খ্রিষ্টীয় যাজক থমাস ম্যালথাস একটি বৈপরীত্য লক্ষ করেছিলেন—যত্ন নিলে খাদ্য উৎপাদন বাড়ে আর জনসংখ্যা বাড়ে যত্নের অভাবে। বাংলাদেশের কৃষির বিকাশ ও সাফল্য সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল। সরকারের নজর পড়লে উৎপাদন বাড়ে, না হলে কমে। সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সুনজর পড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে পেঁয়াজের উৎপাদন যথেষ্ট পরিমাণে বেড়েছে। দেশে তৈলবীজ উৎপাদনও বেড়েছে। এগুলো সরকারের সুদৃষ্টিরই নমুনা। করোনা মহামারির সময় থেকে সরকারের বিশেষ গুরুত্ব প্রদানের কারণে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত থাকে। এ সময় কৃষিতে ভর্তুকি বৃদ্ধি করা হয়েছিল। একই সঙ্গে কৃষি গবেষণায় নিয়োজিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টাও প্রশংসার দাবি রাখে।
দীর্ঘ সময় পেরিয়ে বাংলাদেশের কৃষি অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকীকরণের পথে ধাবমান। চলতি অর্থবছরে দেশের কৃষিপণ্যের রপ্তানি মূল্য দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ভর্তুকি দিয়ে উৎপাদিত দ্রব্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে যৌক্তিক বাধা যে নেই তা নয়, তবে সেগুলো সমাধানের বিকল্প তাত্ত্বিক কৌশলও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ১৮ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দিতে এ দেশের কৃষিতে সরকারি সহায়তা একপ্রকার অনস্বীকার্য।
প্রধান উপকরণগুলোর দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। উৎপাদিত দ্রব্যের দাম আনুপাতিক হারে না বাড়লে তাতে তিনি ক্ষতির মুখে পড়েন। কৃষক কখনোই শিল্পোদ্যোক্তাদের মতো তাঁদের উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধির বোঝা ক্রেতাসাধারণের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। উৎপাদন বাড়ানো বা কমানোর ক্ষেত্রে কৃষকের হাত রয়েছে কিন্তু উৎপাদিত দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে, অর্থাৎ বাজারব্যবস্থার ওপর তাঁর কোনো হাত নেই। ফলে উৎপাদন নিয়ে কৃষক সর্বদা দুশ্চিন্তায় থাকেন।
করোনা-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধে সরকার বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে তাদের কাছ থেকে ঋণসহায়তা নিচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এসব ঋণসুবিধা পেতে কিছু শর্ত থাকা অমূলক নয়। যার কারণে সরকার গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, জ্বালানি তেল, সারসহ বিভিন্ন সেবা ও পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। তবে কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে বিদ্যুৎ, ডিজেল ও সারের দাম বাড়ার সম্পর্ক নিবিড় এবং তা বিপরীতমুখী। প্রকৃতপক্ষে দুই দফায় ইউরিয়া সারের দাম কেজিপ্রতি ১১ টাকা বৃদ্ধি করে ২৭ টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে ডিএপি, টিএসপি, এমওপি সারের দামও। যদিও পরিবহন খরচ, সার ছাড় করতে খরচ, সরবরাহঘাটতি ইত্যাদি অসিলায় কৃষকের কাছ থেকে দাম আরও বেশি নেওয়া হয়ে থাকে।
আমদানিনির্ভর বলে রাসায়নিক সার আমদানিতে ভর্তুকির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়ে যাচ্ছে। করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতি ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভর্তুকি বেড়েছে যথাক্রমে প্রায় ২৭৭ ও ২৪২ শতাংশ। এটিকে সরকারের আমলে নিতে হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার জন্য রাসায়নিক সারের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ভর্তুকি বৃদ্ধির দায় কৃষকের ওপর চাপানো সঠিক হবে না। তা ছাড়া দাম বাড়ালে সারের ব্যবহার কমে যাবে—এ যুক্তি খুব একটা শক্ত নয়। উপরন্তু সারের ব্যবহার কমাতে গিয়ে মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা হিতে বিপরীতও হতে পারে। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সারের ব্যবহার বাড়লেও খাদ্য উৎপাদন কিছুটা কমে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ আমরা স্মরণ করতে পারি। এ অবস্থায় কৃষককে কোন জমিতে কী ধরনের ফসলে কী পরিমাণ সারের প্রয়োজন, সে তালিকা সরবরাহ করা হলে তখন বোঝা যাবে তাঁরা প্রয়োজনের তুলনায় সার ব্যবহার বেশি করছেন কি না।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বিষয়ে কিছু বিষয় বিবেচ্য। প্রথমত, প্রধান উপকরণগুলোর দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। উৎপাদিত দ্রব্যের দাম আনুপাতিক হারে না বাড়লে তাতে তিনি ক্ষতির মুখে পড়েন। কৃষক কখনোই শিল্পোদ্যোক্তাদের মতো তাঁদের উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধির বোঝা ক্রেতাসাধারণের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদন বাড়ানো বা কমানোর ক্ষেত্রে কৃষকের হাত রয়েছে কিন্তু উৎপাদিত দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে, অর্থাৎ বাজারব্যবস্থার ওপর তাঁর কোনো হাত নেই। ফলে উৎপাদন নিয়ে কৃষক সর্বদা দুশ্চিন্তায় থাকেন।
তৃতীয়ত, সাধারণ ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার আমদানিকৃত পণ্যে শুল্ক ছাড় দিতে বাধ্য হয়। এর ফলে কৃষক তাঁদের উৎপাদিত দ্রব্য নিয়ে পড়েন বিপাকে। পড়তে হয় ক্ষতির মুখে এবং যার প্রভাব পড়ে পরের বছরের উৎপাদনে।
তাহলে করণীয় কী? জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অর্থনীতিবিদ ও গবেষকেরা কৃষিতে ডিজেলে ভর্তুকির সুপারিশ করলেও তা খুব একটা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। চলতি বোরো মৌসুমে মোট ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার হিসাব-নিকাশ বলে দেবে সে পরামর্শ কতটা প্রয়োজনীয় ছিল।
এখানে বলে রাখা ভালো, সাম্প্রতিক সময়ে পেঁয়াজ ও তৈলবীজ উৎপাদনে অর্থনীতিবিদদের পরামর্শে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল সাড়া দেওয়ায় যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া যাচ্ছে। কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সারসহ কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখতে হবে; বাড়াতে হবে কৃষিতে বাজেট বরাদ্দও।
প্রয়োজনে অন্যান্য খাতের প্রণোদনায় ভর্তুকি কমাতে হবে। এতে যেমন ডলারের সংকটও কমবে, তেমনিভাবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানসম্মত দেশীয় পণ্যের একটি বিশাল বাজার গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য কোনো অজুহাতে কৃষিতে ব্যবহৃত উপকরণগুলোর দাম বাড়াতে হয়—এমন নীতি গ্রহণ থেকে সরকারকে যেকোনো মূল্যে বিরত থাকতে হবে।
এ ছাড়া কৃষক পর্যায়ে এবং বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনের কারণে আমাদের দেশের কৃষকদের তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে। এখান থেকে প্রাকৃতিকভাবে উৎকৃষ্ট মানের জৈব সার উৎপাদন করা সম্ভব। এ জন্য কৃষকদের জৈব সার তৈরিতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। তাঁদের ফসল ব্যবস্থাপনা ও সার ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এলাকাভেদে ফসলের ধরন বিবেচনায় মাটিতে সারের প্রয়োজন জানা থাকলে কৃষকেরা অহেতুক বেশি পরিমাণে সার ব্যবহার (যেটা দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়ে থাকে) করে নিজেদের আর্থিক ক্ষতি করতেন না।
আর রাসায়নিক সার উৎপাদনে পর্যায়ক্রমে অভ্যন্তরীণ সামর্থ্য বাড়ানো অনেক বেশি জরুরি এবং সে লক্ষ্যে সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া সিমেন্টের মতো দেশের চাহিদা মিটিয়ে রাসায়নিক সার রপ্তানি করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও একটি সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। একই সঙ্গে রাসায়নিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে বিশাল এক বাজার সৃষ্টিসহ অনেক মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।
পরিশেষে খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষায় সরকার আগামী বাজেটে কৃষি উৎপাদনে সহায়ক সব ক্ষেত্রে সরকারের সহায়তা বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট থাকবে—এটা সবারই প্রত্যাশা। কৃষির অন্যান্য সেক্টর, যেমন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ফিড তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে ভর্তুকি আরও বাড়াতে হবে, তা না হলে ওই সব দ্রব্যের বাজারদর সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।
● ড. মো. সাইদুর রহমান অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান, কৃষি অর্থনীতি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: [email protected]