৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর মাত্র দুই দিন পর ৯ আগস্ট ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জাজান এলাকায় আরামকো তেল শোধনাগারে ড্রোন হামলা চালায়।
আগুন নেভানো গেলেও এ হামলা একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—এই হামলাকে কি এখন তুরস্ক ও পাকিস্তানের ওপরও হামলা হিসেবে ধরা হবে? কারণ, নতুন চুক্তির মূল কথা হলো, তিন দেশের কোনো একটিতে সশস্ত্র হামলা হলে সেটি তিনটির ওপরই হামলা বলে গণ্য হবে।
অনেকেই এই জোটকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামে ডাকতে শুরু করেছেন। তবে বাস্তবতা হলো, এটি এখনো ন্যাটোর মতো শক্তিশালী কোনো সামরিক জোট নয়। ন্যাটোর মতো এর নিজস্ব কোনো স্থায়ী সেনা কমান্ড, যৌথ গোয়েন্দা কাঠামো বা পরীক্ষিত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। এখন পর্যন্ত এটি মূলত একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, যার সামরিক নিয়মকানুন এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে জাজান হামলার পর তুরস্ক ও পাকিস্তান ঠিক কী ধরনের সহায়তা দেবে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।
তিন দেশের স্বার্থ কি এক
এই চুক্তির সময় কিন্তু মোটেও আকস্মিক নয়। ২০২৩ সাল থেকে গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও লোহিত সাগরের সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানে আক্রমণ করে, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। ইরান ও তার মিত্রদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল-গ্যাসের স্থাপনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের নৌপথও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতায় তিন দেশ একই ঢিলে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তা নির্ভরশীল ছিল। এখন তারা সেই নির্ভরশীলতা কমিয়ে বিকল্প অংশীদার তৈরি করতে চায়। তারা এই জোটে দিতে পারে প্রচুর অর্থ, জ্বালানি প্রভাব ও রাজনৈতিক মর্যাদা।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হলেও তারা নিজেদের একটি স্বাধীন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তারা এই জোটে আনতে পারে তাদের ড্রোন প্রযুক্তি, যুদ্ধজাহাজ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি ও ন্যাটোর অভিজ্ঞতা।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই চুক্তিকে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, এখানে মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি ও সৌদিভিত্তিক স্থায়ী সচিবালয় গঠন করা হবে। এমনকি মিসরও ভবিষ্যতে যোগ দিতে পারে। কিন্তু প্রথম কমিটির বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত সামরিক সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্ট নয়। এই ঘাটতিই জাজান হামলা সামনে এনেছে।
পাকিস্তান চায় তাদের সামরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে অর্থায়ন ও কূটনৈতিক সমর্থন নেওয়া। পাকিস্তানের আছে বড় ও যুদ্ধ-পরীক্ষিত সেনাবাহিনী। আর তিন সদস্যের মধ্যে পাকিস্তানই একমাত্র পারমাণবিক শক্তি।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে সৌদি আরব সামরিক খাতে খরচ করেছে ৮৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, তুরস্ক ৩০ বিলিয়ন ও পাকিস্তান ১১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। তিন দেশের সম্মিলিত সামরিক ব্যয় দাঁড়ায় ১২৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের একটি বড় অংশ।
তবে এখানে একটা বড় সতর্কতা আছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি আছে, কিন্তু নতুন এই মক্কা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৌদি আরব বা তুরস্ককে পারমাণবিক সুরক্ষা দেবে—এমন কোনো প্রকাশিত অঙ্গীকার নেই। রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার পাকিস্তানি সেনা, ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান এবং ড্রোন মোতায়েন আছে (রয়টার্স, ১৯ মে ২০২৬)। কিন্তু এটি পুরোনো সৌদি-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ, ৭ আগস্টের মক্কা চুক্তির ফল নয়। এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা বিভ্রান্তিকর।
জাজান হামলাই প্রথম বাস্তব পরীক্ষা
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই চুক্তিকে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, এখানে মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটি ও সৌদিভিত্তিক স্থায়ী সচিবালয় গঠন করা হবে। এমনকি মিসরও ভবিষ্যতে যোগ দিতে পারে। কিন্তু প্রথম কমিটির বৈঠক না হওয়া পর্যন্ত সামরিক সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্ট নয়। এই ঘাটতিই জাজান হামলা সামনে এনেছে।
হুতিরা একটি অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী। তাদের ড্রোন হামলাকে কি চুক্তির ‘সশস্ত্র আক্রমণ’ হিসেবে গণ্য করা হবে? যদি হয়, তাহলে তুরস্ক ও পাকিস্তান কী করবে? তারা কি শুধু গোয়েন্দা তথ্য দেবে, আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করবে, নাকি ইয়েমেনে পাল্টা অভিযান চালাবে?
এখন পর্যন্ত কোনো যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫-ও বলে, প্রতিটি সদস্য নিজের সক্ষমতা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারে। মক্কা চুক্তিতেও জাতীয় আইন, সংসদের অনুমোদন এবং যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি পরিষ্কার না থাকায় ‘একজনের ওপর হামলা সবার ওপর হামলা’—এই বাক্য তিন রাজধানীতে তিন রকম অর্থ বহন করতে পারে।
ইতিহাস কি বারবার ফিরে আসে
মধ্যপ্রাচ্যে এর আগেও বিভিন্ন জোট হয়েছে, কিন্তু সেগুলো তেমন সফল হয়নি। ১৯৫০ সালের আরব লীগের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে কার্যকর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া গড়তে পারেনি। সেন্টো ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। পেনিনসুলা শিল্ড ১৯৯০ সালে কুয়েত দখল ঠেকাতে পারেনি। ২০১৫ সালের ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশনও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোটে পরিণত হয়নি। ইতিহাসের শিক্ষা পরিষ্কার—শুধু যৌথ ঘোষণাই যুদ্ধক্ষমতা তৈরি করে না।
এই জোট কার বিরুদ্ধে
তিন দেশই বলেছে, এই চুক্তি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও হরমুজ প্রণালিতে তাদের প্রভাবই তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা উদ্বেগ। অন্যদিকে ইসরায়েলের আঞ্চলিক সামরিক অভিযান ও ফিলিস্তিন প্রশ্নও এই চুক্তির রাজনৈতিক পটভূমি।
তবে প্রকাশিত বিবৃতিতে গাজা, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক বাধ্যবাধকতা নেই। তাই একে ইরান বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিশ্চিত সামরিক বলয় বলা যাবে না। এটি মূলত তিন দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও দর–কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা। তবে তিনটি সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্রের এই সহযোগিতা কার্যত ইরানবিরোধী জোটে পরিণত হলে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নীরবতাকে মার্কিন প্রভাবের সমাপ্তি হিসেবে দেখা ভুল। তুরস্ক তো ন্যাটোর সদস্য এবং তিন দেশই পশ্চিমা অস্ত্র, প্রযুক্তি ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত। এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা নয়; বরং নিরাপত্তা অংশীদার বৈচিত্র্যকরণের সংকেত।
বাংলাদেশের জন্য কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের স্বার্থ প্রধানত জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৬৩ শতাংশ এসেছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাক থেকে। এককভাবে সৌদি আরবের অংশ প্রায় ৩৫ শতাংশ (দ্য ডেইলি স্টার, ১ মার্চ ২০২৬)।
অন্যদিকে মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাব বলছে, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। একই পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়াম তরল যায়।
যদি এই জোট সংঘাত প্রতিরোধ করে, তাহলে বাংলাদেশ উপকৃত হবে। কিন্তু এটি যদি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা বা পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়ায়, তাহলে তেলের দাম বাড়বে, পরিবহন ব্যয় বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং বাড়বে মূল্যস্ফীতি। তাই ঢাকার লক্ষ্য কোনো জোটকে আবেগ দিয়ে সমর্থন করা নয়; বরং নৌপথ উন্মুক্ত রাখা, জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য করা এবং উত্তেজনা কমানোর কূটনীতিকে সমর্থন করা।
শেষ কথা
মক্কা জোট এখনো ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নয় এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের অবস্থানেও পৌঁছায়নি। এটি মূলত সৌদি আরবের নিরাপত্তা বৈচিত্র্যকরণ, তুরস্কের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং পাকিস্তানের সামরিক-কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর একটি যৌথ উদ্যোগ। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘোষণা নয়; বরং ওয়াশিংটন, বেইজিং, মস্কো, তেহরান ও তেল আবিব—সব পক্ষের সঙ্গে আরও সুবিধাজনক অবস্থান থেকে কৌশলগত দর–কষাকষির চেষ্টা।
জোটটির বাস্তব পরীক্ষা জাজান, আর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার বড় পরীক্ষা ফিলিস্তিন ইস্যু। জাজান হামলার পর যদি প্রতিক্রিয়া কেবল নিন্দা ও বৈঠকে সীমাবদ্ধ থাকে, আর ফিলিস্তিন প্রশ্নে যদি অবস্থান শুধু বিবৃতিতেই আটকে যায়, তবে স্পষ্ট হবে—চুক্তির ভাষা তার বাস্তব সক্ষমতার চেয়ে বড়।
অন্যদিকে যদি তিন দেশ যৌথ কমান্ড, আকাশ প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা বিনিময়, অর্থায়ন ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়া কাঠামো গড়ে তুলতে পারে এবং একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ইস্যুতে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়, তাহলে জোটটি মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণ না করেও আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারবে।
তাই মক্কা জোট কোনো সাম্রাজ্য নয়—এটি একটি উচ্চঝুঁকির কৌশলগত বাজি, যার সাফল্য নির্ভর করবে প্রথম বড় সংকটে সদস্যদের বাস্তব ঐক্যের ওপর, কেবল ঘোষণার ওপর নয়।
ড. মো. সাহাবুল হক অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট
মতামত লেখকের নিজস্ব
