হলিউডে একটি বিষয় সুপরিচিত—ভালো গল্পে নায়ককে বদলে যেতে হয়। কখনো সে বেপরোয়া থেকে বোঝাপড়াপূর্ণ হয়, দুর্বল থেকে শক্তিশালী হয়, খারাপ থেকে ভালো হয়ে ওঠে, আবার কখনো খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে যায়।
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের গত সাত বছরের যাত্রা ঠিক এমনই এক রূপান্তরের গল্প। তাঁর প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা যেন একটি বড় ও ব্যয়বহুল চলচ্চিত্রের মতো, যেখানে আছে ক্ষমতার ঝলক, বড় স্বপ্ন, নানা চক্রান্ত ও সহিংসতার ছাপ।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সময় ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিচিতি ছিল কঠোর শাসক ও আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির প্রবক্তা হিসেবে। সেই সময় তাঁকে ঘিরে ঘটেছিল কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা। রিয়াদের রিটজ-কার্লটন হোটেলে তিনি শত শত ধনী ব্যবসায়ী ও রাজপরিবারের সদস্যকে আটক করেছিলেন। ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তীব্র করায় সেখানে অসংখ্য সাধারণ মানুষ মারা গিয়েছিল। তিনি লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে চাপ দিয়ে পদত্যাগ করাতে বাধ্য করেছিলেন। আর সাংবাদিক জামাল খাসোগির নৃশংস হত্যাকাণ্ড, যা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনা হয়।
মানবাধিকার পরিস্থিতি সৌদি আরবে এখনো নিখুঁত নয়। সেখানে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ সীমিত এবং বিচারব্যবস্থা পুরোনো ও অস্বচ্ছ। সেখানে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা এখনো ঘটে। কিন্তু সেই সঙ্গে যুবরাজ সালমান এমন কিছু পরিবর্তন এনেছেন, যা একসময় অকল্পনীয় মনে হতো। তিনি ধর্মীয় পুলিশকে কার্যত ক্ষমতাহীন করেছেন এবং এমন আইন বাতিল করেছেন, যা আগে সৌদি নারীদের জীবন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করত।
বিন সালমান আরও বড় পরিবর্তন এনেছেন অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজে। সৌদি অর্থনীতি বৈচিত্র্যকরণের চেষ্টা চলছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপক বিনিয়োগ হচ্ছে, বিদেশি পর্যটককে স্বাগত জানানো হচ্ছে এবং সংস্কৃতি ও বিনোদনের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটেছে। এখন সৌদিতে কনসার্ট, সিনেমা, শিল্প প্রদর্শনী সবই হচ্ছে, যা কয়েক বছর আগে বেআইনি ছিল।
মঙ্গলবার (১৮ নভেম্বর) হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি হিসেবে তিনি এমন একটি দেশ পরিচালনা করছেন, যে দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের রূপান্তর দেখেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে তাঁর নেতৃত্ব ও চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে সৌদি আরবে দুই বছর কাটানোর পর আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে, ক্রাউন প্রিন্সের অগ্রাধিকার এখন কোথায়। তিনি আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে চান। তিনি অঞ্চলের অন্তহীন সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চান না। তিনি ইরানের সঙ্গে একধরনের সাময়িক সমঝোতা বজায় রাখতে চান।
২০১৮ সালে বিন সালমান মনে করেছিলেন, যেহেতু সৌদি আরব নানা দিক থেকে আরব বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী দেশ, তাই তিনি চাইলে পুরো অঞ্চলের গতিপথও নির্ধারণ করতে পারবেন। তখন তিনি তরুণ এবং নেতা হিসেবে তুলনামূলকভাবে অনভিজ্ঞ। কিন্তু সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা সব সময় সফল হয়নি। হুতি বিদ্রোহীরা এখনো পরাজিত হয়নি, বরং ইয়েমেনের বড় অংশে তাদের প্রভাব আছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করার পরও সেখানে শিয়া সংগঠন হিজবুল্লাহ আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিরোধীদের দমন করার চেষ্টা উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম, রাজনীতিক ও জনগণের কাছে ক্রাউন প্রিন্সের সম্পর্কে খারাপ ধারণা তৈরি করেছে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে যুবরাজ সালমানকে বুঝতে পেরেছেন, আঞ্চলিক সংঘাতগুলো সহজে সমাধান হয় না। তাই তিনি মনোযোগ ঘুরিয়ে দিয়েছেন নিজের দেশে; অর্থনীতি ও সমাজকে উন্নত করার দিকে। তিনি এই সংঘাতগুলো সৌদি সীমান্ত থেকে দূরে রাখতে চান।
এই আধুনিকায়ন দুটি বিষয়ে নির্ভরশীল, যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রথমটি হলো তেলের উচ্চ দাম, কারণ তার প্রকল্পগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দ্বিতীয়টি হলো, সংঘাত না থাকা। কারণ, যদি ইয়েমেন বা ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র আসে, তাহলে বিনিয়োগকারী বা পর্যটক সৌদি আরবে আসবেন না।
গত এক বছরে দেখা গেছে, এই শর্তগুলো বজায় রাখা কত কঠিন। তেলের দাম কমছে। মার্কিন গাড়িচালক বা প্রেসিডেন্টদের জন্য হয়তো এটি ভালো খবর। কিন্তু যদি লক্ষ্য থাকে তেলনির্ভর অর্থনীতি রূপান্তর করা, উৎপাদন বাড়ানো, শিক্ষা সংস্কার করা বা পর্যটন খাত গড়ে তোলা, তাহলে এটি সালমানের জন্য ভালো খবর নয়। এদিকে অঞ্চলের সংঘাতও থামছে না। হুতিদের হুমকি আছে, সুদানে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চলছে এবং ইরান এখনো বড় হুমকি।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে সৌদি আরবে দুই বছর কাটানোর পর আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে, ক্রাউন প্রিন্সের অগ্রাধিকার এখন কোথায়। তিনি আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে চান। তিনি অঞ্চলের অন্তহীন সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চান না। তিনি ইরানের সঙ্গে একধরনের সাময়িক সমঝোতা বজায় রাখতে চান।
ভূরাজনীতিতে কোনো নিখুঁত নিশ্চয়তা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা একটি ভালো শুরু হতে পারে। ২০২২ সালে একটি বড় চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেটি ছিল যুক্তরাষ্ট্র–সৌদি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি। এর বিনিময়ে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের কথা বলা হয়েছিল। চুক্তিতে অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সহযোগিতা এবং সামরিক অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ও ছিল। এতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অগ্রগতির জন্য কিছু পদক্ষেপও ছিল।
গাজা যুদ্ধ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে কঠিন করেছে এবং চুক্তি স্থগিত হয়েছে। তবু চুক্তি হোক বা না হোক, প্রিন্স সালমান দেশের নিরাপত্তা এবং তেলনির্ভরতা থেকে উত্তরণের পথ সুরক্ষিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। এটিই হবে তাঁর ওয়াশিংটন সফরের মূল বিষয়।
মাইকেল র্যাটনি সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত