ইরান যুদ্ধের বিপুল খরচ মেটাতে বিপাকে পড়েছে আমেরিকা

মানুষ কখনো স্থায়ী শান্তিতে বিশ্বাস করেনি, আজও করে না। যুদ্ধের ন্যায্যতা প্রমাণে কত হাস্যকর যুক্তি যে আমরা দিতে পারি!ছবি : প্রতীকী

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের খরচ হয়েছে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। এই হিসাবের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর আগেই মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সেনা ও যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের ব্যয় ধরা হয়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া হাজার হাজার মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইতিমধ্যে কোটি কোটি ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।

যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, সামরিক ব্যয়ও তত বাড়বে।

বিশ্লেষকদের মতে, সামনে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। অনেকের ধারণা, এই নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ সীমিত করতে চাইতে পারেন, কারণ যুদ্ধটি রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

যুদ্ধ কত দিন চলবে সে বিষয়ে ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও ভিন্নতা দেখা গেছে। শুরুতে ট্রাম্প বলেছিলেন যুদ্ধ প্রায় এক মাস চলতে পারে। পরে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের সরকার পতন এবং পারমাণবিক হুমকি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলতে পারে।

এই যুদ্ধের খরচ শুধু অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জামে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব ইতিমধ্যেই সাধারণ মার্কিন নাগরিকের জীবনে পড়তে শুরু করেছে। পেট্রলের দাম বেড়েছে, সামনে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে। কারণ, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটছে। মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় মর্টগেজ ঋণের সুদ বাড়ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের বিস্তৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় শেয়ারবাজারেও পতন দেখা যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

প্যাসিফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ ওয়েইন ওয়াইনগার্ডেন বলেন, যুদ্ধের কারণে পেট্রল, বিদ্যুৎ ও নিত্যপণ্যের দামে চাপ তৈরি হচ্ছে। পরিবহন, প্যাকেজিং ও সার উৎপাদনের খরচ বাড়ার ফলে এই দাম আরও বাড়তে পারে। এতে এমনিতেই উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ে বিপাকে থাকা পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। এই যুদ্ধ কীভাবে মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন খরচে প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোঝার জন্য কয়েকটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবহন ও জ্বালানি

সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালিতে। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন হয়। ইরান এই প্রণালির উত্তর দিক নিয়ন্ত্রণ করে। যুদ্ধ শুরুর পর যেকোনো জাহাজ সেখানে প্রবেশ করলে হামলার হুমকি দিয়েছে ইরান। বিশ্বের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। একই পথ দিয়ে সার, সার তৈরির কাঁচামাল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও যায়। ফ্রান্সের এসেক বিজনেস স্কুলের অর্থনীতির প্রভাষক হেরন লিম জানান, ইলেকট্রনিকস, সেমিকন্ডাক্টর, প্লাস্টিক ও রাবার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক কাঁচামালও এই পথ দিয়ে যায়। অন্যদিকে এশিয়া থেকে ওষুধ, পোশাক ও ব্যাটারির মতো পণ্য উল্টো পথে পরিবহন করা হয়।

ইরান নাকি এই পথজুড়ে নৌ মাইন পেতে রেখেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে এমন কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যেগুলো মাইন স্থাপন করছিল। যুক্তরাষ্ট্র নৌবাহিনীর মাধ্যমে তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি কার্যকর সমাধান নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

বিকল্প পথ ব্যবহার করাও সহজ নয়। কারণ, সুয়েজ খালের পথেও নতুন করে হামলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর কারণে লোহিত সাগর হয়ে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পবিত্র রমজান মাসের শেষ জুমায় তেহরানে আল-কুদস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মিছিলে অংশ নিয়েছেন লাখ লাখ ইরানি। দেশটির সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলার মধ্যেই এ কর্মসূচি পালিত হলো। ১৩ মার্চ ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

এর প্রভাব ইতিমধ্যে জ্বালানির বাজারে দেখা যাচ্ছে। মার্কিন মোটর ক্লাব এএএর তথ্য অনুযায়ী, ১২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের গড় দাম প্রতি গ্যালন প্রায় ৩ দশমিক ৬০ ডলারে পৌঁছেছে। মাত্র এক সপ্তাহেই দাম বেড়েছে প্রায় ৩৫ সেন্ট। এ ছাড়া জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে শিগগিরই অনেক পরিবারকে বেশি বিদ্যুৎ ও গরমের বিল দিতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের কয়েকটি দেশ গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য জ্বালানি সংরক্ষণের পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ৮ মার্চ সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি তাদের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত হানবে। তাদের ভাষায়, যদি প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২০০ ডলারের বেশি সহ্য করতে পারেন, তবে এই যুদ্ধ চালিয়ে যান।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বিকল্প খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্যদেশগুলো ইতিমধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈশ্বিক বাজারে ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, দাম নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র তার জরুরি তেল মজুত থেকে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল বাজারে ছাড়বে।

তবে অর্থনীতিবিদ ওয়েইন ওয়াইনগার্ডেনের মতে, এটি অনেকটা সংগীতের খেলায় চেয়ারের অভাবের মতো অবস্থা। খেলোয়াড় বেশি, চেয়ার কম। কৌশলগত তেল মজুত বাজারে ছাড়লে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘ হলে তাতে বড় পরিবর্তন আসবে না।

কৃষি ও খাদ্য

যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে কৃষি ও খাদ্য খাতেও। মার্কিন ফার্ম ব্যুরো ফেডারেশনের সভাপতি জিপি ডুভাল এক চিঠিতে ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, সার সরবরাহে বিঘ্ন এবং দাম বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকেরা বড় সমস্যায় পড়তে পারেন। এর ফল হিসেবে বাজারে খাদ্যের দামও বাড়তে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাস সার তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। আর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বে ইউরিয়া সারের অন্যতম বড় উৎস। বিশ্বের প্রায় ৪৯ শতাংশ ইউরিয়া রপ্তানি এবং প্রায় ৩০ শতাংশ অ্যামোনিয়া রপ্তানি আসে এই অঞ্চল থেকে। বিশ্বের প্রায় এক–তৃতীয়াংশ ইউরিয়াও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর থেকেই ইউরিয়ার দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। তেল ও গ্যাস পরিশোধনের একটি উপজাত সালফারের প্রায় অর্ধেক সরবরাহও আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। এই সালফার সার উৎপাদন ছাড়াও বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়।

হেরন লিম বলেন, যদি জাহাজে করে বাজারে সার পৌঁছানো না যায়, তাহলে কৃষকেরা কম সার ব্যবহার করতে বাধ্য হবেন। এতে ফসলের উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুন

বিমান ও পর্যটন

বিমান ভাড়াও বাড়তে শুরু করেছে। ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী স্কট কিরবি সতর্ক করেছেন, জেট ফুয়েলের দাম বাড়ার কারণে বিমান ভাড়া বাড়তে পারে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ৫৮ শতাংশ বেড়েছে।

ক্যাথে প্যাসিফিক ও তাদের বাজেট এয়ারলাইন এইচকে এক্সপ্রেস ইতিমধ্যে জ্বালানি সারচার্জ প্রায় দ্বিগুণ করেছে। হংকং এয়ারলাইনসও একই পদক্ষেপ নিয়েছে।

মালয়েশিয়ার পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লোক জানিয়েছেন, জ্বালানি খরচ কমাতে কিছু ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হতে পারে এবং খাদ্যসহ জরুরি পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।

যুদ্ধের কারণে ভ্রমণপথও বদলে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে গিয়ে এশিয়া ও ইউরোপের অনেক রুটে বিমান ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের কিছু রুটে এই মাসে ভাড়া প্রায় ৯০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

প্রযুক্তি

উৎপাদন ও প্রযুক্তি খাতেও প্রভাব পড়ছে। বিশ্বের প্রায় ৮ শতাংশ অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন হয় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতার ও বাহরাইনের কয়েকটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানা রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে। ফলে অ্যালুমিনিয়ামের দাম প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এতে গাড়ি, নির্মাণ ও বিমানশিল্পের খরচও বাড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের হিলিয়াম উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে হিলিয়াম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। চিকিৎসা যন্ত্র, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতেও এর ব্যবহার রয়েছে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আইফোন, ল্যাপটপসহ নানা ইলেকট্রনিক পণ্যের দামও বাড়তে পারে।

নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উইলিয়াম ফিগুয়েরোয়ার মতে, যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই সাধারণ মানুষের পকেটে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পেট্রলের দাম বেড়েছে, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় মর্টগেজের সুদ বাড়ছে। তেল ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকির মুখেও পড়তে পারে।

  • মিরান্ডা জেয়ারেতনাম টাইম সাময়িকীর সিঙ্গাপুর ব্যুরোয় কর্মরত প্রতিবেদক

    টাইম সাময়িকী থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত