারা আশি-নব্বইয়ের দশকে বেড়ে উঠেছি, বোঝার বয়স থেকেই দেখেছি, বাংলাদেশের সরকারপ্রধান একজন নারী। ১৯৯১ সালের স্কুলজীবন থেকে শুরু করে তিন দশকের বেশি সময় ধরে দুই নারী নেত্রীর হাতেই ছিল শাসনভার। দীর্ঘ সময় পর এবার দেশে পুরুষ প্রধানমন্ত্রী। নতুন সরকার, নতুন প্রত্যাশা। অর্ধশত সদস্য নিয়ে গঠিত হয়েছে মন্ত্রিসভা। সংসদের মতোই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিপরিষদেও নারী প্রতিনিধিত্ব খুবই নগণ্য। তারপরও আশাবাদী হতে মন চায়, এই সংখ্যা হয়তো আরও বাড়ানো হবে।
খালেদা জিয়ার প্রথম মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের শেষ মন্ত্রিপরিষদ কিংবা সবশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পর্যন্ত নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কোনো না কোনো নারীর কাঁধেই ছিল। এবার তার ব্যতিক্রম। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তাঁর সঙ্গে আছেন প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন।
দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাসের পর দেশে ফিরে তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনী প্রচারে যেভাবে স্ত্রী ও কন্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা সমাজে একটি নতুন বার্তা দিয়েছে।
পুরুষদের অনেকেই মনে করেন, নারীদের দেখভাল তাঁরা সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারেন। ভোটের মাঠে নারীদের নিয়ে যে ধরনের বাগাড়ম্বর দেখা গেছে, তাতেও সেটাই প্রতীয়মান। মেয়েরা কী পরবে, কী কাজ করবে, কতক্ষণ করবে, কেন করবে, এসব নিয়েও পুরুষদের উদ্বেগই বেশি চোখে পড়ে। অথচ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় নারীদেরই।
তাই ঘরপোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখে শঙ্কিত হয়, তেমনি গত দেড় বছরে নারীর প্রতি সহিংসতার কয়েকটি ঘটনায় হতাশা পিছু ছাড়েনি। ব্যাপক প্রত্যাশাজাগানিয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীশিবিরে গান গেয়ে প্রেরণা জোগানো শারমীন এস মুরশিদ ছিলেন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। তাঁর সময়ে মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় করা ছাড়া বড় কোনো অর্জনের দৃষ্টান্ত সামনে আসেনি। নাম বদলের ঘোষণার পরও ১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল পর্যন্ত ওয়েবসাইটে আগের নামই বহাল ছিল।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করে। লক্ষ্য ছিল—আইনি, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় নারীদের প্রতি বিদ্যমান বৈষম্য পর্যালোচনা করে প্রাসঙ্গিক সংস্কার প্রস্তাবনা প্রণয়ন। এই কমিশন ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে তিন ধাপে মোট ৪৩৩টি সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। প্রথম ধাপে অন্তর্বর্তী সরকারের আওতায় তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ, দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত সরকারের প্রথম পাঁচ বছরে সম্পাদনযোগ্য কার্যক্রম এবং তৃতীয় ধাপে ভবিষ্যৎ নারীবান্ধব রাষ্ট্র গঠনে কৌশলগত স্বপ্ন ও প্রস্তাবনা।
উল্লেখযোগ্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে সংসদে সমানসংখ্যক নারী প্রতিনিধি সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত করা, সব কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়ন ও অভিযোগ কমিটি গঠন, বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ, উত্তরাধিকারে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করতে আইনের সংশোধন, ঐচ্ছিক অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন, ছয় মাসের পূর্ণ বেতনের বাধ্যতামূলক প্রসূতি ও দত্তকজনিত ছুটি, বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি, যৌনকর্মীদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি, গণমাধ্যমে ৫০ শতাংশ নারী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং স্থায়ী নারী কমিশন প্রতিষ্ঠা। উত্তরাধিকার আইনে সমতার বিধান ঐচ্ছিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে রক্ষণশীল গোষ্ঠী সমতার প্রশ্নে ধর্মীয় হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে পুরো কমিশন বাতিলের দাবি জানায়। ফলে এর ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
তবে দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাসের পর দেশে ফিরে তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনী প্রচারে যেভাবে স্ত্রী ও কন্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা সমাজে একটি নতুন বার্তা দিয়েছে। চিকিৎসক স্ত্রী জুবাইদা রহমানের পরামর্শ তিনি গুরুত্বের সঙ্গে নেন, এমন ইঙ্গিত বিভিন্ন বক্তব্যে পাওয়া গেছে। তাঁদের একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও বাবার ওপর প্রভাব রাখেন, সেটিও অনুমেয়।
আশা জাগে, নতুন প্রধানমন্ত্রী শুধু একজন পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, স্ত্রী ও কন্যার চোখ দিয়েও সমাজকে দেখবেন। তবেই হয়তো তাঁর কাছে স্পষ্ট হবে নারীর পথচলার অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতার বেড়াজাল। আজকের দিনে মেয়েরা নিজেরাই জানেন তাঁরা কী চান। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার, কাজ, দায়িত্ব, পরিবার—সবই তাঁরা সামলাতে পারেন। এর উদাহরণ প্রধানমন্ত্রীর নিজের মা-ও রেখে গেছেন। সেই প্রতিফলন আমরা দেখতে চাই নতুন মন্ত্রিসভা ও সংসদে।
নতুন প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, আপনার একটি কন্যাসন্তান আছে, যিনি তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিও। তাঁর চোখে দেখুন দেশের নারী ও তরুণ নাগরিকদের। তাঁদের ভাষা বুঝুন, তাঁদের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিন। তাহলেই হয়তো নতুন অধ্যায়ে সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তির সূচনা হবে।
শায়লা রুখসানা গণমাধ্যমকর্মী
*মতামত লেখকের নিজস্ব