ফ্যামিলি কার্ড যে উপায়ে স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য বিমোচন করতে পারে

ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি নতুন কর্মসূচি নয়; এটি সামাজিক সুরক্ষাকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ থেকে একটি সমন্বিত, অধিকারভিত্তিক ও উন্নয়নমুখী ব্যবস্থায় রূপান্তরের সুযোগ। ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে লিখেছেন গোলাম রসুল

ফ্যামিলি কার্ডের নমুনা কপিফাইল ছবি

বাংলাদেশ গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। আজও বহু পরিবার প্রতিদিনের জীবনে কঠিন সংগ্রাম করতে বাধ্য হয়—কখনো খাবার কম খেয়ে, কখনো সন্তানের শিক্ষা বা চিকিৎসা ব্যয় স্থগিত রেখে। এটি কেবল ব্যক্তিগত সংকট নয়; বরং একটি গভীর কাঠামোগত বাস্তবতা।

দেশের প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, যার মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ চরম দারিদ্র্যে। দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ খাদ্যমূল্যস্ফীতি পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করছে। প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছে এবং ১৬ লাখের বেশি শিশু তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও লবণাক্ততা, যা দারিদ্র্যকে আরও অনিশ্চিত ও স্থায়ী করে তুলছে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: রাষ্ট্র কি কেবল সংকটকালে সহায়তা দেবে, নাকি নাগরিকদের জন্য একটি স্থায়ী ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে? প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ড এই প্রশ্নেরই নীতিগত উত্তর হতে পারে। এটি কেবল একটি কল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়; বরং একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি, যেখানে ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নাগরিকের অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয়, এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থা ও দায়বদ্ধতার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হয়।

কেন ফ্যামিলি কার্ড গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সংখ্যা কম নয়—বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফসহ নানা উদ্যোগ চালু আছে। কিন্তু এগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে একই পরিবার একাধিক সুবিধা পায়, আবার প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ে—যা অদক্ষ সম্পদ বণ্টন এবং বণ্টনবৈষম্য উভয়ই বাড়ায়। সামাজিক সুরক্ষার মূল উদ্দেশ্য—ঝুঁকি কমানো এবং দারিদ্র্য হ্রাস—তখন পূরণ হয় না।

ফ্যামিলি কার্ড এই বিচ্ছিন্নতা দূর করার একটি কাঠামোগত সুযোগ তৈরি করে। একক প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন সহায়তা একত্র হলে অপচয় কমবে, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়বে এবং পরিবারগুলো নিয়মিত ও পূর্বানুমেয় সহায়তা পাবে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে এবং একই সম্পদ দিয়ে বেশি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন করতে হবে যেখানে, সেটা হলো—নাগরিকেরা ফ্যামিলি কার্ডকে সহায়তা বা অনুগ্রহ হিসেবে নয়, অধিকার হিসেবে বিবেচনা করবে। নাগরিকেরা বুঝবে, ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা তার অধিকার, কোনো দান নয়। এই পরিবর্তনই ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি।

এ ছাড়া ফ্যামিলি কার্ডকে একটি ‘সামাজিক সুরক্ষা ফ্লোর’ হিসেবে গড়ে তোলা গেলে প্রতিটি পরিবার ন্যূনতম আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা পাবে। এর প্রভাব শুধু তাৎক্ষণিক নয়, দীর্ঘ মেয়াদেও তা গুরুত্বপূর্ণ। ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পরিবারগুলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, যা মানব পুঁজি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করে এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।

ফ্যামিলি কার্ডের লক্ষ্য কেবল সহায়তা দেওয়া নয়, বরং পরিবারকে ধাপে ধাপে দারিদ্র্য থেকে উত্তরণে সহায়তা করা, যা ‘পভার্টি গ্র্যাজুয়েশন’ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এতে নগদ সহায়তার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, সম্পদ সৃষ্টি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ যুক্ত হলে পরিবারগুলো স্থায়ীভাবে স্বনির্ভর হতে পারে।

আরও পড়ুন

বাস্তবায়নের চার স্তম্ভ

ফ্যামিলি কার্ডের সাফল্য তার পরিসরের ওপর নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক নকশা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। সামাজিক সুরক্ষা অর্থনীতির একটি মৌলিক শিক্ষা হলো—সম্পদ নয়, বরং ডিজাইন ব্যর্থতাই অধিকাংশ কর্মসূচির প্রধান দুর্বলতা। বাংলাদেশে অতীত অভিজ্ঞতা দেখায়, দুর্বল লক্ষ্য নির্ধারণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতা মিলেই ‘লিকেজ’ ও ‘এক্সক্লুশন’ তৈরি করেছে। ফলে কার্যকর নকশা ছাড়া বড় বাজেটও কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না। এই প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ডকে চারটি আন্তনির্ভর স্তম্ভের ওপর দাঁড়াতে হবে।

ক. সুবিধাভোগী নির্বাচনব্যবস্থা: সুবিধাভোগী নির্বাচন যেকোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভিত্তি। কে সহায়তা পাবে আর কে পাবে না—এই সিদ্ধান্তই কার্যকারিতা ও ন্যায্যতা নির্ধারণ করে। অতীতে বাংলাদেশে লক্ষ্য নির্ধারণে দুটি বড় ভুল হয়েছে—অদরিদ্ররা সুবিধা পেয়েছে, আর প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়েছে।

এই ভুলগুলো শুধু সম্পদের অপচয় ঘটায় না, সামাজিক সুরক্ষার উদ্দেশ্যকে ক্ষুণ্ন করে এবং জনআস্থা দুর্বল করে। তাই ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাভোগী নির্বাচনের মানদণ্ড হতে হবে বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। আয় ছাড়াও সম্পদ, কর্মসংস্থান, পারিবারিক নির্ভরশীলতা, ভৌগোলিক ঝুঁকি ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো সূচক বিবেচনায় নিতে হবে। এই তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ ও স্থানীয়ভাবে যাচাই করা জরুরি, যাতে পরিবর্তিত বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সক্ষমতা। প্রথম বছরে ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা দিলে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করছে। ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে এটি মোট সামাজিক সুরক্ষা বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হবে, তবে জাতীয় বাজেটের তুলনায় এখনো সীমিত।

খ. সুবিধাভোগী চিহ্নিতকরণ: সঠিকভাবে সুবিধাভোগী চিহ্নিতকরণ অপরিহার্য। বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির জন্য আলাদা ডেটাবেজ রয়েছে, যা প্রায়ই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিচ্ছিন্ন। এর ফলে একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা পেতে পারে, আবার প্রকৃত দরিদ্র পরিবার বাদ পড়ে যেতে পারে। একটি সমন্বিত সামাজিক নিবন্ধন তৈরি করে সব কর্মসূচির তথ্য একত্র করা গেলে চিহ্নিতকরণ আরও নির্ভুল হবে এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে। জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গে এই নিবন্ধন যুক্ত করলে জালিয়াতি কমানো সম্ভব।

গ. সহায়তা প্রদান: সামাজিক সুরক্ষার প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ধারিত হয় ‘ডেলিভারি মেকানিজম’-এর মাধ্যমে সঠিকভাবে ও সময়মতো উপকারভোগীর কাছে সহায়তা পৌঁছালে। যদি সহায়তা ঠিক সময়ে না পৌঁছায় বা ভুল ব্যক্তির কাছে যায়, তাহলে পুরো কর্মসূচির কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশে মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবার মাধ্যমে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ায় স্বচ্ছতা ও মধ্যস্থতাকারী কমেছে; কিন্তু কেবল ডিজিটাল পদ্ধতির ওপর নির্ভর করলে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বা ব্যবহারগত অজ্ঞতার কারণে অনেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তাই অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে অফলাইন বিকল্প ও ব্যবহারকারীদের জন্য সহজ সহায়তাব্যবস্থা রাখা জরুরি।

ঘ. নজরদারি ও জবাবদিহি: নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে ব্যবস্থার স্থায়িত্ব। ‘রিয়েল-টাইম’ পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন নিরীক্ষা ও  তদারকি এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রভাব ও অপচয় কমাতে সাহায্য করে এবং জনআস্থা বাড়ায়। এই কাঠামো সামাজিক সুরক্ষাকে ‘অ্যাকাউন্টেবল সিস্টেম’-এ পরিণত করে।

এই চারটি স্তম্ভ পরস্পর নির্ভরশীল। একটি দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এগুলোকে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করা জরুরি। অতএব ফ্যামিলি কার্ডের সাফল্য নির্ভর করবে এই চারটি স্তম্ভের সমন্বিত শক্তির ওপর। এগুলো শক্তিশালী করতে পারলে এটি একটি বিচ্ছিন্ন কল্যাণ কর্মসূচি থেকে একটি কার্যকর, ন্যায্য ও জবাবদিহিমূলক সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে।

বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা

গত তিন দশকে নগদ সহায়তা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামাজিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। লাতিন আমেরিকা থেকে পূর্ব এশিয়া—সব জায়গায় সরকারগুলো দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা কমাতে সরাসরি অর্থসহায়তা দিয়েছে। লাতিন আমেরিকায় নিয়মিত নগদ সহায়তা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য উন্নত করেছে। কিন্তু আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রভাব সীমিত ছিল। চীনের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তারা শুধু নগদ সহায়তা দেয়নি; পাশাপাশি শিল্পায়ন, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। ফলে মানুষ স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য থেকে বের হতে পেরেছে।

দক্ষিণ এশিয়ায়ও সামাজিক সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভারতে বড় পরিসরে নগদ ও খাদ্য কর্মসূচি দরিদ্রদের অন্তর্ভুক্তি বাড়িয়েছে। পাকিস্তানের ‘বেনজির ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রাম’ দেখিয়েছে, নারীদের হাতে সহায়তা পৌঁছালে পরিবারের কল্যাণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে। তবে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি, দুর্বল লক্ষ্য নির্ধারণ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে সীমিত সংযোগের কারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রে সীমিত থেকে গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—নগদ সহায়তা এককভাবে যথেষ্ট নয়। এটাকে কর্মসংস্থান, সম্পদ সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, তাহলেই তা স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।

আরও পড়ুন

চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা

‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সক্ষমতা। প্রথম বছরে ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২,৫০০ টাকা দিলে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করছে। ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে এটি মোট সামাজিক সুরক্ষা বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হবে, তবে জাতীয় বাজেটের তুলনায় এখনো সীমিত।

বাংলাদেশের কর–জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম, যা পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। ফলে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আহরণ ক্ষমতা বাড়ানো এবং বাজেটের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করা অপরিহার্য। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে বিদ্যমান নানা ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি একীভূত হয়ে যাবে। এর ফলে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে, দ্বৈত সুবিধা বন্ধ হবে এবং কিছু অর্থ সাশ্রয় হবে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, লাতিন আমেরিকার দেশগুলো সামাজিক সুরক্ষায় জিডিপির ৪–৬ শতাংশ ব্যয় করে। আফ্রিকার অনেক দেশে ব্যয় ১–২ শতাংশের নিচে, ফলে কাভারেজ বা সীমানা সীমিত। ভারতের ব্যয় ৭–৮ শতাংশ, আর পাকিস্তানের ব্যয় প্রায় ২ শতাংশ। অতএব, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কেবল একটি সামাজিক উদ্যোগ নয়; এটি আর্থিক শৃঙ্খলা, সম্পদ আহরণ এবং নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণেরও পরীক্ষা। ধাপে ধাপে কাভারেজ বাড়ানো এবং টেকসই অর্থায়ন কৌশল তৈরি করাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

নীতিগত অগ্রাধিকার

ফ্যামিলি কার্ডের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু আর্থিক সক্ষমতার ওপর নয়, বরং স্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। অতীত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—দুর্বল লক্ষ্য নির্ধারণ, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক অদক্ষতা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে অকার্যকর করে তোলে। তাই এই উদ্যোগকে শুরু থেকেই দৃঢ় নীতিগত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে।

প্রথমত, আইনগত ভিত্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আইন ছাড়া কোনো কর্মসূচি টেকসই হয় না। ফ্যামিলি কার্ডকে সংসদীয় আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে এটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; বরং একটি স্থায়ী রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে দাঁড়ায়।

দ্বিতীয়ত, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাধ্যতামূলক করতে হবে। উপকারভোগীর তালিকা, বরাদ্দ ও বিতরণপ্রক্রিয়া সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। স্বাধীন নিরীক্ষা, তৃতীয় পক্ষ মূল্যায়ন এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ছাড়া এই কর্মসূচি দ্রুত বিশ্বাস হারাবে।

তৃতীয়ত, আর্থিক স্থায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আর্থিক স্থায়িত্ব অপরিহার্য। অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াবে। তাই কর্মসূচিকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে, ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং মধ্যমেয়াদি ব্যয়কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অর্থায়নকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। বার্ষিক বাজেটে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি দেশীয় সম্পদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন তহবিল ও এসডিজি–সম্পর্কিত তহবিল ব্যবহার করলে কর্মসূচি দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল থাকবে।

চতুর্থত, অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কোনো প্রান্তিক পরিবার বাদ পড়বে না—এটি নীতিগত অঙ্গীকার হতে হবে। নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া, অফলাইন সেবা চালু রাখা এবং সহজলভ্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।

পঞ্চমত, নির্ভরতা নয়, উত্তরণের পথ তৈরি করতে হবে। ফ্যামিলি কার্ডকে কেবল নগদ সহায়তায় সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। উপকারভোগীদের দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। লক্ষ্য হবে, সহায়তা থেকে স্বনির্ভরতায় উত্তরণ, দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা নয়।

ষষ্ঠত, বাস্তবায়নে ধাপভিত্তিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রথম ধাপ: চরম দরিদ্রদের জন্য নিঃশর্ত সহায়তা, যাতে মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত হয়। দ্বিতীয় ধাপ: শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে শর্তযুক্ত সহায়তা, যাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। তৃতীয় ধাপ: কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে সংযোগ, যাতে পরিবারগুলো ধীরে ধীরে সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে।

শেষ কথা

ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি নতুন কর্মসূচি নয়; এটি সামাজিক সুরক্ষাকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ থেকে একটি সমন্বিত, অধিকারভিত্তিক ও উন্নয়নমুখী ব্যবস্থায় রূপান্তরের সুযোগ। এই রূপান্তর ঘটাতে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত কাঠামো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন।

ফ্যামিলি কার্ডকে শুধু ‘সামাজিক সুরক্ষা জাল’ হিসেবে দেখা যাবে না। এটি দারিদ্র্য বিমোচনের বৃহত্তর সমন্বিত কর্মসূচির অংশ; এর লক্ষ্য পরিবারকে সাময়িক সহায়তা দেওয়া নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে ধাপে ধাপে স্বনির্ভর করে তোলা। ফ্যামিলি কার্ডকে ভাতা নয়, বরং দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রীয় হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। এর সাফল্য নির্ভর করবে কত টাকা বিতরণ হলো তার ওপর নয়, বরং কত পরিবার স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারল তার ওপর।

  • ড. গোলাম রসুল  অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি

    মতামত লেখকের নিজস্ব