সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে মতদ্বৈততা–সংবলিত লেখাগুলো পড়লাম। আসলে পানির ওপর নির্মিত যেকোনো অবকাঠামো পরিবেশ, তথা জনজীবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে; বিশেষ করে আপনি যখন একটি বদ্বীপ অঞ্চলে বাস করছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাস্তবতার নিরিখে লাভ-ক্ষতির এই বিশ্লেষণ করতে হবে।
২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট প্রথম আলোয় আমি লিখেছিলাম, ‘ভারতের সঙ্গে চুক্তিতে কেন সমাধান সম্ভব নয়, নিজেরা বাঁধ দিলে কী হবে?’। বাঁধ কী, কাকে বলে, বাঁধের ধরনসহ বিস্তারিত বর্ণনা ছিল এতে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পানিচুক্তি নিয়ে দুটিসহ প্রথম আলোয় পানি নিয়ে আমার অন্তত পাঁচটি লেখা আছে।
আমার ধারণা, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকেরই পানি–সম্পর্কিত কিছু সাধারণ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। শুধু তা–ই নয়, আমাদের পাঠ্যপুস্তকে এ বিষয়ে আরও জোর দেওয়া উচিত। প্রয়োজন সুশীল সমাজের মধ্যে এ নিয়ে আরও বিস্তারিত জ্ঞানভিত্তিক আলোচনাও।
হাজার বছরের নদীর বয়ে চলার ইতিহাসের তুলনায় নদী ব্যবস্থাপনা আর নদীতে আধুনিক স্থাপনা নির্মাণের ইতিহাস কিন্তু খুব বেশি দিনের নয়—মাত্র কয়েক শ বছরের। নদীর আড়াআড়ি ‘ড্যাম’ নির্মাণের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, তথা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা ‘ব্যারাজ’ নির্মাণ করে পানির গতিপথ পরিবর্তন—এ দুটি স্থাপনা নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনা হয়ে থাকে।
মানুষের প্রয়োজনেই কিন্তু এই প্রযুক্তিগুলো উদ্ভাবন, আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে পৃথিবীর অনেক দেশে ড্যাম কিংবা ব্যারাজ ভেঙেও ফেলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই প্রায় ২ হাজার ৪০০টি ড্যাম কিংবা ব্যারাজ ভেঙে ফেলছে।
কিন্তু তারপর সেখানে রয়ে গেছে আরও প্রায় ৯২ হাজার ড্যাম কিংবা ব্যারাজ। বলা হয়ে থাকে, ১৯২০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসত জলবিদ্যুৎ থেকে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচব্যবস্থাও গড়ে উঠেছিল এই অবকাঠামোগুলোর ওপর ভিত্তি করে। জাপানের কথাই ধরা যাক। সরু-লম্বা একটি দ্বীপরাষ্ট্র। মাঝখানে উঁচু পাহাড়। নদীগুলো সেই পাহাড়ে উৎপত্তি হয়ে সাগরে গিয়ে পড়েছে, কিন্তু দৈর্ঘ্যে খুবই ছোট। পানির ধর্ম গড়িয়ে নিচে যাওয়া। ফলে সপ্তাহখানেক বৃষ্টি না হলে অধিকাংশ নদী সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ার কথা।
আর সে সমস্যার সমাধানে পাহাড়ে তিন হাজারের মতো বাঁধ নির্মাণ করে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা বাকি সময় ধীরে ধীরে ছেড়ে তারা পানি সমস্যার সমাধান করেছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণেও ব্যবহার করা হয় এই স্থাপনাগুলো। চীনের কথা নয় বাদই দিলাম, যেখানে এক লাখের মতো এ ধরনের বাঁধ আছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চিত্রই–বা কেমন? প্রায় ৫ হাজার ৩০০টি ড্যাম কিংবা ব্যারাজ সেখানে এখনো কার্যকর।
সে তুলনায় বাংলাদেশে কয়টি ড্যাম আর ব্যারাজ আছে? সাকল্যে পাঁচটি। বড় দুটি—তিস্তা ব্যারাজ আর কাপ্তাই ড্যাম। তাহলে বাংলাদেশে নদী ব্যবস্থাপনা অপ্রয়োজনীয়ভাবে স্থাপনানির্ভর—এটি বলা যাবে কি না? হ্যাঁ, তারপরও প্রশ্ন থাকে সঠিক জায়গায়, সঠিক স্থাপনাটি নির্মাণ করা হচ্ছে কি না?
বিশেষ করে এই মুহূর্তের ‘টক অব দ্য টাউন’ পদ্মা ব্যারাজের ব্যাপারে এ প্রশ্নগুলো সবাই জানতে চাইছেন। এটা ঠিক যে এই মুহূর্তে এটি নিয়ে সিরিয়াস মন্তব্য করার মতো অবস্থায় আমরা নেই। কেননা, এর বিস্তারিত ডিজাইন আমরা জানি না। ফলে যেটুকু জানা গেছে, তার ওপর কিছু মন্তব্য করা যেতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে এবং বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার বাস্তবতার নিরিখে, মোটাদাগে প্রকল্পটি অবশ্যই প্রয়োজনীয়, এটা বলতে দ্বিধা নেই। সংক্ষিপ্ত আকারে এখানে কিছু বিষয় উল্লেখ করছি।
১. ব্যারাজটির পরিবেশগত প্রভাব: হ্যাঁ, বিশ্বব্যাপী পরিবেশবিদেরা নদীতে স্থাপনা নির্মাণ পছন্দ করেন না, যদি–না একেবারেই প্রয়োজনীয় না হয়। তবে বাংলাদেশের জন্য এর বিকল্প ছিল না। এই পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হচ্ছে উজানে ভারত ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করছে বলেই। ফারাক্কা বাঁধ না থাকলে পদ্মা ব্যারাজের আসলে কোনো প্রয়োজনীয়তাই ছিল না। এর পরিবেশগত সমীক্ষাটি হাতে পেলে আরও ভালো হতো।
তবে দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোয় গত বছরগুলোতে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পানি কমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। লবণাক্ততার প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। ‘টপ ডাইং’ রোগে আক্রান্ত হয়ে সেখানে মারা যাচ্ছে সুন্দরীগাছ। পদ্মা ব্যারাজের ফলে এ অবস্থার উন্নতি হবে নিশ্চিত। তা ছাড়া এই ব্যারাজে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, যথা নেভিগেশন লক, ফিশ পাস ও সিলট ফ্লাশিংয়ের ব্যবস্থা আছে, যা ব্যারাজের দ্বারা সৃষ্ট পরিবেশগত সমস্যা অনেকটা কমিয়ে দেবে।
২. ব্যারাজের অবস্থান: এর অবস্থান নিয়ে খুব বেশি গবেষণার সুযোগ নেই। সীমান্ত থেকে যমুনার সংযোগস্থল-পদ্মা বরাবর—এ দুইয়ের মাঝেই এটি নির্মাণ করতে হবে। বেশি উজানে গেলে জলাধারের ধারণক্ষমতা কমে যাবে। আবার এটি অবশ্যই গড়াই-মধুমতীর উৎসমুখের ভাটিতে হতে হবে। কেননা, ব্যারাজে পানি উঁচু করে গড়াই দিয়ে তা প্রবাহিত করতে হবে। অন্যদিকে বেশি ভাটিতে গেলে ব্যারাজটি অনেক উঁচু করতে হবে। তা না হলে উজানের শাখানদীগুলোয় পানি ঢুকবে না।
সুতরাং বর্তমান অবস্থানটি অনেক সমীক্ষার পরই নিশ্চিত করা হয়েছে। বহু বছর ধরেই অবস্থানটিকে সবচেয়ে যোগ্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
৩. ‘পজিটিভ সাম গেম’ বনাম ‘জিরো সাম গেম’–এর একটি প্রসঙ্গ আসছে। ফারাক্কার পরে বাংলাদেশ সীমান্ত, সুতরাং ভাটির ক্ষতি শুধু বাংলাদেশের, আর উজানের লাভ সব ভারতের। সুতরাং ‘পজিটিভ সাম গেম’। কিন্তু পদ্মা ব্যারাজের ভাটিতেও তো বাংলাদেশই। ফলে উজানের লাভ আর ভাটির ক্ষতি—দুই বাংলাদেশের। তা ছাড়া একই নদীর পানি একবার জমানো হচ্ছে, আরেকবার ছাড়া হচ্ছে। সুতরাং ‘জিরো সাম গেম’। হ্যাঁ, এটা সত্য।
জেনে রাখা ভালো, ফারাক্কার উজানে গঙ্গা নদীতে ভারতের ভেতরে আরও প্রায় ৩০০টি ছোট-বড় বাঁধ আছে। বিভিন্ন দেশে যে হাজার হাজার ড্যাম আর ব্যারাজের কথা বললাম, এর সব কটিই দেশের অভ্যন্তরে, অর্থাৎ ‘জিরো সাম গেম’। ড্যাম কিংবা ব্যারাজ এভাবেই কাজ করে। ভরা মৌসুমে পানি জমা রাখে আর শুষ্ক মৌসুমে তা ব্যবহার করে।
৪. ভাটিতে লবণাক্ততা: একটা ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে যে ব্যারাজ দেওয়ার ফলে এর ভাটিতে পদ্মা শুকিয়ে যাবে। ফলে মেঘনার মোহনায় পানির অভাবে নতুন করে লবণাক্ততা সমস্যা সৃষ্টি হবে। পদ্মা গিয়ে একসময় যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। আর শুষ্ক মৌসুমে যমুনায় বেশ ভালো পানি থাকে। ফলে পদ্মায় পানি কম থাকলও ভাটির দিকে তেমন ক্ষতি হবে না। ‘ব্যাকওয়াটার এফেক্ট’–এও কিছু পানি পাওয়া যাবে।
আবার ভরা মৌসুমে ব্যারাজটিতে পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে যে পানি ছেড়ে দেওয়ার কথা, সেই পানি ছাড়া হবে শুধু পদ্মার শাখানদীগুলোর জন্য নয়, ভাটির জন্যও বটে। সুতরাং শুষ্ক মৌসুমে ভাটিতে বরং পানি বাড়ার কথা। তা ছাড়া ছয় থেকে আট মাস এই ব্যারাজের অধিকাংশ গেট খোলা থাকবে এবং নদী চলবে স্বাভাবিক নিয়মে।
তবে কত দক্ষতার সঙ্গে বর্ষার পানি জমা করে তা শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যাবে, তা নির্ভর করবে এ ব্যারাজ চালানোর জন্য যে ‘রিজার্ভার রেগুলেশন রুলস’ তৈরি করা হচ্ছে, তার ওপর।
আজকাল আধুনিক প্রযুক্তি, তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এই রেগুলেশন রুলসের সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া যেতে পারে, যাতে ব্যারাজের পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।
৫. পলি জমা হওয়া: হ্যাঁ, এটি একটি সমস্যা হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত গবেষণা, তথা সমীক্ষা করা হয়েছে আশা করি। উল্লেখ্য, শুষ্ক মৌসুমে ব্যারাজটির গেট আটকে রাখলে এ সমস্যা বাড়তে পারে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে এ অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে তেমন বৃষ্টি হয় না। এ কারণে পলির কোনো প্রশ্ন আসছে না।
পদ্মার মতো বড় নদীগুলোয় তখন অধিকাংশ পানি আসে ভূগর্ভস্থ পানির চুইয়ে পড়া অংশ বা ‘বেজ ফ্লো’ কিংবা বরফগলা জল থেকে। এ ধরনের বড় নদীগুলোকে বলা হয় ‘পেরিনিয়াল রিভার’। আরও দুই ধরনের নদী আছে—‘ইন্টারমিটেন্ট’ আর ‘এফিমেরাল’ রিভার, যাতে এ ধরনের ‘বেজ ফ্লো’ প্রায় থাকেই না। নদীতে পলি এসে পড়ে মূলত বর্ষা মৌসুমে, যখন বৃষ্টির পানি মাটির ওপর দিয়ে আসার সময় পলি নিয়ে আসে। সে সময় তো বাঁধের সব গেট খোলা। হ্যাঁ, মাঝেমধ্যে বন্ধ থাকবে এবং পানি আটকাবে, আর পলি জমা হওয়া বাড়তে পারে।
তবে সুবিধা হচ্ছে, উজানে ফারাক্কা বাঁধ থাকায় ফারাক্কার উজানেই এই পলির বড় অংশ নিচে পড়ে কমে যাচ্ছে। ফারাক্কার পরে বাংলাদেশ অংশে নতুন পানি আর পলি—দুটিই তেমন যোগ হচ্ছে না। তবে বিষয়গুলো বেশ জটিল এবং শুধু পলি জমা হওয়া নয়, বাঁধ অনেক সময় ভাটিতে নদীভাঙনের কারণও হতে পারে। সঠিকভাবে ডিজাইন কিংবা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ‘রিজার্ভার রেগুলেশন রুলস’ তৈরি করা হলে এ ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অনেকাংশেই মুক্তি সম্ভব।
ভারতেরই একজন প্রখ্যাত পানিবিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রর মতে, ফারাক্কা কিংবা গজলডোবা ব্যারাজ—এর কোনোটিই ভারতের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভবান কোনো প্রকল্প নয়। তাহলে এগুলো বানানো হলো কেন? শুধুই কি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে?
সর্বশেষ আসলে এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে রাজনীতি জড়িত। অনেকে বলে, ভারতের জন্য ফারাক্কা বাঁধ এখন আর তেমন কোনো প্রয়োজন নেই। গজলডোবা ব্যারাজ নিয়েও আছে এ ধরনের বক্তব্য।
ভারতেরই একজন প্রখ্যাত পানিবিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্রর মতে, ফারাক্কা কিংবা গজলডোবা ব্যারাজ—এর কোনোটিই ভারতের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভবান কোনো প্রকল্প নয়। তাহলে এগুলো বানানো হলো কেন? শুধুই কি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে?
কয়েক মাস ধরে ইউটিউবে গঙ্গাচুক্তি নবায়ন নিয়ে ভারতীয়দের তৈরি বেশ কয়েকটি ভিডিও দেখছিলাম। এর একটিতে গঙ্গা কিংবা সিন্ধুচুক্তি নবায়ন প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ইংরেজি সেই বক্তব্যের বঙ্গানুবাদ হচ্ছে, ‘ভারতের সঙ্গে সহমতের সঙ্গে কাজ না করতে চাওয়া প্রতিবেশীদের অবশ্যই এর মূল্য দিতে হবে।’ (www.youtube.com/watch?v=v-hYIHJ4K9U) । পানি না দেওয়া তেমনই একটি হুমকি।
জেনে রাখা ভালো, চুক্তির মাধ্যমে একটি অভিন্ন নদী থেকে পানি চাওয়ার বিষয়টি শুধুই হাত পেতে ভিক্ষা চাওয়ার মতো কিছু নয়। যেমন পার্শ্ববর্তী দেশে তেল থাকলে আপনি যদি হাত পেতে মাগনা তেল চান, তাহলে সে তা দিতেও পারে, না–ও পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক নদীতে ভাটির দেশের পানির প্রাপ্যতা তার একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকার, সে দিতে বাধ্য। উজানে পানি প্রত্যাহারের বিষয়টি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে এটি একটি নীতিবিরুদ্ধ কাজ। এ বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে।
আফসোসের বিষয়, বাংলাদেশ কিংবা ভারত—কেউ এটি স্বাক্ষর করেনি। তবে স্বাক্ষর না করলেও এ আইনের অন্তর্গত দিকনির্দেশনাগুলো যেকোনো আলোচনায় রেফারেন্স কিংবা যুক্তির অংশ হিসেবে উপস্থাপনের যোগ্য। কেননা, সারা বিশ্বের প্রায় অধিকাংশ সদস্যদেশের মতের ভিত্তিতে এ আইন জাতিসংঘে গৃহীত হয়েছে। এ আইনের বহু আগে থেকেই ‘কাস্টমারি ল’–এর ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ন্যায্যতার ভিত্তিতে পানি ভাগাভাগির নজিরও প্রচুর আছে।
সবশেষে একটি গল্প বলে শেষ করছি। ১৯৯৯-২০০০ সময়ে আমি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে (এনইউএস) মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। সে বছরই এনইউএসের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে একটি বড় গবেষণা প্রকল্প এল—ডিস্যালাইনেশন নিয়ে গবেষণা। অনেক কম মূল্যে মালয়েশিয়া থেকে খাওয়ার পানি কিনেছিল সিঙ্গাপুর। দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে স্বাদু পানি তাদের দেশে অপ্রতুল। কিন্তু হঠাৎই তারা সিদ্ধান্ত নিল যে নিজেরাই সমুদ্রের পানি ডিস্যালাইনেশনের মাধ্যমে খাওয়ার পানি তৈরি করবে, যা মালয়েশিয়া থেকে কেনা পানির চেয়ে কয়েক গুণ দামি।
কেন করছে, তা জিজ্ঞাসা করায় একজন অধ্যাপক জানান, ‘পানিনিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। সিঙ্গাপুরের সঙ্গে মালয়েশিয়ার সম্পর্ক খুব খারাপ নয়, কিন্তু তারপরও কোনো অপ্রত্যাশিত কারণে, বৈশ্বিক অস্থিরতার জেরে যদি বিবাদ বাধে, তাহলে মালয়েশিয়াকে সম্ভবত একটা গুলিও ছুড়তে হবে না—শুধু পানির পাইপ বন্ধ করে দিলেই খেল খতম। এতটা অনিশ্চিত অবস্থায় তারা থাকতে রাজি নয়।
বাংলাদেশেরও সময় এসেছে পানিনিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করার। এ ক্ষেত্রে পদ্মা ব্যারাজের কোনো বিকল্প নেই।
ড. মো. সিরাজুল ইসলাম অধ্যাপক, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ।
মতামত লেখকের নিজস্ব