এর আগে সিইসি মাঠ ছেড়ে না দিয়ে তলোয়ারের বিরুদ্ধে তলোয়ার বা রাইফেল নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচুর সমালোচনা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সিইসি কাউকে তলোয়ার ও রাইফেল নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলতে পারেন কি না। পরে সিইসি তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, তিনি তলোয়ার ও রাইফেলের প্রসঙ্গটি বলেছেন কৌতুক করে। এটি ‘মিন’ করেননি। সিইসির এই বক্তব্যে যে নির্মম সত্যটি বেরিয়ে এসেছে তা হলো, নির্বাচনের নামে দেশে শক্তি পরীক্ষার মহড়া চলেছে। নির্বাচন কমিশন যদি সত্যিই একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে চায়, প্রথমে তাদের কর্তব্য হবে নির্বাচনী মাঠকে তলোয়ারমুক্ত করা। বিএনপি বা অন্য দল মাঠ ছেড়ে দিলেও সন্ত্রাস ও হানাহানি বন্ধ হয়নি, তার প্রমাণ গত বছর অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, উচ্চ ঋণ নিয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বারবার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে না। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা না হোক, নির্বাচন নিয়ে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘটলে তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের আছে কি না?

প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, গত ৫ মাসে নির্বাচনী সংঘাত ও হানাহানিতে সারা দেশে ৯৫ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে। এই দুই ধাপে যথাক্রমে ৩০ ও ২৬ জন নিহত হয়েছেন। প্রথম ধাপে দুই ভাগে নির্বাচন হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগের নির্বাচন হয়েছে গত সেপ্টেম্বর মাসে। মূলত তখন থেকেই সারা দেশে নির্বাচন ঘিরে সংঘাতময় পরিস্থিতি দেখা দেয়। প্রথম ধাপে ৫ জন, চতুর্থ ধাপে ১০, পঞ্চম ধাপে ২৩ ও ষষ্ঠ ধাপের ইউপি নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় এখন পর্যন্ত একজনের মৃত্যু হয়েছে। (প্রথম আলো, ৩০ জানুয়ারি ২০২২)

সিইসি কী বলেছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তারা কী করেছে। কীভাবে তারা নির্বাচনটি করতে চাইছে? বর্তমান নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নানা ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে। তারা পেশাজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। সাবেক সিইসি ও নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে কথা বলেছে। নিজেদের দাবি দাওয়া জানাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো, আলোচনার বদলে সবকিছু তারা রাজপথে ফয়সালা করতে চায়।

বিএনপি আমলে একাধিকবার আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বিশিষ্ট পাঁচ নাগরিক দুই পক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলেছিলেন। কমনওয়েলথ প্রতিনিধি স্যার নিনিয়ান এসেছিলেন। কোনো ফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় সব দলকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বিএনপি সরকারের শেষ দিকে নির্বাচন নিয়ে নতুন করে সংকট দেখা দেয়। ২০০৬ সালে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল ও বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াও আলোচনায় বসেছিলেন। কোনো ফল হয়নি।কেননা তারা ফটোসেশন করার মালিক হলেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক ছিলেন না। যারা মালিক ছিলেন, তারা সমঝোতায় আসতে রাজি হননি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ২০১৩ সালে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো এসে দুই দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে রাজনৈতিক সমঝোতা হবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু সমঝোতা হয়নি। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিএনপির নেতারা সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে নির্বাচন প্রতিরোধের ডাক দেন। ২০১৮ সালে বিএনপি সে রকম কোনো সুবিধা ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নেয় এবং জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচন করে মাত্র সাতটি আসন পায়।

এবারে কী হবে? আওয়ামী লীগ যদি একতরফা নির্বাচন করার উদ্যোগ নেয় এবং বিএনপি ও তাদের সহযোগীরা তা প্রতিরোধের চেষ্টা করে, কী পরিস্থিতি হবে? বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ সংকটে আছে। জ্বালানির স্বল্পতার জন্য এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং দেওয়া শুরু হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, উচ্চ ঋণ নিয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বারবার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে না। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা না হোক, নির্বাচন নিয়ে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা ঘটলে তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের আছে কি না?

যদি না থাকে, তাহলে সরকারের উচিত হবে নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধানে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনায় বসা; যার ইঙ্গিত সিইসিও দিয়েছেন। আলোচনার অর্থ এই নয় যে প্রতিপক্ষের দাবি পুরোপুরি মানতে হবে। নির্বাচন নিয়ে যে দেশে একটা সমস্যা আছে, এটি ক্ষমতাসীনদের স্বীকার করতে হবে। তাঁরাই বলছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০১৪ ও ২০১৮-এর মতো হবে না। তাহলে কেমন নির্বাচন হবে, সেটাও তাঁদের পরিষ্কার করে বলতে হবে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ছাড়া অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপির প্রতি বিদেশিদের কাছে ধরনা না দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। কিন্তু বিএনপির নেতারা, তথ্যমন্ত্রীর ভাষায়, কেন রাত-বিরাতে বিদেশিদের কাছে ধরনা দেন, তা বলছেন না। বিএনপি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির দাবি জানিয়েছে। তারা মনে করে, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগও একই কথা বলত। সে সময়ে আওয়ামী লীগের দাবি যদি যৌক্তিক হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগও এখন সেই দাবিকে অযৌক্তিক ও অসাড় প্রমাণ করবে কীভাবে? দুই সরকারের মধ্যে পার্থক্য হলো বিএনপি আমলে আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বিরোধী দল নির্বিঘ্নে সভাসমাবেশ করেছে। এখন বিএনপি সেটি করতে পারছে না।

আমরা মনে করি, এই সংকটকালে নির্বাচন নিয়ে আরেকটি সংকটের ভার বহন করা ক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হতে হবে। যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন এবং আছেন, যাঁরা জনগণের জন্য রাজনীতি করেন তারা কী বলেন?

  • সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন