বিশ্লেষণ
বাংলাদেশি ডায়াসপোরা: জাতীয় উন্নয়নে প্রবাসীদের যুক্ত করা কেন জরুরি
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই সম্পৃক্তকরণের কৌশল, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন মোবাশ্বের মোনেম। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।
প্রবাসে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সাধারণত নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি (এনআরবি) বলা হয়। এই শব্দটি এমন সব বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষকে নির্দেশ করে, যাঁরা অস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে বিদেশে অবস্থান করছেন। তবে এই আলোচনার মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেই বাংলাদেশিদের ওপর, যাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও মহাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন এবং নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মসহ বাংলাদেশের সঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। স্থায়ীভাবে বিদেশে অবস্থানকারী এই জনগোষ্ঠীকে সাধারণভাবে ‘বাংলাদেশি ডায়াসপোরা’ বলা হয়।
বাংলাদেশের উন্নয়নে এই ডায়াসপোরা কমিউনিটির সম্ভাবনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তাঁরা বিদেশে অর্জিত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং পেশাগত সক্ষমতার মাধ্যমে দেশের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। ধারণা করা হয়, বর্তমানে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিদেশে বসবাস করছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি বিশ্বের প্রায় ১৬২টি দেশে নাগরিকত্ব বা বৈধ কাগজপত্রসহ স্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন।
উল্লেখযোগ্য গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, কানাডা, স্পেন, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ড। এ ছাড়া সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কয়েকটি রাষ্ট্র এবং পূর্ব ইউরোপের দেশ—যেমন বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র, স্লোভাকিয়া, রোমানিয়া ও পোল্যান্ডেও বাংলাদেশিদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। অন্যদিকে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশে বাংলাদেশিদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, যদিও দক্ষিণ আফ্রিকা এ ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখযোগ্য।
কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা কিংবা উন্নত জীবনযাত্রার প্রত্যাশায় তাঁরা বিদেশে গেলেও অধিকাংশের মধ্যেই বাংলাদেশের প্রতি গভীর আবেগ ও আত্মিক বন্ধন বিদ্যমান। এই অনুভূতি থেকেই তাঁরা নিজেদের মাতৃভূমির সঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেন। বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশ তাদের ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর গুরুত্ব অনুধাবন করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাঁদের সম্পৃক্ত করার জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
রেমিট্যান্সের পাশাপাশি ডায়াসপোরা সদস্যরা সরাসরি বিনিয়োগ, দাতব্য কার্যক্রম, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জ্ঞান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যদি সরকার এ বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে—এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
বাংলাদেশে ডায়াসপোরা সম্পৃক্ততার বর্তমান অবস্থান
বাংলাদেশেও প্রবাসীদের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ২০০১ সালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই মন্ত্রণালয়ের প্রধান উদ্দেশ্য বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা। এর অধীনে ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি), ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিএমইটি বিদেশি শ্রমবাজার সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য নিবন্ধন, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষণে কাজ করে। অন্যদিকে বোয়েসেল একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি করা হয় এবং বিদেশি নিয়োগকর্তাদের জন্য দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক সরবরাহ করা হয়।
এ ছাড়া রয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, যার উদ্দেশ্য হলো বিদেশে যেতে আগ্রহী কর্মীদের জামানতবিহীন ঋণ প্রদান এবং বিদেশ থেকে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা। এই ব্যাংক অভিবাসী কর্মীদের জন্য ঋণ, সঞ্চয় এবং রেমিট্যান্স–সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা প্রদান করে। পাশাপাশি ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড প্রবাসী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের কল্যাণে বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে প্রি-ডিপারচার ব্রিফিং, হটলাইন সেবা, মৃত শ্রমিকদের মরদেহ দেশে আনা, অসুস্থ বা বিপদগ্রস্ত কর্মীদের সহায়তা এবং তাঁদের পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আধুনিক প্রযুক্তির কারণে প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের উন্নয়নে একটি বিশাল সম্ভাবনার উৎস। তাঁদের আর্থিক অবদান ইতিমধ্যেই রেমিট্যান্সের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উপযুক্ত নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং আকর্ষণীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা গেলে প্রবাসীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও বিনিয়োগ দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
জাতীয় উন্নয়নে ডায়াসপোরা সম্পৃক্ততা: কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের অভিজ্ঞতা
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক দেশ বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং জ্ঞানভিত্তিক অবদানকে কাজে লাগানোর জন্য সুসংগঠিত কৌশল গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তারা প্রবাসীদের সম্ভাবনাকে উন্নয়নের একটি কার্যকর সম্পদে পরিণত করার চেষ্টা করছে। নিচে কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতা দেশভিত্তিকভাবে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
লেবানন: লেবাননের ডায়াসপোরা সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে দুটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো লেবানন বিজনেস নেটওয়ার্ক এবং লাইভ লেবানন।
লেবানন বিজনেস নেটওয়ার্ক মূলত একটি অলাভজনক ব্যবসায়িক প্ল্যাটফর্ম, যার উদ্দেশ্য বিদেশে বসবাসরত লেবানিজ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দেশের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগ স্থাপন করা। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন বিনিয়োগের সুযোগ, ব্যবসায়িক ধারণা এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগ সম্পর্কিত তথ্য শেয়ার করা হয়। এর ফলে লেবাননের উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে এবং বিদেশে বসবাসরত লেবানিজ ব্যবসায়ীরা নিজ দেশের উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ পান।
অন্যদিকে লাইভ লেবানন একটি উন্নয়নভিত্তিক উদ্যোগ, যা জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং লেবাননের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে চালু করা হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো প্রবাসী লেবানিজদের মাধ্যমে দেশের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে সহায়তা করা। এই কর্মসূচির আওতায় একটি ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে, যেখানে এনজিও ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প জমা দেয়। প্রবাসীরা সেখান থেকে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী প্রকল্প নির্বাচন করে অর্থায়ন করতে পারেন। এসব উদ্যোগ সাধারণত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ধরনের কর্মসূচি দেখায় যে ডায়াসপোরা সম্পৃক্ততা শুধু অর্থনৈতিক বিনিয়োগেই সীমাবদ্ধ নয়; সামাজিক উন্নয়নেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকা: দক্ষিণ আফ্রিকা ডায়াসপোরা সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে নেটওয়ার্কভিত্তিক একটি কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এ ক্ষেত্রে দুটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হলো সাউথ আফ্রিকান ডায়াসপোরা নেটওয়ার্ক (এসএডিএন) এবং সাউথ আফ্রিকান নেটওয়ার্ক অব স্কিলস অ্যাব্রোড (সানসা)। এসএডিএন মূলত বিদেশে বসবাসরত সফল দক্ষিণ আফ্রিকান উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেশের উদীয়মান উদ্যোক্তাদের সংযোগ স্থাপনের জন্য কাজ করে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে ওঠে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায়। ফলে প্রবাসী ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা ও নেটওয়ার্ক দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে।
অন্যদিকে সানসা একটি জ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ, যার মাধ্যমে বিদেশে অবস্থানরত দক্ষ পেশাজীবীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানো হয়। এই নেটওয়ার্ক গবেষণা সহযোগিতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে শিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের সংযোগ স্থাপন করে। এর ফলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ভারত: ডায়াসপোরা সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিক ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীকে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নীতি ও উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে।
প্রথমত, তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ভারত সরকার একটি কার্যকর দ্বিমুখী যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের কাছে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম, নীতি এবং বিনিয়োগের সুযোগ সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি মাসিক ই-ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে প্রবাসীদের মতামত, উদ্বেগ ও প্রস্তাব গ্রহণের জন্য পরামর্শভিত্তিক ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি গ্লোবাল অ্যাডভাইজারি কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে, যা প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করে।
দ্বিতীয়ত, প্রবাসীদের পরিচয় ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ভারত সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০০৫ সালে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনের মাধ্যমে ওভারসিজ সিটিজেনশিপ অব ইন্ডিয়া চালু করা হয়। এটি পূর্ণাঙ্গ দ্বৈত নাগরিকত্ব না হলেও এর মাধ্যমে প্রবাসী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিরা বিভিন্ন সুবিধা লাভ করেন। যেমন আজীবন মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা, দীর্ঘ সময় ভারতে বসবাসের অনুমতি এবং শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ।
তৃতীয়ত, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য ভারত সরকার বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রটেক্টর জেনারেল অব ইমিগ্র্যান্টস বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য নিয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম তদারক করে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রদান করে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস ও মিশনের মাধ্যমে ইন্ডিয়ান কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার ফান্ড গঠন করা হয়েছে, যা বিপদগ্রস্ত প্রবাসীদের জরুরি সহায়তা প্রদান করে।
প্রবাসীদের সঙ্গে আবেগঘণ ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে ভারত সরকার ‘নো ইন্ডিয়ান প্রোগ্রাম’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছে। এর মাধ্যমে বিদেশে জন্ম নেওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণদের ভারতে এনে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত করা হয়। এ ছাড়া প্রবাসী ভারতীয়দের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য প্রতিবছর ‘প্রবাসী ভারতীয় সম্মান অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্পৃক্তকরণে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, প্রবাসী কমিউনিটি অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক উন্নয়ন এবং জ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। এই বাস্তবতা সামনে রেখে প্রবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে এমন কাঠামো সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য কিছু মৌলিক শর্ত পূরণ করা জরুরি।
প্রথমত, শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেসব দেশে প্রবাসী সম্পৃক্ততার উদ্যোগ সফল হয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধান নিজেই প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, নীতি প্রণয়ন এবং বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর ফলে প্রবাসীদের অংশগ্রহণের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয় এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকরভাবে কাজ করে থাকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। এর পাশাপাশি তাঁরা জ্ঞান, দক্ষতা এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুস্পষ্ট নীতিগত নির্দেশনা এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রবাসীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে সহায়তা করে এবং তাঁদের দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করবে।
অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেম চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন
মতামত লেখকের নিজস্ব