শিল্পবিপ্লবের পর থেকে আধুনিক সভ্যতার বিকাশ মূলত জ্বালানিসম্পদের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। ১৯৭০ সালের আগে দীর্ঘ সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম তিন ডলারের আশপাশে ছিল। কিন্তু ভূরাজনৈতিক সংঘাত শুরু হলে এই স্থিতিশীলতা দ্রুত ভেঙে পড়ে।
১৯৭৩ সালে মধ্যপ্রাচ্যের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যখন তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন বিশ্ব প্রথম বড় জ্বালানি–সংকটের মুখোমুখি হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৩ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ১২ ডলার হয়, অর্থাৎ প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পায়। এ ঘটনা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেয় এবং জ্বালানি–নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
পরবর্তী কয়েক দশকেও জ্বালানি বাজার বারবার ভূরাজনৈতিক সংঘাতে প্রভাবিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯), ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-৮৮) এবং উপসাগরীয় যুদ্ধ (১৯৯০-৯১) বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। আশির দশক থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় প্রতি ব্যারেল তেলের দাম সাধারণত ২৫ ডলারের নিচে ছিল। কিন্তু এরপর আবার দ্রুত পরিবর্তন দেখা যায়। মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে ২০০৮ সালে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম প্রায় ১৪০ ডলার পর্যন্ত উঠে যায়, যা ইতিহাসে অন্যতম বড় মূল্যবৃদ্ধি।
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে আবারও নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছিল প্রায় ৮০ ডলার প্রতি ব্যারেল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। একই সঙ্গে তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দামও দ্রুত বাড়ছে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের তেল শোধনাগার ও এলএনজি অবকাঠামো মিসাইল হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠছে। অন্যদিকে পারস্য উপসাগর অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর। এ অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ সম্পন্ন হয়। এই পথ বাধাগ্রস্ত হলে বা সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি–নিরাপত্তার ওপর। ইতিমধ্যে ইরান পশ্চিমা দেশের জ্বালানি পরিবহনকারী ট্যাংকারগুলোর চলাচল নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তারা সতর্ক করেছে যে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার পর্যন্তও পৌঁছাতে পারে।
ইতিহাসে চেরনোবিল ও ফুকুশিমা দুর্ঘটনা দেখিয়েছে যে বড় ধরনের পারমাণবিক দুর্ঘটনা কখনোই একটি দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব প্রতিবেশী অঞ্চল এবং কখনো কখনো পুরো মহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসকারী বিপুল জনগোষ্ঠীকে কোথায় এবং কীভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। আবার যারা সেখানে অবস্থান করবে, তাদের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ।
এতক্ষণ ছিল জ্বালানি–সংকটের দিকটি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো পারমাণবিক নিরাপত্তাঝুঁকি। মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে পারমাণবিক স্থাপনা বিদ্যমান। ইরানে রয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গবেষণাচুল্লি, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংরক্ষণাগার। সংযুক্ত আরব আমিরাতে চারটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। জর্ডান ও সিরিয়াতেও গবেষণাচুল্লি রয়েছে। এ ছাড়া বাহরাইন, ইরাক, কাতার, কুয়েত, ওমান, সৌদি আরবসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা ও গবেষণার কাজে বহু তেজস্ক্রিয় পদার্থ ব্যবহৃত হচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে এই ঝুঁকি আরও জটিল। কারণ, অধিকাংশ পারমাণবিক স্থাপনা উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। উদাহরণস্বরূপ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পারস্য উপসাগরের উপকূলে অবস্থিত।
বর্তমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দূরপাল্লার মিসাইল হামলায় এসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা বড় ধরনের পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সুযোগসন্ধানী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে তেজস্ক্রিয় পদার্থ চুরি করে তথাকথিত ডার্টি বোমা তৈরি করতে পারে। এমন বিস্ফোরণ জনাকীর্ণ এলাকায় ঘটলে তা ব্যাপক আতঙ্ক, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভৌগোলিক দূরত্ব তুলনামূলকভাবে সীমিত। অঞ্চলটির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের দূরত্ব প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। আবার শহরগুলোও অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের কাছাকাছি অবস্থিত। এর ফলে জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে এই অঞ্চল চেরনোবিল বা ফুকুশিমার আশপাশের অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি ঘনবসতিপূর্ণ।
যদি কোনো পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুর্ঘটনায় পতিত হয়, তাহলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বায়ুমণ্ডল বা সমুদ্রের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আমার একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে অনুকূল আবহাওয়ায় বায়ুমণ্ডলীয় পরিবহনের মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়তা প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে। সমুদ্রের স্রোতের মাধ্যমেও দূরবর্তী এলাকায় দূষণ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ মরু অঞ্চল হওয়ায় সমুদ্রের পানি তাদের প্রধান ভরসা। তাই সমুদ্র দূষিত হলে পানির নিরাপত্তাও বড় সংকটে পড়তে পারে।
ইতিহাসে চেরনোবিল ও ফুকুশিমা দুর্ঘটনা দেখিয়েছে যে বড় ধরনের পারমাণবিক দুর্ঘটনা কখনোই একটি দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব প্রতিবেশী অঞ্চল এবং কখনো কখনো পুরো মহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাসকারী বিপুল জনগোষ্ঠীকে কোথায় এবং কীভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। আবার যারা সেখানে অবস্থান করবে, তাদের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ।
এ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে কোনো সামরিক সংঘাতের লক্ষ্যবস্তু যেন পারমাণবিক স্থাপনা না হয়। সংস্থার মহাপরিচালক সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও পারমাণবিক নিরাপত্তা কনভেনশন মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সম্ভাব্য রেডিওলজিক্যাল জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সংস্থার জরুরি পর্যবেক্ষণব্যবস্থাও সক্রিয় করা হয়েছে।
এমতাবস্থায় পারমাণবিক ঝুঁকি শুধু দুর্ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমান বিশ্বে বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, সাইবার প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলছে। ভুল তথ্য, প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা ভুল–বোঝাবুঝি থেকেও বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এসব কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভূরাজনীতিতে জ্বালানি–নিরাপত্তা এবং পারমাণবিক নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে জ্বালানি–নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত মানবসভ্যতার জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এই যুদ্ধে কে জিতবে বা কে হারবে, তা বিশ্লেষণের বিষয় নয়। কিন্তু লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি, রক্তপাত এবং অসংখ্য অবকাঠামো ও বসতবাড়ি ধ্বংসের মধ্য দিয়ে মানবসভ্যতা আজ গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
এই বাস্তবতায় কূটনৈতিক সংলাপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। জ্বালানি ও পারমাণবিক প্রযুক্তি মানবকল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা, ধ্বংসের জন্য নয়। তাই মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা প্রশমনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
ড. মো. শফিকুল ইসলাম অধ্যাপক, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক ভিজিটিং প্রফেসর, নিউক্লিয়ার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এমআইটি, যুক্তরাষ্ট্র।
ই–মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব