মোটরসাইকেল রাখলে বছরে দুবার সরকারকে টাকা দিতে হবে?

দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা এখন প্রায় ৪৮ লাখের কাছাকাছি। এর বড় একটি অংশ ১০০ থেকে ১৫০ সিসির মধ্যে, অর্থাৎ ব্যবহারকারীরা মূলত মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।ছবি: প্রথম আলো

দেশের বাজেট শুধু সংখ্যার খেলা নয়; এটি রাষ্ট্রের দর্শনের আয়না। সরকার যখন নতুন কোনো কর আরোপের কথা চিন্তা করে, তখন প্রশ্ন শুধু “কত টাকা উঠবে” নয়—প্রশ্ন হওয়া উচিত, “কার কাঁধে সেই বোঝা চাপছে?”

২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোটরসাইকেলের ওপর অগ্রিম আয়কর আরোপের পরিকল্পনা সেই প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। ১১১ সিসি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির মোটরসাইকেলের ওপর বছরে দুই হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর বসানোর কথা বলা হচ্ছে।

সরকারের দৃষ্টিতে এটি একটি রাজস্ব সম্প্রসারণ উদ্যোগ—যা বিদ্যমান আয়কর কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রশাসনিকভাবে সহজে আদায়যোগ্য। কারণ ব্যক্তিগত গাড়ি, জিপ, বাস, ট্রাক এমনকি সিএনজিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রেও অগ্রিম আয়কর দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। তাই নীতিগতভাবে প্রশ্ন ওঠে—মোটরসাইকেল কেন এই কাঠামোর বাইরে থাকবে?

এই যুক্তি কাগজে-কলমে হয়তো শক্তিশালী। রাষ্ট্রের হিসাব বলছে, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা এখন প্রায় ৪৮ লাখের কাছাকাছি। এর বড় একটি অংশ ১০০ থেকে ১৫০ সিসির মধ্যে, অর্থাৎ ব্যবহারকারীরা মূলত মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। এখানে কর-জাল সম্প্রসারণ করলে বিপুল রাজস্ব আসতে পারে, যা দেশের উন্নয়ন ব্যয়, অবকাঠামো এবং সেবা খাতে ব্যবহার করা সম্ভব।

কিন্তু রাষ্ট্রের হিসাবের বাইরে আরেকটি বাস্তবতা আছে, যেটা সংখ্যার মারপ্যাঁচে ধরা যায় না, কিন্তু নাগরিকের জীবনে গভীর দাগ কেটে যায়।

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়। এটি এখন অনেক নিন্ম আয়ের মানুষের বেঁচে থাকার মাধ্যম। শহরের যানজটে আটকে থাকা একজন চাকরিজীবীর জন্য এটি সময় বাঁচানোর উপায়। জেলা শহরের একজন আইনজীবীর জন্য আদালত ও মক্কেলের মাঝে চলাচলের সেতু। একজন সাংবাদিকের জন্য ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর স্বাধীনতা, আর একজন ডেলিভারি রাইডার বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য এটি জীবিকার ভিত্তি। 

এই বাস্তবতায় মোটরসাইকেল কেবল একটি সম্পদ নয়—এটি বহু মানুষের কাছে একটি দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য কর্মযন্ত্র।

নীতিগতভাবে সরকার বলছে, ট্যাক্স টোকেন হলো যানবাহন ব্যবহারের ফি, আর এআইটি হলো আয়করের অগ্রিম অংশ, যা পরবর্তী সময়ে রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য। কিন্তু বাস্তব ব্যবহারকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিভাজন এতটা পরিষ্কার নয়। কারণ, সাধারণ নাগরিকের কাছে দুটি বিষয়ই একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়: ‘মোটরসাইকেল রাখতে হলে আমাকে প্রতিবছর দুবার করে সরকারকে টাকা দিতে হবে।’

এই জায়গা থেকেই শুরু হয় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার টানাপোড়েন। কারণ, করনীতির কাগুজে যুক্তি আর জীবনের বাস্তবতা সব সময় এক লাইনে চলে না।

সরকার বলছে, এটি অগ্রিম আয়কর অর্থাৎ আয়কর রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য একটি প্রিপেমেন্ট। অর্থনৈতিকভাবে এটি ঠিক; কিন্তু বাস্তব জীবনে এটি রাষ্ট্রের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য গলার কাঁটার সমতুল্য। যাঁদের আয় সীমিত এবং অনিয়মিত, তাঁদের জন্য ‘অগ্রিম’ শব্দটি কেবল একটি হিসাব নয়, বরং মাসিক বাজেটের ওপর সরকারের আরোপিত একটি অতিরিক্ত চাপ। জ্বালানি, কিস্তি, সংসার খরচ আর অনিশ্চিত আয়ের মধ্যে নতুন কর অনেকের কাছে ছোট অঙ্ক হলেও বাস্তবতায় এটি একটি নতুন চাপের স্তর তৈরি করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সামাজিক ন্যায্যতা। ১১০ সিসি পর্যন্ত করমুক্ত রেখে ১১১ সিসি থেকে কর আরোপের প্রস্তাবটি কাগজে সহজ মনে হলেও বাস্তবে এটি একটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে। একই ধরনের ব্যবহার, একই ধরনের আয়ের মানুষ—শুধু ইঞ্জিন ক্ষমতার সূক্ষ্ম পার্থক্যের কারণে কেউ করের বাইরে, কেউ করের ভেতরে চলে যাচ্ছে। এ ধরনের সীমারেখা নীতিগতভাবে প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক হলেও সামাজিকভাবে প্রশ্ন তৈরি করে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে এই সিদ্ধান্তের পক্ষে রাষ্ট্রের অবস্থানও দুর্বল নয়। উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে করজাল সম্প্রসারণ একটি অপরিহার্য প্রক্রিয়া। রাজস্ব ছাড়া অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা সেবা খাত টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। মোটরসাইকেল খাতে কর আরোপ করলে সেই অর্থ আবার জনসেবায় ফিরে আসার সম্ভাবনাও থাকে। অর্থাৎ এটি একটি চক্র—নাগরিক দেয়, রাষ্ট্র ফেরত নেয়।

কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই চক্র নাগরিকের কাছে ভারসাম্যপূর্ণ মনে না হয়। এখানেই আসল প্রশ্নটা অর্থনৈতিক নয়, এটি সম্পর্কের প্রশ্ন, রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্ক। রাষ্ট্র হলো সরকার আর নাগরিকদের মধ্যকার একটি সামাজিক চুক্তি।

কর শুধু টাকা তোলার ব্যবস্থা নয়; এটি একটি সামাজিক চুক্তি। নাগরিক তার সামর্থ্য অনুযায়ী রাষ্ট্রকে দেয়, আর রাষ্ট্র সেটার বিনিময়ে নিরাপত্তা, অবকাঠামো ও সুযোগ তৈরি করে। এই চুক্তি যত ন্যায্য মনে হয়, রাষ্ট্র তত শক্তিশালী হয়। কিন্তু যখন নাগরিক অনুভব করে—তার ওপর চাপ বাড়ছে, অথচ তার জীবনে দৃশ্যমান স্বস্তি বা সুবিধা সেই অনুপাতে বাড়ছে না, তখন সেই চুক্তিতে ফাটল ধরে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের বড় অংশই কোনো উচ্চ আয়ের শ্রেণির অংশ নয়। তারা প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধের মানুষ—সময়ের সঙ্গে লড়াই করা মানুষ। তাদের কাছে মোটরসাইকেল কোনো ‘লাক্সারি স্ট্যাটাস’ নয়, বরং একটি ‘সংসার চালানোর, সমাজে টিকে থাকার যন্ত্র’। এই বাস্তবতায় করনীতি যখন শুধু আয় বা সম্পদের ভিত্তিতে নয়, বরং ব্যবহারের বাস্তবতা বিবেচনা না নিয়েই তৈরি হয়, তখন সেটি সামাজিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

সবশেষে প্রশ্নটা খুবই সরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ—একই মোটরসাইকেলের ওপর কি রাষ্ট্র একাধিক স্তরে একই ধরনের কর চাপিয়ে দিচ্ছে, নাকি এটি সত্যিই আলাদা আলাদা নীতিগত যুক্তি?

বর্তমানে মোটরসাইকেলমালিকেরা প্রতিবছর ট্যাক্স টোকেন নবায়নের সময় নির্ধারিত রোড ট্যাক্স, রেজিস্ট্রেশন চার্জ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ফি পরিশোধ করছেন। এই ট্যাক্স টোকেন মূলত রাষ্ট্রকে দেওয়া একটি বাধ্যতামূলক বার্ষিক ফি, যার মাধ্যমে যানবাহন সড়কে চলাচলের বৈধতা বজায় থাকে। অর্থাৎ এটি কোনো প্রতীকী কর নয়, এটি সরাসরি রাষ্ট্রকে দেওয়া নিয়মিত আর্থিক অবদান।

এখন প্রস্তাবিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) যুক্ত হলে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন সামনে আসে—যখন একই সম্পদের (মোটরসাইকেল) ওপর রাষ্ট্র ইতিমধ্যে নিয়মিত বার্ষিক কর নিচ্ছে, তখন আবার একই সম্পত্তি ধরে অতিরিক্ত আয়কর চাপানোর যৌক্তিক সীমা কোথায়?

নীতিগতভাবে সরকার বলছে, ট্যাক্স টোকেন হলো যানবাহন ব্যবহারের ফি, আর এআইটি হলো আয়করের অগ্রিম অংশ, যা পরবর্তী সময়ে রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য। কিন্তু বাস্তব ব্যবহারকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিভাজন এতটা পরিষ্কার নয়। কারণ, সাধারণ নাগরিকের কাছে দুটি বিষয়ই একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়: ‘মোটরসাইকেল রাখতে হলে আমাকে প্রতিবছর দুবার করে সরকারকে টাকা দিতে হবে।’

এই জায়গাতেই মূল আপত্তি তৈরি হয়। যখন একটি খাত ইতিমধ্যে নিয়মিত কর কাঠামোর আওতায় আছে, তখন নতুন করে একই ভিত্তির ওপর আরেকটি বাধ্যতামূলক কর আরোপ করলে সেটি কার্যত করের স্তর বৃদ্ধি হিসেবে অনুভূত হয়। বিশেষ করে যেখানে মোটরসাইকেল অনেকের কাছে আয় উৎপাদনকারী সম্পদ নয়, বরং জীবনধারণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যম, সেখানে এই অতিরিক্ত স্তরটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক চাপও তৈরি করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ন্যায্যতার অনুভূতি। ট্যাক্স টোকেন ইতিমধ্যে একটি সর্বজনীন বার্ষিক অবদান নিশ্চিত করছে। এর ওপর আবার সিসিভিত্তিক এআইটি যুক্ত হলে একই সম্পদের ওপর বারবার কর আরোপের ধারণা তৈরি হয়, যা সাধারণ নাগরিকের কাছে সহজভাবে ‘একই জিনিসের জন্য বারবার টাকা দেওয়া’ হিসেবে ধরা পড়ে। করনীতি অর্থনীতিতে বৈধ হলেও নাগরিকের মানসপটে এই পুনরাবৃত্ত করের বোঝা অযৌক্তিক মনে হতে পারে।

সবশেষে মূল প্রশ্নটি তাই আইনগত নয়, বরং নীতিগত ভারসাম্যের, যেখানে রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কর আদায়ের দক্ষতার চেয়ে নাগরিকের ওপর মোট সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ও করের চাপ কতটা ন্যায্য ও সহনশীল রাখার চেষ্টা রাষ্ট্র করছে। কারণ, কর যতই প্রযুক্তিগতভাবে যুক্তিসংগত হোক না কেন, যদি সেটি বিদ্যমান অবদানের ওপর অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে অনুভূত হয়, তাহলে সেটি সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষায় কঠিন হয়ে পড়ে।

  • শামস নজীব সিনিয়র লিগ্যাল অফিসার, প্রথম আলো

    মতামত লেখকের নিজস্ব