ভারতবিরোধী ‘রেটরিক’ নয়, চাই জাতীয় সক্ষমতা

ভারতের বাজার, ভারতের কাঁচামাল, আর ভারতের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি নিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা রেখে দাঁড়ানো কি সম্ভব? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন মাহা মির্জা

নির্বাচনী জোট আর ভারতবিরোধী রাজনীতির ডামাডোলে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ইস্যু বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পায়নি। গত ২৭ ডিসেম্বর দেশের সুতা মিলের মালিকেরা জরুরি মিটিং ডেকেছিলেন। তাঁরা সরকারের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন দেশের সুতা মিলগুলোকে ভারতীয় আমদানির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য।

আমাদের পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশের বেশি সুতা আসে ভারত থেকে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো কাঁচামালের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। এর মানে কি এই যে আমাদের সুতা নেই, ভারতের সুতাই ভরসা? মোটেও তা নয়। আমাদের শিল্প অঞ্চলগুলোয় প্রায় ৫০০ সুতা কারখানা আছে। অথচ ভারতীয় সস্তা সুতা আমদানিতে দেশের সুতা কারখানাগুলো ধ্বংসের পথে। গত অর্থবছরে ভারতীয় সুতা আমদানি বেড়েছে ১৩৭ শতাংশ!

ভারতের সুতা আমাদের দেশীয় কারখানার সুতার চেয়ে সস্তা। কেজিতে ২ দশমিক ৭ ডলার। এদিকে লোকাল সুতা কেজিতে ৩ ডলার। যখন ‘ইনসেনটিভ’ ছিল, দামের পার্থক্য ছিল মাত্র ৫ সেন্ট। এখন পার্থক্য ৩০ সেন্ট। খুব স্বাভাবিকভাবেই গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা খরচ বাঁচাতে ‘ঢাকা’র সুতা বাদ দিয়ে ‘দিল্লি’র সুতাই কিনছেন। বিটিএমএ বলছে, এক বছরে বন্ধ হয়েছে ৫০টির বেশি সুতা কারখানা। চাকরি হারিয়েছেন দেড়-দুই লাখ শ্রমিক। অর্থাৎ ভারতীয় সস্তা সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারছে না দেশের সুতা মিল।

আরও পড়ুন

এখন যদি প্রশ্ন করি, দেশীয় সুতার উৎপাদন খরচ বেশি কেন? ভারতের খরচ কম কেন? আমরা অদক্ষ, অপদার্থ, আর ভারত দক্ষ, তাই? তা এই দক্ষতা, এই ‘এফিশিয়েন্সি’ কি আকাশ থেকে পড়ে, নাকি তৈরি করতে হয়? ভারতের আছে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা, বিনিয়োগ আর ভর্তুকির ধারাবাহিক ইতিহাস। ভারতের সুতা মিলগুলো ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা পায়, প্রযুক্তি আধুনিকায়নে তহবিল পায়। কিন্তু ভারতীয় সুতার হাত থেকে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো বাঁচাতে কী করেছে আমাদের ‘আধিপত্যবাদবিরোধী’ সরকার?

আগে স্থানীয় সুতা উৎপাদনে নগদ প্রণোদনা ছিল ৫ শতাংশ। সেটা কমিয়ে করা হলো ১ দশমিক ৫ শতাংশ। স্বভাবতই উৎপাদন খরচ বাড়ল, দামও বাড়ল। গার্মেন্টসের মালিক বেশি দামের দেশি সুতা কিনবে কেন? গার্মেন্টসওয়ালাদের ‘ভারতীয় দালাল’ বলে গালি দিয়ে আসতে পারেন, কিন্তু গার্মেন্টসের মালিক দিন শেষে ব্যবসায়ী, সস্তা ভারতীয় সুতাটাই সে কিনবে।

‘ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ’ তৈরি করার দায়িত্ব পোশাকশিল্পের মালিকের নয়। যে তরুণ শাহবাগে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে, এটা তার কাজও না। এটা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকের কাজ। তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকে সরকারি ‘ইন্টারভেনশনে’। অথচ কী ভীষণ দুর্ভাগ্যজনক, একদিকে ইন্টেরিম আমলেই ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ২ বিলিয়ন ডলারের সুতা আর অন্যদিকে ১২ হাজার কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ স্থানীয় সুতার স্টক অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে! বিটিএমএ বলছে, সুতা মিলগুলো বাঁচাতে আমদানি করা সুতায় অন্তত ৩০ সেন্ট শুল্ক বসাতে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের সাড়াশব্দ নেই।

অর্থাৎ একদিকে আমরা ভারতীয় আধিপত্যবাদ ঠেকাতে চাই, আরেক দিকে হাজার হাজার কোটি টাকার দেশীয় সুতার স্টক ফেলে ভারতীয় সুতা আমদানি করি। এটা কি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধিতা, নাকি নিজেদের কৌশলগত সক্ষমতা তৈরিতে চরম ব্যর্থতা ও অদূরদর্শিতা? শুধু সুতাশিল্প নয়, আরও বহু শিল্পের ক্ষেত্রেই একই অবস্থা। 

বিয়ের মৌসুমে ঢাকা না দিল্লি?

দেশে এখন বিয়ের মৌসুম চলছে। প্রতিদিন শত শত বিয়ে হচ্ছে শুধু রাজধানীতেই। খোঁজ নিন, বিয়েবাড়ির লোকেরা কোন দেশের শাড়ি বা লেহেঙ্গা বা কুর্তা পরছে? ঢাকার না দিল্লির? এখানে ঢাকা ঢাকা স্লোগান দিয়ে লাভ নেই। মিরপুর বেনারসিপল্লিতে গিয়ে খোঁজ নিলেই ঢাকাই শাড়ির করুণ অবস্থাটা টের পাওয়া যায়।

বেনারসিপল্লি করাই হয়েছিল দেশীয় তাঁতিদের সুরক্ষা দিতে। অথচ ঢাকার এই পল্লির ৬০ শতাংশ শাড়ি আসে ভারত থেকে। অর্থাৎ ঢাকাই তাঁতিদের প্রাণকেন্দ্রেই ঢাকাই কাতানের বদলে বিক্রি হচ্ছে ভারতীয় কাঞ্জিভরম, ভারতীয় বেনারসি। ধনীরা যেমন কিনছে, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তরাও কিনছে। মূল কারণ ওই একটাই, ভারতীয় শাড়ির উৎপাদন খরচ কম। দামও কম। কিন্তু ভারতীয় সুতা ও শাড়ির উৎপাদন খরচ কি এমনি এমনি কমেছে, নাকি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের ধারাবাহিক পলিসির কারণে কমেছে?

ভারত নিজেদের ‘হ্যান্ডলুম’ ইন্ডাস্ট্রি টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করেছে, প্রণোদনা দিয়েছে, প্রযুক্তি আধুনিকায়নে সহজ শর্তে ঋণ দিয়েছে। আর আমরা কী করেছি? ১০ লাখ কারিগরের রুটিরুজির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটা অমিত সম্ভাবনাময় শিল্পকে বাজারের হাতে ছেড়ে দিয়েছি। দেশের মার্কেট ছেয়ে গেছে ভারতীয় শাড়িতে। কয়েক দশকের সুনিপুণ কারুকার্যের দক্ষতা নিয়ে ৭ লাখ তাঁতি কাজ হারিয়েছেন, কেউ হকারি করছেন, কেউ অটোরিকশা কিনেছেন।

আরও পরিহাসের বিষয় হলো অটোরিকশার পার্টসগুলো পর্যন্ত আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে! ইঞ্জিন, বিয়ারিং, শকার, জয়েন্ট—সবই আসছে ভারতীয় ব্র্যান্ড বাজাজ এবং লুম্যাক্স থেকে। স্থানীয় মেকানিকরা কম দামি ভারতীয় যন্ত্রাংশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারে না। এখানেও সেই একই কারণ। ভারতে অটোরিকশাশিল্পের বিকাশই হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রণোদনায় (ডিজেলচালিত যানবাহনের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বাহনের প্রসার ঘটাতে)। এদিকে আমরা লাখে লাখে ভারতীয় পার্টস আমদানি করছি ঠিকই, কিন্তু দরিদ্র মানুষ অটোরিকশা কিনে রাস্তায় নামলে বুলডোজার চালাচ্ছি!

দেশের পাটকল বন্ধ, ভারতে পাটশিল্পের বিকাশ

আমাদের কাঁচা পাটের বৃহত্তম বাজার ভারত। ভারত পাটশিল্পের এমন প্রসার ঘটিয়েছে যে নিজেরা উৎপাদক হলেও বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট কিনছে। অথচ এই দেশের পাটচাষিদের কষ্টে ফলানো পাট এই দেশের শিল্পায়নে কাজে লাগার কথা ছিল না? আমরা ভুলিনি, আমাদের একশ্রেণির মিডিয়া, অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী ভর্তুকির ধুয়া তুলে রাষ্ট্রীয় ২৬টি কারখানা বন্ধ করার পক্ষে জনমত তৈরি করেছিলেন। অথচ এখন খুলনা, যশোর ও ডেমরার বৃহত্তম পাটকলগুলো পরিকল্পিতভাবে বন্ধ করে দিয়ে কাঁচা পাট বিক্রির জন্য সেই ভারতের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।

এদিকে ভারত এ দেশের কাঁচা পাট কিনে নিজেদের পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছে, ‘ভ্যালু এডিশনে’ বিনিয়োগ করেছে, সরকারি করপোরেশনগুলোয় দেশীয় পাটপণ্যের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে এবং পাশাপাশি ‘হাই-এন্ড’ পাটপণ্যের বৈশ্বিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। বলা বাহুল্য, এগুলো বিচ্ছিন্ন পলিসি নয়; বরং জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করা নেহরুর আমল থেকেই প্রতিটি ভারত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

অন্যদিকে আমাদের রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলোয় ৫০ বছরে কোনো নতুন বিনিয়োগ হয়নি। অথচ কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের মূল শক্তির জায়গা ছিল কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন। পাট, চিনি, ডেইরি, পোলট্রি, ফিশারি এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ। কিন্তু আমরা আমাদের সচল কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়ে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সের দরে বেচে দিয়েছি (ঘুরে আসুন, খালিশপুর, প্লাটিনাম ও ক্রিসেন্ট জুটমিল)।

একদিকে আমাদের লাখ লাখ চাকরির গল্প শোনানো হয়েছে; অন্যদিকে আমাদের মাটি, পানি, জলবায়ু ও স্থানীয় দক্ষতায় তৈরি হওয়া লাখো শ্রমিকের ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে, যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো, সক্ষমতাসহ এমন কিছু ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যাঁদের ১০০ লোকের কাজ তৈরি করার সক্ষমতা নেই। ফল—ধসে পড়েছে দক্ষিণের গোটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্ট।

রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনৈতিক আধিপত্যবাদ ঠেকানো যায়?

ভারতীয় আধিপত্যবাদ ঠেকাতে চাইলে লাখো শ্রমিকের পাটকল, চিনিকল বাঁচানোর আন্দোলন করা দরকার ছিল না? স্কপ ও বিজিএমসি থেকে ক্রমাগত সুপারিশ গেছে, মাত্র ১ হাজার ২০০ কোটি বিনিয়োগ করুন, প্রযুক্তি ‘আপগ্রেড’ করুন, সেকিং/হেসিয়ান তাঁতের বদলে আধুনিক তাঁত বসান, স্পিনিং-ব্যাচিং বিভাগে আধুনিক যন্ত্র বসান, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ান, পাট ক্রয়ে মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি কমান; মোটকথা সংস্কার করুন।

রাষ্ট্র বিনিয়োগ না করলে ‘মডার্ন’ ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়ায় না—এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়? যারা মনে করে বাজার একটি অরাজনৈতিক ‘ম্যাজিক’, ‘ফ্রি মার্কেটের’ হাতে ছেড়ে দিলে এমনি এমনিই ইন্ডাস্ট্রি তৈরি হয়ে যায়, তারা কি ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া বা ভারতের শিল্পায়নের ইতিহাসটা একটু ঘেঁটে দেখবেন?

ভর্তুকির দোহাই তুলে ভারতের হাতে চলে গেল বাংলাদেশের কাঁচা পাট। অথচ সেই ভারতের পাটকল, কাগজকল, টেক্সটাইলশিল্প, ওষুধশিল্প, জাহাজশিল্প, ইস্পাতশিল্প, পেট্রোকেমিক্যাল, সার কারখানা, বিমান, টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি—এই সবকিছুর পেছনেই আছে দীর্ঘ কয়েক দশকের রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও ভর্তুকির রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মার্কিন মুলুকে একটিও ফুড চেইন, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প বা ব্যাংক-বিমা নেই, যারা ধারাবাহিকভাবে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পায়নি। ওয়াল-মার্ট, জেপি মরগান, ফেডেক্স, নাইকি, নেস্‌লে, আইবিএম, ইন্টেল, ম্যাকডোনাল্ডস, পিৎজা হাট, কেএফসি, বার্গার কিং, ডোমিনোস পিৎজা—কে পায় না ফেডারেল সরকারের ভর্তুকি?

এই যে আমরা স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশে অ্যামাজন আসবে, অ্যাপল আসবে, ডেল-এইচপি-স্যামসাং-লেনোভা-গুগল আসবে। একটু গুগল করেই দেখুন না, এই কোম্পানিগুলো ঠিক কী পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পায়? বোয়িং থেকে ১৪টি বিমান কিনবে বাংলাদেশ, তো বোয়িং বা এয়ারবাস কি এমনি এমনি লাভ করে? নাকি এদের টিকে থাকার পেছনে আছে বিলিয়ন ডলারের ফেডারেল ভর্তুকি? জেনারেল মোটর, ফোর্ড কিংবা বিএমডব্লিউ তাদের ‘এসেম্বলি লাইন’ বসাতে ভর্তুকি পায় না? বৈদ্যুতিক গাড়িকে উৎসাহিত করতে টেসলাকে ভর্তুকি দেওয়া হয়নি (টেসলা তো স্বীকারও করে যে ফেডারেল ভর্তুকি ছাড়া টেসলার পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হতো না)?

ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, নরওয়ে, দক্ষিণ কোরিয়া বা দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো পাবলিকের ট্যাক্সের টাকাতেই শিল্পায়ন করেছে। গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে টানা ভর্তুকি দিয়েছে, স্বল্প সুদে ব্যাংকঋণ দিয়েছে, আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছে, প্রযুক্তি খাতে বাজেট বাড়িয়েছে, ‘কৌশলগত’ খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ লাভ-লোকসানের হিসাব নয়, জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে জড়িত কৌশলগত শিল্পগুলোকে গড়ে তোলা, টেনে তোলা বা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই এসব ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তাবৎ শিল্পোন্নত দেশের ইতিহাস ‘ফ্রি মার্কেটের’ অরাজনৈতিক ইতিহাস নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি ও বিনিয়োগের রাজনৈতিক ইতিহাস। 

অন্যদিকে আমরা আধিপত্য মোকাবিলার কথা বলে বাজার ছেড়ে দিয়েছি তথাকথিত ‘ফ্রি মার্কেটের’ হাতে। ভারতীয় হোক, চীনা হোক আর মার্কিন হোক, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া শক্তিশালী আধিপত্যবাদ মোকাবিলা করা কি সম্ভব? ভারতের বাজার, ভারতের কাঁচামাল আর ভারতের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি নিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা রেখে দাঁড়ানো সম্ভব?

আমাদের হাজার কোটি টাকার সুতার মজুত পড়ে থাকবে আর আমরা পোশাকশিল্পের সুতা আনব ভারত থেকে? আমাদের চিনিকলগুলো বন্ধ থাকবে, আর আমাদের রিফাইনারিগুলো কাঁচা চিনি আনবে ভারত থেকে? আমাদের বেনারসিপল্লি চলবে ভারতের বেনারসি দিয়ে, অটোরিকশার পার্টস আর ট্রাক্টর আসবে ভারত থেকে, আমাদের ৮০ শতাংশ পাটের বীজ আসবে ভারত থেকে, আমরা স্বনির্ভর হওয়ার পথে একটা আলাপও দেব না; কিন্তু মুখে মুখে শুধু ভারতবিরোধিতা করব?

আমাদের লাখো শ্রমিক দেশের ইন্ডাস্ট্রিগুলো বাঁচানোর জন্য প্রাণপণে লড়াই করেছেন, কাজ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, জেলে গেছেন, কিন্তু সেই দীর্ঘ লড়াইয়ে আমরা ভুলেও শরিক হইনি। দেশের সুতা মিল বাঁচাতে টুঁ শব্দ করিনি, অথচ এখন ভারতনির্ভর একটা অর্থনীতি জিইয়ে রেখে শুধু স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতি দিয়ে আমরা ভারতকে ঠেকাব?

‘ঢাকা না দিল্লি’ একটি শক্তিশালী স্লোগান। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘ সময় ধরে এই স্লোগান আমরা দিয়েছি। আমরা বরাবর বলেছি, ভারতের সঙ্গে হাসিনার নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, বিএসএফের সীমান্ত হত্যা, ফেলানী হত্যা, জ্বালানি খাতে আদানির আধিপত্যবাদী চুক্তি, তিস্তার পানির বণ্টন, অন্যায্য ট্রানজিট চুক্তি, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ভারতের নিম্নমানের কয়লার ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ডে’ পরিণত করা—এসব অন্যায্য বন্দোবস্ত মোকাবিলা করতে হলে অর্থনীতির একটা স্বনির্ভর ভিত্তি লাগে। জাতীয় সক্ষমতা লাগে। ভারতনির্ভরশীলতা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পলিসি লাগে। অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিল্লির হাতে তুলে দিয়ে মুখে ‘ঢাকা ঢাকা’ বললে জনতুষ্টিবাদের রাজনীতি হয়, আধিপত্যবাদ ঠেকানো যায় না।

  • মাহা মির্জা শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব