গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নোয়াখালী জেলায় রক্ত হিম করা একের পর এক সব ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কয়েকটির সঙ্গে নির্বাচন ও স্থানীয় রাজনীতির যোগসূত্র আছে। বিশেষ করে সুবর্ণচরের ঘটনাগুলো। ইতিমধ্যে পাঠক সে বিষয়গুলো অবগত হয়েছেন। কারণ, এ নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি।

এবার আমরা সাম্প্রতিক কিছু খবরের শিরোনাম পড়ি। এতে সার্বিকভাবে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। নোয়াখালীতে বিয়েবাড়িতে ধর্ষণের শিকার কিশোরী, গৃহকর্মীকে ধর্ষণ করে ভিডিও ধারণ, ধর্ষণের পর স্কুলছাত্রী হত্যা, শ্যালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে দুলাভাই গ্রেপ্তার, ফেনীতে ছয় বছরের শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষক গ্রেপ্তার, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে সাবেক পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার, লক্ষ্মীপুরে ৭০ বছরের বৃদ্ধা ধর্ষণের শিকার।

এসব শিরোনাম জাতীয় দৈনিক পত্রিকা থেকে নেওয়া, যেগুলো ঘটেছে অতিসম্প্রতি। এর অর্থ হচ্ছে, নোয়াখালী অঞ্চলে ধর্ষণের খবরের আধিক্য আছেই। কেন বৃহত্তর নোয়াখালীতে ধর্ষণের ঘটনা বেশি, একজন সংবাদকর্মী হিসেবে বিষয়টি বারবার ভাবনায় এসেছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছেও জানতে চেয়েছি বহুবার। কিন্তু সব সময়ই মনে হয়েছে, চিন্তার গভীর থেকে, সামাজিক মনস্তত্ত্বের জায়গা থেকে বিষয়টি নিয়ে বিশদ গবেষণা করা দরকার। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে কাজ করেছে বলে শুনিনি। আশা করতে পারি, শিগগিরই বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু হবে। কাজটা করা দরকার, কেউ না কেউ শুরু করুক।

২.

নোয়াখালী অঞ্চলের একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে আলাপ করছিলাম, যিনি লেখালেখির সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর মতে, ধর্ষণসহ অপরাধমূলক খবরের প্রতি কিছু রিপোর্টারের ঝোঁক থাকতে পারে, তবে সেটি বড় কথা নয়। বড় হলো, ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, মোকদ্দমা হচ্ছে। তাঁর মতে, এর প্রধান কারণ, এটি প্রবাসী-অধ্যুষিত এলাকা। অনেক পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বছরের পর বছর দেশের বাইরে থাকেন। পরিবারের নারীরা অরক্ষিত ও বঞ্চিত।

এতে অরক্ষিত নারীরা স্থানীয় কিছু ক্ষমতাবানের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। ক্ষমতাবান সবাই যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, এমন নয়। রাজনৈতিক দল বদলায়, কিন্তু ক্ষমতাবানদের কোনো বদল নেই। তাঁদের প্রভাব-প্রতিপত্তি সব সময় নিরঙ্কুশ। তাঁরাই পাড়া-মহল্লার শাসক, একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। অপরাধী অপরাধ করে তাঁদের পায়ে লুটিয়ে পড়লেই সব মাফ।

স্থানীয় পুলিশ বলছে, ধর্ষণ মামলার একটি বড় অংশ ভুয়া, অস্তিত্বহীন। তদন্তে নেমে তারা এমন তথ্যই পাচ্ছে। জেলার সাবেক পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন গত বছরের ১২ মার্চ প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে সরাসরি বলেছেন, ‘অনেক ঘটনা সম্মতিক্রমে হয়। যখন কেউ দেখে ফেলে, তখন ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার মামলা হয়। এর বাইরে কিছু মিথ্যা মামলাও আছে।’

এ ছাড়া প্রবাস থেকে আসা টাকায় নতুন বাইক নিয়ে পাড়া দাপিয়ে বেড়ানো একশ্রেণির বখাটে তরুণ রয়েছে, যারা কোনো অপরাধকে অপরাধ মনে করে না।
আমাদের সহকর্মী, তরুণ বুদ্ধিজীবী ও লেখক ফারুক ওয়াসিফ ২০২০ সালের ২৬ অক্টোবর প্রথম আলোয় ‘নোয়াখালীতে কেন ধর্ষণ বেশি’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন। সেখানে তিনি দুটি বিষয় জোরের সঙ্গে তুলে ধরেন—এক. জনপ্রতিনিধিরাই সেখানে ইয়াবা ব্যবসা, সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত এবং দুই. বেগমগঞ্জ বা সুবর্ণচরের মতো জায়গায় একসময় বিচার-প্রশাসন বলে কিছুই ছিল না।

চরাঞ্চলের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কথাও সুবিদিত। ফারুক ওয়াসিফ লিখেছেন, ‘বৃহত্তর নোয়াখালী কি বাংলাদেশের “বুনো পশ্চিম”, যেখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গ্যাংস অব ওয়াসিপুরের সন্ত্রাসীরা। শতবর্ষ আগে আমেরিকার বিরান পশ্চিমে ছিল সম্পদ, চাষের জমি আর কাজের অভাব। আর ছিল প্রচুর ভাগ্যসন্ধানী বেকার যুবকেরা। ঘোড়া আর পিস্তল নিয়ে তারা ঘুরে বেড়াত। আর ব্রিটিশ আমল থেকেই ওয়াসিপুরে ছিল ডাকাতির ঐতিহ্য। সেটাই পরে টিকে থাকে বন্দুকবাজ গ্যাংগুলোর পাল্লাপাল্লিতে। নোয়াখালীর ঐতিহ্য কি সে রকম? ক্ষমতাদণ্ড হাতে নারীর সন্ধানে কেন ঘুরে বেড়ায় তারা?’

কথা বলেছিলাম নোয়াখালীর প্রবীণ সাংবাদিক বখতিয়ার শিকদারের সঙ্গে, গত শতকের আশির দশকে যিনি দৈনিক সংবাদে জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর দীর্ঘদিন বাংলাদেশ বেতারে কাজ করছেন। তিনি প্রথমে একটি উদাহরণ হাজির করলেন। তিনি বললেন, গত শতকের আশির দশকে একবার নোয়াখালীতে গরু চুরি বেড়ে গেল। আর সব সাংবাদিক গরু চুরির খবর পাঠাতে শুরু করলেন। প্রতিদিন জেলার নানা প্রান্ত থেকে গরু চুরির খবরও আসতে লাগল ঢের। টানা কয়েক দিন চলার পর স্থানীয় সাংবাদিকেরাই টিপ্পনী, লাঞ্ছনার শিকার হলেন। কারও কারও উপাধি জুটল ‘গরু চোর সাংবাদিক’। অবশেষে সাংবাদিকেরা ক্ষান্ত দিলেন। গরু চুরিও কমে গেল!

বখতিয়ার শিকদারের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছেন স্থানীয় সাংবাদিকেরা, যা হওয়ার কথা নয়। ফেসবুকে সত্য-অর্ধসত্য তুলে ধরা হচ্ছে এবং এসব তথ্য চোখের সামনে হাজির হচ্ছে। সাংবাদিকেরা তা এড়াতে পারছেন না। ওই জায়গা থেকে কখনো কখনো পুরোপুরি যাচাই না করেই সংবাদ তৈরি করা হচ্ছে। তাঁর মতে, ঘটনা অবশ্যই ঘটছে। কিন্তু সাংবাদিকতার জায়গা থেকে ঘটনাগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরা এবং সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকছে।

বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে কথা বলে আরও কিছু কারণ পাওয়া গেল। যদিও স্থানীয় পুলিশ বলছে, ধর্ষণ মামলার একটি বড় অংশ ভুয়া, অস্তিত্বহীন। তদন্তে নেমে তারা এমন তথ্যই পাচ্ছে। জেলার সাবেক পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেন গত বছরের ১২ মার্চ প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে সরাসরি বলেছেন, ‘অনেক ঘটনা সম্মতিক্রমে হয়। যখন কেউ দেখে ফেলে, তখন ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার মামলা হয়। এর বাইরে কিছু মিথ্যা মামলাও আছে।’

একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও নারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বড় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। সাধারণত বামপন্থী সংগঠনগুলো সামাজিক ঘটনায় বেশি সোচ্চার হয়। কিন্তু নোয়াখালী অঞ্চলে বামপন্থী সংগঠনের কাজকর্ম সম্প্রতি কম। যদিও ফেনীর নুসরাত ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে একধরনের প্রতিবাদ আমরা দেখেছি। হালে নোয়াখালীর এক–দুটি ঘটনায়ও প্রতিবাদ হয়েছে, তবে তা অবশ্যই যথেষ্ট নয়।

৩.

এবার সাংবাদিকতার জায়গা থেকে কিছু কথা বলা যাক। ঘটনা ঘটলে রিপোর্টাররা তা নিয়ে প্রতিবেদন করবেন, যদি তার সংবাদমূল্য থাকে, এটাই দস্তুর। ঘটনাটি ধর্ষণের হোক আর যেটাই হোক।

একটি অঞ্চলে নানা ধরনের ক্রিয়াকর্ম ঘটে। জেলার একজন রিপোর্টারকে সব দিকে নজর দিতে হয়। কেবল বিশেষ কোনো নেতিবাচক বিষয়ের প্রতি অতি আগ্রহ বিধেয় নয়। কিন্তু এখনকার রিপোর্টারদের কেউ কেউ তা-ই করছেন। সোজা কথা হচ্ছে—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রযুক্তিসহ আরও অনেক বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের কাজ করার রয়েছে। সে বিষয়গুলোও আসতে হবে। প্রথিতযশা অনেক সাংবাদিকের জন্ম নোয়াখালী অঞ্চলে। ওবায়েদ উল হক, আবদুস সালাম, জহুর হোসেন চৌধুরী, এ বি এম মূসাসহ আরও অনেক নাম উল্লেখ করা যায়। ওই সব গুণীজনের উত্তর পুরুষেরা সাংবাদিকতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলবেন, তা হতে পারে না।

পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতারা যৌথভাবে সচেতনতামূলক কাজ করতে পারেন। যদিও এর আগে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে আমরা জেনেছি, সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পরও অপরাধ কমেনি। আর মৃত্যুদণ্ডের বিধান যে অপরাধ কমিয়ে দেবে, তা-ও বলা যায় না। কারণ, অপরাধী প্রভাবশালী গোষ্ঠী হলে ভিকটিম মামলাই করতে পারবে না। আর মামলা হলেও প্রমাণ করা কঠিন

নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর বাংলাদেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। এ দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশই ওই অঞ্চল থেকে এসেছে। তারা দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। নোয়াখালী জেলার ব্র্যান্ড তৈরিতে সাংবাদিকদেরও ভূমিকা আছে এবং তা রাখতে হবে।

এ জায়গাতে স্থানীয় সাংবাদিকদের কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কারণ, মামলা হওয়ার পরই তাঁরা প্রতিবেদন পাঠাচ্ছেন এবং গণমাধ্যমও তা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার বা প্রকাশ করছে। তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের, এরপর বিচার করবেন আদালত। এ ক্ষেত্রে তাঁদের কী করার থাকতে পারে?

এবার সে কথায় আসা যাক। তাঁরা গবেষকের দৃষ্টিতে অনুসন্ধান করে শিকড়সহ এসব অপরাধের বৃক্ষটি উৎপাটন করতে পারেন। কিন্তু তেমন দেখা যায় না।

এর বাইরে তাঁরা আরও একটি কাজ করতে পারেন। সাংবাদিকেরা রাষ্ট্র ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। আলাপে জানা গেল, ধর্ষণের মামলায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, বিষয়টি স্থানীয় মানুষের অনেকেরই জানা নেই। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়। কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এটা জনগণকে জানানো ও সচেতন করা কঠিন।

পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতারা যৌথভাবে সচেতনতামূলক কাজ করতে পারেন। যদিও এর আগে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে আমরা জেনেছি, সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পরও অপরাধ কমেনি। আর মৃত্যুদণ্ডের বিধান যে অপরাধ কমিয়ে দেবে, তা-ও বলা যায় না। কারণ, অপরাধী প্রভাবশালী গোষ্ঠী হলে ভিকটিম মামলাই করতে পারবে না। আর মামলা হলেও প্রমাণ করা কঠিন। কারণ সাক্ষী সুরক্ষা আইন নেই। আমাদের দেশে প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কে সাক্ষ্য দিতে যায়?

তারপরও ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড, বার্তাটি অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রচারের দরকার আছে। পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, এনজিও এবং ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে নোয়াখালী অঞ্চলের সাংবাদিকেরাও বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে পারেন। আরও কী কী করা যায়, আপনারা ভাবুন। তা না হলে ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’-এর বাড়বাড়ন্ত চলতেই থাকবে। আর ন্যক্কারজনক কাজে নোয়াখালীও বারবার ‘চ্যাম্পিয়ন’ হতে থাকবে।

  • কাজী আলিম-উজ-জামান, প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক।
    [email protected]