জার্মানির আধুনিক ইতিহাসের আলোচনায় অ্যাডলফ হিটলারের যুগ একটি বিতর্কিত বিষয়। ওই যুগের মূল্যায়ন আজও শেষ হয়নি।
নাৎসি জার্মানির অধ্যায়কে অনেক ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ কালো অধ্যায় বলে বিবেচনা করেন।
আবার হিটলার যুগে কীভাবে জার্মানিতে তার ফ্যাসিবাদী রাজনীতির এত অনুসারী হয়েছিল, সেই আলোচনা এখনো হচ্ছে।
আলোচনার কারণ জার্মানিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল এএফডি বা জার্মানির জন্য বিকল্প দলটি।
জার্মানির বড় দুই দল ও জোট সরকারের ক্ষমতাসীন ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক দল ও সামাজিক গণতান্ত্রিক দলকে পেছনে ফেলে জনপ্রিয়তাই এখন তারা শীর্ষে।
জার্মান পার্লামেন্টে কট্টরবাদী এই জার্মানির জন্য বিকল্প দলটির রয়েছে ১৫০ জন সাংসদ। জার্মানির ২১তম পার্লামেন্টে তারা এখন প্রধান বিরোধী দল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর ১৯৪৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অ্যাডলফ হিটলারের গড়া ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক জার্মান শ্রমিক দল’কে (এনএসডিএপি) নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
সেই নাৎসি দলটির আদর্শ ও কর্মসূচি ছিল উগ্র জাতিবিদ্বেষ এবং জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি গণতন্ত্র ও প্রগতিশীল দল–মত ও ব্যক্তিকে বন্দী করে নির্যাতন–হত্যা।
দলটি ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে একমাত্র অনুমোদিত দল হিসেবে তথাকথিত তৃতীয় রাইখ বা জার্মান সাম্রাজ্যের ওপর চেপে বসেছিল।
২০২৫ সালে জার্মানির ২১তম নির্বাচনে অ্যাডলফ হিটলারের সেই দলটির অনুরূপ না হলেও তাদের নব্য প্রেতাত্মারা নির্বাচনে বড় রকমের সাফল্য পেয়েছে।
জার্মান পার্লামেন্টের ৬৩০টি আসনের মধ্য নব্য নাৎসি কট্টরবাদী অলটারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ড (এএফডি) বা জার্মানির জন্য বিকল্প দলটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে।
দেশ শাসন না করতে পারলেও দলটি জার্মান পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছ। আর জনজরিপে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল।
বিশ্বজুড়ে ধর্ম–বর্ণ–জাতীয়তাবাদী কট্টর রাজনীতি এখন আর নতুন কিছু নয়। ইউরোপের দেশে দেশে এই কট্টরবাদী রাজনীতির উত্থান ছড়িয়ে পড়েছে।
হিটলারের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির অদলবদল ঘটিয়ে ইউরোপের নানা দেশেই তারা জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়েছে। ইতালি, হাঙ্গেরি ও হল্যান্ডে তারা ক্ষমতাসীন।
ফিনল্যান্ডে ক্ষমতায় শরিক দল। এ ছাড়া সুইডেন, স্লোভাকিয়া ও ক্রোয়েশিয়াতে ডানপন্থী দলের সমর্থনে সরকার পরিচালিত হচ্ছে।
জার্মানিতে জেডডিএফ টেলিভিশনের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, কট্টরবাদী জার্মানির জন্য বিকল্প দলটির জনপ্রিয়তা ২৮ শতাংশ।
ক্ষমতাসীন জোট ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক দল ও সামাজিক গণতান্ত্রিক দল দুটির জনপ্রিয়তা ২৪ ও ১৩ শতাংশ।
ইউরোপের নানা দেশে এবং জার্মানিতে কট্টরবাদী দলগুলো আশ্চর্যজনকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
এসব দেশেই রক্ষণশীল দলগুলো তাদের জনপ্রিয়তার প্রশ্নে প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করছে।
নিজেদের দেশের সামাজিক সমস্যার কথা বলে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে অসন্তোষ, নিজেদের জাতিকে শ্রেষ্ঠ ও বীর হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা, সর্বশেষ ইউরোপের বাইরে থেকে আসা অভিবাসী ও শরণার্থীদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ছড়ানো ও ইসলামবিদ্বেষ।
আর জার্মানির ক্ষেত্রে করোনা–পরবর্তী অর্থনীতি, পাশাপাশি রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মুদ্রাস্ফীতি, প্রতিরক্ষা খাতে বড় ব্যয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনগ্রসরতা, শরণার্থী ও অভিবাসীদের নিয়ে বিতর্কে অনেক ভোটার জার্মানির কট্টরবাদী দলটির দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
আবার মূলধারার বড় দল সামাজিক গণতান্ত্রিক দল ও ক্রিশ্চিয়ান গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন বর্তমান সমাজ ও রাজনীতি এবং বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে সঠিক যুক্তি জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারছে না।
জার্মানির রাজনীতিতে তাদের এই দৈন্য ভোটারদের কট্টরবাদী দল অলটারনেটিভ ফর ডয়েচল্যান্ডমুখী করছে।
জার্মানির নব্য নাৎসি কট্টরবাদী দল এএফডি এবং যুব সংগঠন ‘ইয়ং অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’কে বিভিন্ন রাজ্যে সহিংস দল হিসেবে জার্মানির সাংবিধানিক সুরক্ষা বা সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
তবে তারা নিষিদ্ধ দল নয়। গত বছর মার্চ মাসে আদালত তাঁদের রায়ে বলেছেন, এএফডি দলটি নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর মানবিক মর্যাদা ও গণতন্ত্রের নীতির বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। শুধু অভিবাসন পটভূমিতে থাকা জার্মান নাগরিকদের বিষয়ে তাদের অবমূল্যায়িত রাজনীতি আইনবহির্ভূত।
এ ধরনের বৈষম্যমূলক প্রচার-প্রচারণা ও রাজনীতি জার্মান সংবিধানের মৌলিক আইনে অনুমোদিত নয়। বিষয়টি মানবিক মানমর্যাদার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বেমানান ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
আদালত বলছেন ‘জনগণের জাতিগত-সাংস্কৃতিক ধারণা’ বিষয়ে শরণার্থী, অভিবাসী ও মুসলমানদের প্রতি এএফডি দলটি অবজ্ঞা ও অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করছে। আদালত বিষয়টিকে গণতন্ত্রবিরোধী প্রচেষ্টার ইঙ্গিতও রয়েছে বলে মনে করছেন।
জার্মান সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘মানুষের মর্যাদা অলঙ্ঘনীয়।’ এর অর্থ হলো জার্মানির প্রতিটি মানুষের সমান মর্যাদা রয়েছে।
প্রত্যেককে সম্মানের সঙ্গে আচরণ করতে হবে এবং সবার সমান অধিকার রয়েছে। এই অনুচ্ছেদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি এখানকার সমাজব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তি।
আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সব মানুষের মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা। বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সংখ্যালঘুরা অন্যদের তুলনায় বৈষম্যের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
জার্মানির ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান রাইটস সম্প্রতি জানিয়েছে, ‘অলটারনেটিভ ফর জার্মানি’ দলটি মানুষকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ায়।
এরা গণতন্ত্র বিলুপ্ত করতে চায় আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট কৌশল অনুসরণ করে। তারা কিছু মানুষকে বেছে নিয়ে দাবি করে যে এই মানুষগুলো জার্মানির জন্য ক্ষতিকর।
দলটি এসব মানুষের বিরুদ্ধে নিয়মিত অপমানজনক ও নেতিবাচক বক্তব্য দেয়। তারা তাদের সভা-সমাবেশে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা টিকটকে বারবার এসব কথা প্রচার করে, যাতে যত বেশি সম্ভব মানুষ এগুলো বিশ্বাস করে।
একই সঙ্গে তারা দাবি করে যে কেবল তারাই সাধারণ জনগণের প্রকৃত চাওয়া–পাওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে এবং তারাই জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে।
তারা কিছু মানুষকেও দেশ থেকে বের করে দেওয়া উচিত বলে মনে করে। তাদের যুক্তি হলো এসব মানুষ নাকি ‘জার্মান সংস্কৃতির’ অংশ নয়। যারা শ্বেতাঙ্গ নয়, এমন বর্ণের মানুষের সম্পর্কেও তারা অবমাননাকর মন্তব্য করছে। এ ছাড়া তারা দাবি করে যে মুসলমানরা বিপজ্জনক। এই কট্টরবাদী দলটি ইতিমধ্যেই জার্মানির কিছু রাজ্য পরিষদের নির্বাচনে তারা সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা জার্মানির জন্য বিকল্প দলটি ক্রমেই আরও উগ্র ও কঠোর হয়ে উঠেছে।
তারা বলছে, জার্মানিতে কারা থাকতে পারবে আর কারা নয় বা কাকে ‘জার্মান’ বলা যাবে, তা তারা নির্ধারণ করতে চায়। তাদের মতে, জার্মান পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও সবাই প্রকৃত জার্মান নন।
তারা কিছু মানুষকেও দেশ থেকে বের করে দেওয়া উচিত বলে মনে করে। তাদের যুক্তি হলো এসব মানুষ নাকি ‘জার্মান সংস্কৃতির’ অংশ নয়। যারা শ্বেতাঙ্গ নয়, এমন বর্ণের মানুষের সম্পর্কেও তারা অবমাননাকর মন্তব্য করছে। এ ছাড়া তারা দাবি করে যে মুসলমানরা বিপজ্জনক।
এই কট্টরবাদী দলটি ইতিমধ্যেই জার্মানির কিছু রাজ্য পরিষদের নির্বাচনে তারা সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে আসার অর্থ এই নয় যে দলটি গণতান্ত্রিক। তাদের দলীয় গঠনতন্ত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা জার্মানির বর্তমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করতে চায়।
তাদের প্রধান লক্ষ্য যত বেশি সম্ভব রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করা এবং জার্মানির রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করা। তা জানিয়েছে, জার্মানির ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান রাইটস।
পৃথিবীর সব জাতির কিছু না কিছু ধূসর সময় থাকে, থাকে স্বর্ণ সময়। তবে জার্মান জাতির ধূসর সময়ের পাল্লা একটু বেশি।
অর্ধশতাব্দী সময়ের মধ্যে পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের দায়ভার যে জাতির কাঁধে, সেই দেশ আবারও ভর করতে চলেছে একটি নব্য ফ্যাসিস্ট দলের কাঁধে। জার্মানির গণতন্ত্রের আকাশে আবারও দেখা যাচ্ছে আঁধার করা মেঘ।
সরাফ আহমেদ প্রথম আলোর জার্মান প্রতিনিধি
