বাংলাদেশের নতুন নির্বাচিত সরকার এক অত্যন্ত জটিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি সিপিডি আয়োজিত এক সভায় ব্যবসায়ী নেতাদের কণ্ঠে চরম হতাশা ঝরে পড়েছে। অনেক শিল্পপতির মতে, অদূর ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগের আশা ক্ষীণ। এমনকি আগামী পাঁচ বছরে উৎপাদন খাতে নতুন কর্মসংস্থান হবে কি না, তা নিয়েও তাঁরা সন্দিহান।
এই উদ্বেগ অমূলক নয়। বর্তমানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো একাধিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে—জ্বালানি ও বিদ্যুতের ঘাটতি, জ্বালানির উচ্চ মূল্য, ঋণের সুদহার বৃদ্ধি এবং দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা। গত এক দশকে ঋণনির্ভর সম্প্রসারণের কারণে অনেক কোম্পানির ঋণের বোঝা ইতিমধ্যে অনেক বেশি। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও তারল্য–সংকট ও খেলাপি ঋণের চাপে নতুন করে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হারাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ দ্রুত বাড়বে—এমন আশা করা কঠিন।
নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করেন, কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আর ব্যবসায়ীদের মনোবল বা ‘অ্যানিমেল স্পিরিট’ (অন্তর্দৃষ্টি, আবেগ, আত্মবিশ্বাস বা ভয়ের কারণে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা) ফিরলেই বিনিয়োগ বাড়বে। তাদের বিশ্বাস, আস্থার সংকট কাটলেই অর্থনীতির চাকা আবার ঘুরবে। কিন্তু এই ধারণা অর্থনীতির গভীর কাঠামোগত বাস্তবতাকে এড়িয়ে যায়। বিনিয়োগ কেবল মনোভাব বা আস্থার ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের ব্যালান্স শিট, ঋণ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপর। বর্তমান বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণ বুঝতে হলে আমাদের আগে বুঝতে হবে কীভাবে বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোটি তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০১৩-১৪ সময়েও বাংলাদেশ একই ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল। আমার ‘উন্নয়ন বিভ্রম’ গবেষণায় একে ‘ব্যালান্স শিট রিসেশন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছি। এমন সময়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নতুন বিনিয়োগের চেয়ে পুরোনো ঋণ পরিশোধ বা ব্যালান্স শিট মেরামতে বেশি মনোযোগী হয়। তৎকালীন সরকার কিছু বিশেষ কৌশলে প্রবৃদ্ধি ফেরালেও সে প্রক্রিয়াই আজকের কাঠামোগত সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘ব্যালান্স শিট রিসেশন’ ধারণাটি প্রথম বিশ্লেষণ করেন জাপানের নোমুরা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ রিচার্ড সি কু। ১৯৯০-এর দশকে জাপানের সম্পদবাজারের বুদ্বুদ ভেঙে পড়ার পর কেন সুদের হার কম থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ বাড়ছিল না—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি এই ধারণা তুলে ধরেন। কু দেখান, বড় কোনো সম্পদবাজারের বুদ্বুদ ধসে পড়ার পর প্রতিষ্ঠান ও পরিবারগুলো নতুন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করার পরিবর্তে নিজেদের ব্যালান্স শিট মেরামতে মনোযোগ দেয়, অর্থাৎ পুরোনো ঋণ পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে প্রস্তুত থাকলেও এবং সুদের হার খুব কম হলেও বেসরকারি খাত নতুন ঋণ নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে ধীর করে দেয়।
২০১৪–১৫ সালের ব্যালান্স শিট রিসেশন মোকাবিলায় তখনকার সরকার নানা নীতি পলিসি গ্রহণ করে। সেই সময়কার কৌশলের প্রথমটি ছিল ঘাটতি বৃদ্ধি করে ঋণ গ্রহণ ও রাজস্ব ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া। ‘রেভিনিউ-টু-স্পেন্ডিং রেশিও’, অর্থাৎ আয় থেকে ব্যায়ের অনুপাত, ৬০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। অর্থাৎ, ২০১৫ সালের আগে, প্রতিটি সরকার প্রতি ১০০ টাকা আয়ের বিপরীতে ৬০ টাকা ঋণ গ্রহণ করে, ১৬০ টাকা খরচ করলেও ২০১৫ সালের পর প্রতি ১০০ টাকা আয়ের বিপরীতে ৮০ টাকা ঋণ করে, ১৮০ টাকার ওপরে ব্যয় করে।
আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারও একটি ব্যালান্স শিট রিসেশনের লক্ষণ দেখাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ঋণের চাপে নতুন বিনিয়োগে অনীহা দেখাচ্ছে। ব্যাংকগুলো দুর্বল হওয়ায় নতুন ঋণ সরবরাহ করতে পারছে না। অন্যদিকে জ্বালানিসংকট ও ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প উৎপাদনকে আরও কঠিন করে তুলছে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়। বাংলাদেশের সরকারি বেতনভুক্ত কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ, যাঁরা সরাসরি প্রায় এক কোটি পরিবারের সদস্যকে সমর্থন করে। ফলে সরকারি বেতনকাঠামোর পরিবর্তন দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বেতন বৃদ্ধি মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ এনে দেয় এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি পায়।
তৃতীয়ত, সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৫ শতাংশ সুদের বিশেষ ঋণসুবিধা চালু করা হয়, যা স্থবির হয়ে পড়া আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে বড় ভূমিকা রাখে। আবাসন খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং এটি অর্থনীতিতে তারল্য প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেলে পরিণত হয়।
চতুর্থত, দীর্ঘ সময় ধরে নেতিবাচক প্রকৃত সুদের হার বজায় ছিল। যখন মূল্যস্ফীতি সুদের হারের চেয়ে বেশি হয়, তখন কার্যত ঋণ নেওয়া ভর্তুকিপ্রাপ্ত হয়ে যায়। এর ফলে ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি পায় এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাপক ঋণ সম্প্রসারণ ঘটে। বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং কিছু দেশীয় কনগ্লোমারেট (বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী) কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যাদের প্রধান বাজার ছিল অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়।
সবশেষে রাজনৈতিক প্রভাবে ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাট ও ঋণ বিতরণকে একধরনের অঘোষিত পুঁজি সরবরাহ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এসব নীতির সম্মিলিত প্রভাবে অর্থনীতিতে একটি ঋণনির্ভর ও ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধির চক্র তৈরি হয়। স্বল্প মেয়াদে এটি অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করলেও দীর্ঘ মেয়াদে বেশ কিছু কাঠামোগত সমস্যা তৈরি করে। বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়, করপোরেট ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। আমি উন্নয়ন বিভ্রম বইয়ে এই প্রবৃদ্ধির মডেলকে ‘হাসিনোমিক্স’ বলে উল্লেখ করেছি।
আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারও একটি ব্যালান্স শিট রিসেশনের লক্ষণ দেখাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ঋণের চাপে নতুন বিনিয়োগে অনীহা দেখাচ্ছে। ব্যাংকগুলো দুর্বল হওয়ায় নতুন ঋণ সরবরাহ করতে পারছে না। অন্যদিকে জ্বালানিসংকট ও ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প উৎপাদনকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার সেসব সুবিধা আর পাচ্ছে না, যা এক দশক আগে ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নেতিবাচক সুদহার বজায় রাখা সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতে পর্যাপ্ত তারল্য নেই এবং রাজস্ব সক্ষমতাও সংকুচিত। তাই আগের সেই ‘পলিসি প্লেবুক’ বা নীতিমালার পুনরাবৃত্তি এখন অসম্ভব।
নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অর্থনীতির কাঠামোগত পুনর্গঠন। প্রথমত, ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল ও সংস্কার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট মিটিয়ে শিল্পের চাকা সচল করতে হবে। তৃতীয়ত, ঋণের ভারে ন্যুব্জ কোম্পানিগুলোর ব্যালান্স শিট পুনর্গঠনে সহায়তা দিতে হবে। সবশেষে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেল থেকে বিনিয়োগনির্ভর ও উৎপাদনশীল প্রবৃদ্ধির দিকে অগ্রসর হতে হবে।
নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জটি কেবল বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর নয়; বরং গত এক দশকের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা দূর করার। যদি আমরা আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি এড়াতে চাই, তবে প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে একটি শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরির ওপর।
জিয়া হাসান অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পলিসি অ্যাডভাইজার
* মতামত লেখকের নিজস্ব