গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রাতেইয়ের একটি হাইস্কুলে শিক্ষক–সংকটকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১০ দিনের মাথায় সেই ক্ষোভের আগুন পুরো প্যারিস অঞ্চল ছাড়িয়ে ফ্রান্সের কোনায় কোনায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
৫ অক্টোবর বিক্ষোভ তৃতীয় সপ্তাহে পা রাখার পর সহিংসতা ও উত্তেজনা আরও তুঙ্গে পৌঁছেছে। কয়েক দশকের মধ্যে ফরাসি কিশোর-কিশোরীদের এই আন্দোলন তার ব্যাপ্তি ও মেজাজের দিক থেকে ইতিমধ্যে দেশের অন্যতম এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধে রূপ নিয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই থমথমে যে সোমবার শুধু প্যারিস অঞ্চলেই অন্তত ১৬০টি হাইস্কুল (মোট স্কুলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় স্থানীয় প্রশাসন। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এদেরিয়াঁ গেফ্রে জানান, বিক্ষোভের মুখে দেশজুড়ে ৪০০-৫০০টি স্কুলের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে; যদিও কিছু জায়গায় ধীরগতিতে ক্লাস শুরুর চেষ্টা চলছে।
গত বৃহস্পতিবারের (১ অক্টোবর) মধ্যে ফ্রান্সের মোট ৩ হাজার ৬০০টি হাইস্কুলের প্রায় ৩০ শতাংশই ধর্মঘটের কবলে পড়ে। প্রতিদিন নতুন নতুন স্কুল এতে যুক্ত হচ্ছে। রাজধানী, তার আশপাশের উপশহর, বড় শহর এমনকি ছোট ছোট মফস্সল শহরগুলোতেও হাজার হাজার হাইস্কুল শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে এসেছে। সরকারি স্কুলের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের মূল কারিগর হলেও কিছু বেসরকারি স্কুলেও এর প্রভাব পড়েছে। সাধারণ ও কারিগরি—সব ধরনের স্কুলের শিক্ষার্থীরাই এখন এক সারিতে।
শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন এসএনইএস-এফএসইউ-এর প্রধান সোফি ভেনেতিতে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা এক ঐতিহাসিক ছাত্র বিক্ষোভের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। সরকারের পক্ষে এই সংকট কাটানো মোটেও সহজ হবে না।’
হঠাৎ কেন এমন দাবানল?
একটি স্কুলের পিকেট থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এত দ্রুত পুরো দেশে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল? স্কুলের ফটক অবরোধ বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজের ভাষায় তথাকথিত ‘নগর সহিংসতা’ কিংবা বিচ্ছিন্ন ভাঙচুরের ঘটনাকে সামনে রেখে এই আন্দোলনের আসল চরিত্র ঢাকা দেওয়া যাবে না। এ আন্দোলন অনেক দিক থেকেই ফরাসি ইতিহাসের প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে।
কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্ব বা উসকানি ছাড়াই একেবারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর ভর করে এই আন্দোলনের জন্ম। পরে অবশ্য বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসে যোগ দিয়েছেন। ঐতিহ্যগতভাবে ফ্রান্সে যেকোনো ছাত্র আন্দোলন প্যারিস শহর থেকে শুরু হলেও এবার আন্দোলন শুরু হয়েছে অবহেলিত উপশহরগুলো থেকে। আন্দোলনটি বসন্তের চেনা মৌসুমে নয়, শুরু হয়েছে শরতে; এমনকি সরকারের কোনো নতুন বিতর্কিত শিক্ষা সংস্কার বিলের কারণেও এটি ঘটেনি।
২০২৬ সালের এই আন্দোলনের সঙ্গে ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক হাইস্কুল আন্দোলনের দারুণ মিল রয়েছে। সে বছরও নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় প্যারিসের উপশহরগুলো থেকে ক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল। তৎকালীন ও বর্তমান—উভয় আন্দোলনই রাজপথে নেমেছে শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের তীব্র ক্ষোভ ও অবহেলার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে, যা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে চমকে দিয়েছে।
কর্মসংস্থান ছাঁটাই
স্কুলের সামনের প্রতিটি ব্যারিকেডে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা এখন উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ তুলছে। তাদের দাবি স্পষ্ট—স্কুলে তীব্র শিক্ষক–সংকট, অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় বিকল্প শিক্ষকের অভাব, একেকটি ক্লাসে ৩৫ জনের ওপর শিক্ষার্থী, অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিতর্কিত কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘পারকুরসাপ’—যা তাদের স্বপ্নকে গলা টিপে ধরছে, এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন।
শিক্ষার্থীদের এই স্লোগানগুলোকে কেউ কেউ বিশৃঙ্খলা বা কিশোরসুলভ ঔদ্ধত্য হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু এই প্রতিবাদের পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক উদ্বেগ—সুযোগের সমতা রক্ষা করা। ফ্রান্সের মতো দেশে যেখানে পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিক ব্যাকগ্রাউন্ড শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে, সেখানে সরকারি ব্যবস্থার এই অবক্ষয় তরুণদের তীব্র ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
বর্তমান হাইস্কুল শিক্ষার্থীরা জন্ম নিয়েছিল ২০১০ সালের দিকে, যে সময়টায় ফ্রান্সে শিশু জন্মের হার শীর্ষে ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর দুই মেয়াদের শাসনামলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে হাজার হাজার শিক্ষক পদ বিলুপ্ত করা হয়। ফলে ২০০৮ সালের তুলনায় বর্তমানে সরকারি স্কুলে শিক্ষক সংখ্যা মারাত্মক কমেছে, অথচ শিক্ষার্থী বেড়েছে আড়াই লাখের বেশি! বর্তমানে সাধারণ ও কারিগরি হাইস্কুলগুলোর ৭০ শতাংশ ক্লাসরুমে ৩০ জনের বেশি এবং ২০ শতাংশ ক্লাসে ৩৫ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বসতে বাধ্য হচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শিক্ষক নিয়োগের অভূতপূর্ব শূন্যতা। গত ২০ বছরে অতিরিক্ত শূন্য পদ ও বিকল্প শিক্ষকের সংকট বাড়ায় দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষক অনুপস্থিতির হার ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে। প্যারিসের উপশহরের স্কুলগুলোতে এই ভোগান্তি সবচেয়ে নগ্ন রূপ নিয়েছে।
এর সঙ্গে রয়েছে ২০১৮ সালের বিতর্কিত হাইস্কুল সংস্কারের প্রভাব। ওই সময় মূল বিষয়গুলোর বদলে শিক্ষার্থীদের ১২টি বিশেষ বিষয়ের সমন্বয়ে নিজস্ব রুটিন তৈরির সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের সময়সূচি বা রুটিন অত্যন্ত জটিল ও ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে।
শিক্ষকদের একটি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এলিজাবেথ আলাঁ-মোরেঁনো খোলামেলাই বললেন, ‘মাখোঁর ১০ বছরের শিক্ষানীতির পর এই শিক্ষার্থীরা যে রাজপথে নামবে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। বরং অবাক হওয়ার বিষয়—তারা এত দিন সহ্য করল কীভাবে!’
পরীক্ষার তীব্র চাপ
ফরাসি স্কুল ভবনগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। গড়ে একটি হাইস্কুল ভবনের বয়স ৬১ বছর এবং কারিগরি স্কুল ভবনের বয়স প্রায় ৭১ বছর। ২০১৫ সালের পর মাত্র ১৫ শতাংশ ভবন সংস্কার বা নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি স্কুল ভবনে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী গাদাগাদি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে চরম তাপপ্রবাহ বা ‘হিটওয়েভ’-এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো কোনো ব্যবস্থা এসব পুরোনো ভবনে নেই। কয়েক বছর ধরেই গ্রীষ্মে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপপ্রবাহের মধ্যে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে কিশোরদের। আন্দোলনের প্ল্যাকার্ডেও ফুটে উঠেছে সেই ক্ষোভ—‘৪০ ডিগ্রি তাপপ্রবাহে কীভাবে পরীক্ষার হলে বসব?’
অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির অনলাইন পোর্টাল ‘পারকুরসাপ’ শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট মনতেইন’-এর ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এই প্ল্যাটফর্মের কারণে তীব্র মানসিক চাপ ও উৎকণ্ঠায় ভোগে এবং ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী এটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী অলিভিয়ার গ্যালঁ বলেন, ‘কিশোরদের মধ্যে একধরনের গভীর মানসিক হতাশা কাজ করছে। নিজের স্কুলে আগুন দেওয়া বা ভাঙচুর করা নিশ্চয়ই কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; এটি একটি শক্তিশালী প্রতীকী প্রতিবাদ। শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং অসম প্রতিযোগিতার চাপে একদল তরুণ নিজেদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ও একঘরে ভাবছে। তারা ভয় পাচ্ছে, এই ব্যবস্থার কারণে তাদের ভবিষ্যৎ চিরতরে অন্ধকার হয়ে যাবে।’
রাজনীতির মাঠেও এই ক্ষোভ সরকারের জন্য এক মস্ত বড় গলার কাঁটা। কারণ, এটি নির্দিষ্ট কোনো আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয় যে সরকার আইনটি প্রত্যাহার করে নিলেই পরিস্থিতি ঠান্ডা হয়ে যাবে (যেমনটি ২০০৬ সালে তরুণদের কর্মসংস্থান চুক্তির ক্ষেত্রে ঘটেছিল)। আন্দোলনের দুই সপ্তাহ পর গত শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস দিলেও কোনো বড় সমাধান আসেনি। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লোকোর্নু মন্ত্রীদের একটিই নির্দেশনা দিয়েছেন—‘সহিংসতার মুখে কঠোরতা এবং যৌক্তিক দাবিতে কান দেওয়া—দুটোই একসঙ্গে চালাতে হবে।’
অথচ ১৯৯০ সালের প্রাক্কালে ঠিক এই ধরনের ছাত্র আন্দোলন থামাতে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী লিওনেল জোসপাইন এক লহমায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ফ্রাঁর জরুরি বরাদ্দ ঘোষণা করেছিলেন। তবে ইতিহাসবিদ ক্লোদ লেলিভ্রে মনে করেন, ‘বর্তমান সরকারের হাতে পর্যাপ্ত বাজেট বা আর্থিক স্বাধীনতা নেই। তাই সরকার শিক্ষার্থীদের সন্ত্রাসী বা স্বার্থান্বেষী মহল দ্বারা চালিত হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের দায় এড়ানোর সহজ পথ খুঁজছে।’
‘আমাদের কথা কেউ গুরুত্ব দিয়ে শোনে না’
আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই বিচ্ছিন্ন সহিংসতাকে মনোযোগের কেন্দ্র বানিয়ে বিরোধী দল, বিশেষ করে বামপন্থী দল ‘লা ফ্রঁস আঁসমিজ’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলছে সরকার। রাজনীতিবিজ্ঞানী রবি মোর্দের মতে, এটি রাজনৈতিক নেতাদের খুব পুরোনো একটা কৌশল।
রবি মোর্দে বলেন, ‘তরুণদের বোকা ভাবা বন্ধ করা উচিত। কিশোরদের সামাজিক আন্দোলনকে আমাদের দেশে কখনোই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না। আন্দোলনের দাবিগুলো যদি কোনো দলের রাজনৈতিক ইশতেহার হতো, তবে এগুলো এত এলোমেলো হতো না। এটি অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্ত।’
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশের অভূতপূর্ব ও নির্দয় শক্ত অবস্থান। মোর্দের মতে, ‘হাইস্কুল আন্দোলনে এমন গণগ্রেপ্তারের ইতিহাস ফ্রান্সে আগে কখনো দেখা যায়নি।’ আন্দোলনের শুরু থেকে এ পর্যন্ত পুলিশ পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে। এই সময়ে ২৪টি স্কুলে ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে; আহত হয়েছেন ৭৮ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তা।
অন্যদিকে অন্তত ১৮০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে, যাদের অনেকের শরীরেই পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাত রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানী সেবাস্তিয়ান রোশে জানান, ‘প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর দুই মেয়াদের শাসনামলে ক্রাউড বা জটলা নিয়ন্ত্রণের যে কঠোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল, রাজপথে প্রথমবার নামা এসব কিশোর-কিশোরীদের ওপরও এখন তার অবিকল প্রয়োগ দেখছি আমরা। ভয় দেখিয়ে নিরুৎসাহিত করার জন্য এই গণগ্রেপ্তার এবং পুলিশের অভিযানের মূল হাতিয়ার হিসেবে অস্ত্রের ব্যবহারই এখন প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে।’
সিলভি লেশারবোঁনিয়ে ও এলেয়া পোমিয়ার ল্য মোঁদ পত্রিকার সাংবাদিক।
ল্য মোঁদ থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।