আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা কেন্দ্র করে ইরান ও ইরাকজুড়ে পারস্যের ঐতিহ্যবাহী শোকগাথা মঞ্চস্থ হওয়ার পাশাপাশি এখন এই বড় প্রশ্নটিই দেখা দিয়েছে যে একটি ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক বসতি স্থাপনকারী রাষ্ট্র কীভাবে একটি সার্বভৌম দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করার মতো ঔদ্ধত্য, বর্বরতা ও ধৃষ্টতা দেখায়?
খামেনিকে হত্যার এই ইসরায়েলি চক্রান্ত ছিল মূলত এক দীর্ঘ ও রক্তরঞ্জিত ঐতিহ্যেরই সর্বশেষ পদক্ষেপ। সাংবাদিক রোনেন বার্গম্যান রাইজ অ্যান্ড কিল ফার্স্ট: দ্য সিক্রেট হিস্ট্রি অব ইসরায়েলস টার্গেটেড অ্যাসাসিনেশনস গ্রন্থে সেই বিবরণ দিয়েছেন।
কোটি কোটি শিয়া মুসলমানের আধ্যাত্মিক নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধান খামেনিকে হত্যার মাধ্যমে ইসরায়েল ফিলিস্তিনে চলমান নৃশংস দখলদারির পাশাপাশি নিজেদের জন্য ক্ষতিকর মনে হওয়া যেকোনো ব্যক্তিত্বকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর যে আগ্রাসী রূপ দেখিয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের নিশানা করা থেকে তাঁদের ঠেকানোর আর কেউ থাকবে না।
কিন্তু ইসরায়েলি হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা মিডিয়ায় কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নেই কেন? এমনকি নিউইয়র্ক টাইমস খামেনির হত্যাকাণ্ডের খবরটি এমনভাবে প্রকাশ করেছে, যেন তারা কোনো সাধারণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে।
অভিভাবকের মহাপ্রয়াণ
ইতিহাস খামেনিকে স্বৈরাচারী বা জননন্দিত যেভাবেই মূল্যায়ন করুক না কেন, তিনি ছিলেন গণবিপ্লবের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি রাষ্ট্রের প্রধান। তাঁকে যেমন লাখ লাখ মানুষ সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে; তেমনি নিঃসন্দেহে লাখ লাখ মানুষ তাঁকে একজন স্বৈরাচার শাসক মনে করে; কিন্তু এ বিষয়টি নির্ধারণ করার অধিকার একমাত্র ইরানিদেরই ছিল এবং আছে।
এর সঙ্গে ইসরায়েলের রক্তপিপাসু জায়নবাদী শাসকদের কোনো সম্পর্ক নেই। সব রাজনৈতিক নেতারই সমর্থক ও সমালোচক থাকে। ট্রাম্প বা পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধানই সবার কাছে সমানভাবে প্রিয় বা অপ্রিয় নন। তাই বলে কি তা ইসরায়েলকে তাঁদের হত্যা করার লাইসেন্স দিয়ে দেয়?
খামেনি ছিলেন এক প্রাচীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ; দেশের মানুষের ভালোবাসা বা ঘৃণা ছাপিয়ে মাতৃভূমির মাটিতে একজন অভিভাবকের মতোই মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যু তাঁর প্রাপ্য ছিল।
ইসরায়েল সীমান্ত পেরিয়ে খামেনি এবং তাঁর ১৪ মাস বয়সী নাতনিসহ পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করার পরও নিউইয়র্ক টাইমস–এর পাতায় সে তুলনায় বেলজিয়াম ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার একটি বিতর্কিত বিশ্বকাপ ম্যাচ নিয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা যায়।
যখন ইরান ও ইরাকে খামেনির জানাজার প্রস্তুতি চলছিল, তখন লরা লুমার নামে আরেক জায়নবাদী সেই লাখ লাখ মানুষের শোক র্যালিতে ইসরায়েলকে সরাসরি হামলা চালানোর আহ্বান জানান।
যাঁরা অন্ধভাবে ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছেন, তাঁরা আসলে বুঝতে পারছেন না যে খোদ আমেরিকাসহ পুরো বিশ্ব তাঁদের কতটা ঘৃণা করে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানেও আমেরিকানদের ইসরায়েলি পতাকা পোড়াতে এবং এই ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র থেকে নিজেদের দেশের স্বাধীনতা দাবি করতে দেখা গেছে।
মনগড়া সংখ্যাতত্ত্ব
খামেনির জানাজা নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস–এর প্রতিবেদনটি ছিল মূর্খতায় ভরপুর, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল জনসমাগমকে ছোট করে দেখানো। তারা ইরানিদের এমন বিভক্ত রূপে হাজির করেছিল, যেন একদল খামেনিকে ‘মহিমান্বিত’ করছে আর অন্য দল ‘ঘৃণা’ করছে; অথচ এই যুদ্ধ ইরানিদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে, সে সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
পত্রিকাটি প্রথমে মাত্র হাজার দশেক মানুষ জড়ো হয়েছে বলে মনগড়া সংখ্যাতত্ত্ব ছাড়ে। কিন্তু সারা বিশ্ব যখন লাখ লাখ মানুষের ঢল দেখছিল, তখন নিজেদের এই দাবি হাস্যকর বুঝতে পেরে তারা দ্রুত তা পরিবর্তন করে ‘কয়েক লাখ’ বলে উল্লেখ করে।
খামেনি ঘৃণিত ছিলেন না; বরং সব রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই তিনি তীব্রভাবে সমালোচিত হতেন। কিন্তু এটি ছিল এই গ্রহের সবচেয়ে ঘৃণিত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের জনগণের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার, অগণিত নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করার, জাতীয় অবকাঠামো ধ্বংস করার এবং ট্রাম্পকে দিয়ে ইরানের সভ্যতাকে ধ্বংস করার হুমকি দেওয়ার আগের কথা; এই ঘটনাগুলো পরবর্তী সময়ে সবকিছু বদলে দিয়েছে।
মিথিক মুহূর্ত
খামেনির জানাজায় নিউইয়র্ক টাইমস এবং তাদের সমমনা গোষ্ঠী যা দেখতে ব্যর্থ হয়েছে, তা হলো একটি জাতি ও সংস্কৃতির তাদের যৌথ চেতনার মধে৵ নিজেদের অভিন্ন ভাগ্যকে বিলীন করে দেওয়ার এক মিথিক মুহূর্ত।
এটি মূলত পারস্যের ঐতিহ্যবাহী শোকগাথা ‘তাজিয়া’র একটি চিরায়ত রূপ, যার উৎস শাহনামায় সিয়াভাশের মৃত্যুর শোক পালনের আচারের মধ্যে নিহিত। এটি কেবল ইরান ও ইরাকের মাটিতেই নয়; বরং বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিয়া ভক্তদের জন্য এক বিশাল আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিবেশিত হয়েছিল; কিন্তু এ ঘটনার গভীর গুরুত্ব তাদের কাছে হারিয়ে গেছে, যারা নিজেদের জ্ঞানকে কেবল নিউইয়র্ক টাইমস–এর পাতায় সীমাবদ্ধ রেখেছে।
২৫ বছরের বেশি আগে সহকর্মী পিটার চেলকোভস্কির সঙ্গে স্টেজিং আ রেভোল্যুশন বইয়ে ইরানি বিপ্লবের সময় শিয়া নাটকের যে রূপান্তর আমি নথিভুক্ত করেছিলাম, সম্প্রতি খামেনির জানাজায় বিশ্ব ঠিক একই রকম বিশাল আয়োজন প্রত্যক্ষ করল।
ইসরায়েলের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পশ্চিমা মিডিয়া ইরানিদের ‘ধর্মীয়’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’—এই দুই ভাগে বিভক্ত করার চেষ্টা করলেও বাস্তবে এই দ্বিমুখী বিভাজন ইরানে কখনোই কার্যকর ছিল না এবং হবেও না।
এরপর তারা আরেকটি চমৎকার মন্তব্য ছুড়ে দেয়: ‘সরকারি শোকানুষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং সরকার দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল।’ অবশ্যই তা ছিল; সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান ও জিমি কার্টার কিংবা পোপের রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াসহ সব রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানই এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, নাকি সেটিও পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা ‘কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত’ ছিল?
নিউইয়র্ক টাইমস ও অন্যান্য পশ্চিমা গণমাধ্যমের মূল উদ্দেশ্যই ছিল খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষদের খাটো ও অবমূল্যায়ন করা। তাদের প্রচ্ছন্ন বার্তাটি পরিষ্কার ছিল যে খামেনি একজন স্বৈরাচার হিসেবে নিহত হওয়ারই যোগ্য ছিলেন এবং ইসরায়েলিরা তাঁকে হত্যা করে বিশ্ব তথা ইরানের জনগণের একটি বড় উপকার করেছে।
এর প্রমাণ মেলে একজন বিদগ্ধ শিয়া ধর্মীয় নেতার ধারণকৃত কথোপকথনে, যেখানে তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রখ্যাত শিয়া দার্শনিক এবং তাফসির আল-মিজান গ্রন্থের লেখক প্রয়াত আল্লামা মুহাম্মদ হুসাইন তাবাতাবাইয়ের সঙ্গে একটি সাক্ষাতের স্মৃতিচারণা করছিলেন।
সেখানে জানা যায়, কীভাবে কারবালার শাহাদাত নিয়ে ইরাজ মির্জার একটি কবিতা শুনে তাবাতাবাই অঝোরে কাঁদছিলেন এবং এক পর্যায়ে তাঁর বন্ধুদের অবাক করে দিয়ে স্বীকার করেন যে তিনি তাঁর সমগ্র তাফসির গ্রন্থটি এই একটি কবিতার বিনিময়ে সানন্দে দিয়ে দিতে রাজি আছেন। এতে তাঁর বন্ধুরা অবাক হয়ে যান। কারণ, ইরাজ মির্জা তাঁর চটুল ও ব্যঙ্গাত্মক কবিতার জন্য পরিচিত ছিলেন। তাবাতাবাই তখন মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন: ‘হ্যাঁ, আমি জানি; আমার লাইব্রেরিতেই তাঁর সমগ্র রচনাবলি রয়েছে, তবুও আমি এটিই করতাম।’
কবিতা ও দর্শন থেকে শুরু করে ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের এই যে সমৃদ্ধ ও জীবন্ত ইরানি-ইসলামি সংস্কৃতি, তা পশ্চিমা মিডিয়ার কাছে সম্পূর্ণ অজানা এক জগৎ, যা তারা নিজেরাও পড়ে দেখে না, পাঠকদের কাছে ব্যাখ্যা করা তো দূরের কথা।
শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন
খামেনি কি নায়ক ছিলেন, নাকি খলনায়ক? একজন পরোপকারী সাধু ছিলেন, নাকি এক নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী? প্রথমত এবং প্রধানত, এটি নির্ধারণের দায়িত্ব কেবলই নিজ ভূমিতে বসবাসকারী ইরানিদের। আগামী দিনে ইরানি ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং চিন্তাবিদেরাই এটি নিয়ে ভাববেন ও বিতর্ক করবেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তা এবং পশ্চিমা মিডিয়ার ভেতরে থাকা তাদের কেনা দোসরদের এই বিষয়ে কথা বলার কোনো অধিকার নেই। তিনি যা-ই হোন না কেন, খামেনি এখন তাঁর সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে গেছেন, যেখানে তিনি তাঁর ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হবেন এবং কোনো অন্যায় করে থাকলে তার শাস্তি পাবেন।
কয়েক বছর আগে কায়রো সফরের সময় আমি ইরানের প্রয়াত শাহের শেষ শয্যায় গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলাম। আমি কোনো রাজতন্ত্রের সমর্থক নই, এবং আমার শৈশব ও কৈশোরে তিনি আমার মাতৃভূমিকে শোষিত করেছিলেন; কিন্তু কায়রোর রাজকীয় আল-রিফাই মসজিদে তাঁর মরদেহের প্রতি সম্মান জানানো আমি আমার দায়িত্ব মনে করেছিলাম।
আমি একাদশ শতকের কবি নাসের খসরুর একটি বিখ্যাত কবিতা আবৃত্তি করে তাঁর আত্মার জন্য প্রার্থনা করেছিলাম। কবিতাটি আমরা সবাই হাইস্কুলে পড়েছিলাম:
ইসা (আ.) একবার পথের ধারে এক খুন হওয়া ব্যক্তিকে দেখলেন,
তিনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন:
তুমি কাকে হত্যা করেছিলে যে তোমাকে এভাবে অপমানে মরতে হলো?
অপেক্ষা করো, আমরা দেখব কে তাকে হত্যা করে যে তোমাকে হত্যা করেছে!
আঙুল দিয়ে মানুষের দরজায় আঘাত করে তাদের বিরক্ত কোরো না,
যাতে কেউ তোমার দরজায় মুষ্টির আঘাত না হানে!
আজ খামেনির বিদায় নিয়েও আমি একইভাবে ভাবি। তবে এবার পবিত্র কোরআনের একটি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত দিয়ে তা শেষ করব:
‘অতএব, কেউ অণু পরিমাণ সৎ কর্ম করলে তা সে দেখতে পাবে,
এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তা–ও সে দেখতে পাবে।’ (সুরা আল-যিলযাল; ৯৯:৭-৮)
হামিদ দাবাশি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত