ওমরাহ সেরে সাফসুতরো হয়ে মক্কার আল-সাফা রাজপ্রাসাদের দরবারকক্ষে এলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। সঙ্গে ছিলেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। এক দিন আগেই আঙ্কারা থেকে পৌঁছেছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘আহলান ওয়া সাহলান।’
৭ আগস্ট দুপুরে এই তিন নেতা যে ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষর করলেন, কোনো কোনো ভাষ্যকার তাকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’র সূচনা বলে অভিহিত করেছেন। তিনটি মুসলিম দেশ ইতিমধ্যেই নানাভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাদের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মোদ্দা কথা হলো, একটি দেশ আক্রান্ত হলে বাকি দুই দেশ তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে—ঠিক যেমনটি বলা আছে ন্যাটো চুক্তির পঞ্চম ধারায়। তিন দেশই অবশ্য দাবি করেছে, চুক্তিটি আত্মরক্ষামূলক এবং কোনো বিশেষ দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়।
উপসাগরে অঘোষিত যুদ্ধ
আত্মরক্ষার প্রয়োজন দেখা দেয় তখনই, যখন কোনো দেশ বাইরের কোনো শক্তির আক্রমণের আশঙ্কা করে। প্রশ্ন হলো, মক্কা চুক্তির দেশগুলো কোন বহিরাগত শক্তিকে ভয় পাচ্ছে? প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক। চুক্তিটি এমন এক সময়ে স্বাক্ষরিত হলো, যখন ইরান ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা তুঙ্গে। না চাইলেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের অংশীদার হয়ে পড়েছে সৌদি আরবসহ অন্যান্য পাঁচটি উপসাগরীয় দেশ।
ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিবাদ নতুন নয়। আয়তন ও জনসংখ্যায় ইরান তাদের যেকোনো দেশের চেয়ে বড়। এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশেই উল্লেখযোগ্য শিয়া জনগোষ্ঠী থাকায় তেহরানের শিয়া সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের প্রকাশ্য সন্দেহ আছে। ইয়েমেনের হুতিদের প্রতি ইরানের সমর্থন সৌদি আরবের সঙ্গে তার উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। সম্পর্কের এতটাই অবনতি হয়েছিল যে ২০১৬ সালে রিয়াদ ও তেহরান কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। সাত বছর পর, ২০২৩ সালে, চীনের মধ্যস্থতায় সেই সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়।
নিরাপত্তার ভার যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়ে সৌদি আরব যে স্বস্তি আশা করেছিল, হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধেই সেই ভরসায় প্রথম বড় ফাটল ধরে। ২০২৬ সালে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে রিয়াদ এখন আর নিজের নিরাপত্তা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দিতে চায় না; বরং একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে।
ইসলামিক ইরান তাদের জন্য হুমকি—এমন ধারণা শুধু সৌদি আরবের নয়, উপসাগরের অন্য দেশগুলোরও। ইসলামিক বিপ্লবের দুই বছরের মাথায়, ১৯৮১ সালে সৌদি উদ্যোগে উপসাগরের ছয়টি দেশ একজোট হয়ে জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল গঠন করে। এটিও একধরনের প্রতিরক্ষা জোট, যদিও অভিন্ন প্রতিরক্ষার পাশাপাশি সমন্বিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমও এর অন্তর্ভুক্ত। এই জোটে উপসাগরের সবাই আছে, নেই কেবল ইরান।
নিজেদের সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপসাগরীয় দেশগুলো একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দিকেও হাত বাড়ায়। ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত আক্রমণ করলে ভীতসন্ত্রস্ত দেশগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দেয়। বিনিময়ে যে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তারা আশা করেছিল, চলতি ইরান যুদ্ধের সময় তা অনেকটাই ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ইরানি আক্রমণে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে সেখানকার কিছু সেনা ও সরঞ্জাম জর্ডান ও ইসরায়েলে সরিয়ে নিতে হয়।
মঞ্চে পাকিস্তান ও তুরস্ক
নিরাপত্তার ভার যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়ে সৌদি আরব যে স্বস্তি আশা করেছিল, হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধেই সেই ভরসায় প্রথম বড় ফাটল ধরে। ২০২৬ সালে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে রিয়াদ এখন আর নিজের নিরাপত্তা পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দিতে চায় না; বরং একটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে। ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল সেই পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মক্কা চুক্তি তারই পরবর্তী ধাপ। প্রক্রিয়াটি এখানেই থামবে না; অচিরেই এই তিন দেশের সঙ্গে মিসরও যুক্ত হতে পারে।
এই প্রক্রিয়ার বাইরে মিসর, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে একটি আলাদা সামরিক-রাজনৈতিক জোটও আকার নিতে শুরু করেছে। চলতি বছরের মার্চে এই চার দেশ প্রথমবারের মতো রিয়াদে বৈঠক করে। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আরও কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। ‘আর ফোর’ বা ‘রিজিওনাল ফোর’ নামে জোটটি ইতিমধ্যেই পরিচিতি পেয়েছে।
মক্কা চুক্তি ও আর ফোর—উভয় বন্দোবস্তেরই প্রধান লক্ষ্য সৌদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রিয়াদের চোখে তার জ্বালানি সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে এমন ব্যবস্থা অপরিহার্য। এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগর থেকে বিদায় করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র থাকছে, তবে সেখানে তার উপস্থিতি ও প্রভাব আগের মতো নেই; এককভাবে তার ওপর নির্ভর করাও আর নিরাপদ বলে বিবেচিত হচ্ছে না। এই ঘাটতি পূরণে প্রয়োজন পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং তুরস্কের বিস্তৃত প্রতিরক্ষাশিল্প। অর্থ জোগানোর দায়িত্ব, বলা বাহুল্য, নেবে রিয়াদ।
কেউ কেউ মনে করছেন, মক্কা চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ক্ষতি হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব আরও কমবে। তবে এটি সম্ভবত পরিস্থিতির ভুল পাঠ। পাকিস্তান ও সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। ন্যাটোর সদস্য তুরস্কও তার মিত্র। তাই ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকেরা নতুন জোটকে নিজেদের পক্ষের শক্তি হিসেবেই দেখছেন। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের এক ভাষ্যকারের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক দায়িত্ব পালন করে আসছে, এই জোট তার একটি অংশ নিতে পারে। পার্থক্য হলো, এর ব্যয় আর যুক্তরাষ্ট্রকে একা বহন করতে হবে না।
টার্গেট ইরান
সব পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, এই চুক্তির লক্ষ্য ইরান নয়। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক চুক্তি, যা যৌথ প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু দুই যোগ দুই চার হিসাব করলে এই চুক্তিকে অতটা নিরীহ মনে হয় না। যাঁরা মক্কা চুক্তিকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ ভেবে স্বাগত জানিয়েছেন, এই ব্যাখ্যা তাঁদের মনঃপূত হবে না। তাঁদের ধারণা, যেকোনো ইসলামি জোট স্বভাবতই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী হবে। বাস্তবে ছবিটি ভিন্ন। সদস্যরা মুসলিম দেশ হলেও জোটের কৌশলগত লক্ষ্য আরেকটি মুসলিম দেশ—ইরান। অন্তত এমনটি ভাবার যথেষ্ট
কারণ রয়েছে।
লক্ষ করুন, ইরান এই চুক্তির সদস্য নয়, তাকে যোগ দিতেও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বিষয়টি ইরানের নজর এড়ায়নি। চুক্তিভুক্ত তিন দেশ জোর দিয়ে বলেছে, তারা ইরান বা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে আঁতাত করছে না। সত্যিই যদি তা হয়, তাহলে এই জোটে ইরানের আপত্তি থাকার কথা নয়। তবে একজন মুখপাত্রের বরাত দিয়ে তেহরান বলেছে, ইসলামি জোটটিকে সফল হতে হলে ‘ব্যাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ (কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড ইনক্লুসিভ) হতে হবে। কথাটির অন্তর্নিহিত অর্থ স্পষ্ট: শুধু সুন্নি দেশগুলোকে নিয়ে এমন কোনো জোট গঠিত হলে তার লক্ষ্য যে শিয়া ইরান, তেমন সন্দেহ অমূলক নয়।
প্রায় একই সময়ে লোহিত সাগরে নৌ চলাচল অবাধ ও নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে সৌদি উদ্যোগে একটি স্বতন্ত্র ‘মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ গঠিত হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ এই যৌথ নিরাপত্তাব্যবস্থায় যোগ দিয়েছে। লক্ষণীয়, এখানেও ইরানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
ইরান সরাসরি এই জোটের লক্ষ্য না-ও হতে পারে, কিন্তু ইরান-সমর্থিত হুতিরা যে এর অন্যতম লক্ষ্য, তাতে সন্দেহ নেই। বাস্তবতা হলো, মক্কা চুক্তি ও লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তা জোট ইরানকে শুধু একঘরে করবে না, কার্যত চারদিক থেকে ঘিরেও ফেলবে। কাগজে-কলমে যা-ই বলা হোক না কেন—এই দুই চুক্তিরই কৌশলগত যুক্তির কেন্দ্রে যে ইরান, তা অস্বীকার করা কঠিন।
হাসান ফেরদৌস প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব
