ইরান যুদ্ধে ক্লজউইটজ-তত্ত্ব: ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ঐতিহাসিক ভুল

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর যৌথ পরিকল্পনায় ইরানে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকেকোলাজ: প্রথম আলো

কার্ল ফন ক্লাউজেভিৎস (১৭৮০-১৮৩১) প্রুশিয়ার একজন জেনারেল ও সামরিক তত্ত্ববিদ ছিলেন। তাঁর রচিত মাস্টারপিস ‘অন ওয়ার’ যুদ্ধকৌশলবিষয়ক একটি মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি লিখেছেন, যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য তিনটি:

১. শত্রুর সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাজিত ও ধ্বংস করা।
২. শত্রুর দেশকে নিজেদের দখলে নেওয়া।
৩. শত্রুর যুদ্ধ করার মনোবলকে বা যুদ্ধ করার স্পৃহা/ইচ্ছাকে ধ্বংস করা

চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল এবং ইরানের যুদ্ধের উদ্দেশ্য, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে পরিবর্তন করা। ইরানের শাসনব্যবস্থা সম্বন্ধে তাদের স্পষ্ট কোনো ধারণা আছে বলে মনে হয় না। থাকলে তারা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ  আলী খামেনিকে হত্যা করতে যেত না। ইরানের জনগণের কাছে খামেনি এখন একজন শহীদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। ভেদাভেদ দূর করে ইরানি জাতি প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞায় একত্র হয়েছে।

কার্ল ফন ক্লাউজেভিৎস মানবসভ্যতার হাজার বছরের ইতিহাস ঘেঁটে প্রতিটি যুদ্ধের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে তাঁর বইয়ে সফল যুদ্ধের তিনটি উদ্দেশ্যকে বর্ণনা করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এই বিষয় নিয়ে লেখাপড়া করেছেন বলে মনে হয় না। তবে তাঁদের জেনারেলরা যে পড়েছেন, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কারণ, কার্ল ফন ক্লাউজেভিৎসের বইটি তাঁদের দেশের উচ্চতর সামরিক স্কুলে পাঠ্যবই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা আছে।

ইতিহাস এটাও প্রমাণ করে যে কোনো শত্রুকে আকাশপথে বোমা মেরে পরাজিত করা যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিমানবাহিনী প্রধান জেনারেল গোয়েরিংয়ের ধারণা ছিল যে ব্রিটেনকে বোমা মেরে পরাজিত করা যাবে। দ্য ব্লিটজ বা বজ্র নামের অপারেশনে জার্মান বিমানবাহিনী দীর্ঘ ৭ মাস ধরে শত শত বোমারু বিমান দিয়ে ব্রিটেনে সামরিক/বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর নির্বিচার বোমা বর্ষণ করা হয়। ফলাফল হয়েছিল উল্টো। বোমা খেয়ে ব্রিটিশ জাতি, তথা ইংরেজদের প্রতিশোধের স্পৃহা বহুগুণে বেড়ে যায়। সুতরাং আকাশপথে বোমা ফেলে একটি জাতিকে পরাজিত করা যায় না (৩ নম্বর উদ্দেশ্য)। ১ ও ২ নম্বর উদ্দেশ্য পূরণ করতে স্থলে যুদ্ধ করে সফল হতে হবে।

আরও পড়ুন

ইরানে নির্বিচার বোমা ফেলা হচ্ছে, মেয়েদের প্রাইমারি স্কুলে বোমা ফেলে প্রায় ২০০ বাচ্চা মেয়েকে খুন করা হয়েছে। এতে যে ইরানি জাতির যুদ্ধের স্পৃহা তীব্রতর হচ্ছে, কোনো সন্দেহ নেই। কিছুদিন আগেও যারা ইরানের ইসলামিক শাসন নিয়ে কথা বলত, তারাও এখন মার্কিন ও ইসরায়েল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য বদ্ধ পরিকর। ইরানকে শাসন করবে কীভাবে করবে, সেটা কি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলকে জিজ্ঞেস করে করতে হবে? তারা এত কথা বলে, কিন্তু উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে কিছু বলার সাহস পায় না, তার কারণ আমরা সবাই জানি। তারা আসলে শক্তের ভক্ত নরমের যম। ইরানকে নরম মনে করে চরম ভুল করেছে বলে মনে হচ্ছে।

ইরান যে এত দ্রুত এবং দক্ষতার সঙ্গে পাল্টা আঘাত করবে, তা কেউ মোটেই আশা করেনি। তবে তারা আশা করেছিল, জুন ২০২৫ সালের মতো মার্কিন জিপিএস ব্যবহার করে মিসাইল আক্রমণ করবে। মার্কিনরা জিপিএসকে জ্যাম করে দিতে পারে। ইরান যে ইতিমধ্যে চীনা বেইদু স্যাটেলাইট সিস্টেমে চলে গেছে, সেটা তাদের অজানা থাকার কথা নয়। কিন্তু বেইদু সিস্টেম যে এত নিখুঁত এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে, তা তারা আশা করেনি। শুধু তা–ই নয়, ইরানের মিসাইল ইসরায়েলের সর্বাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা আইরন ডোম, ডেভিড স্লিং, পাট্রিওট, থাড সিস্টেমকে অনায়াসে পরাজিত করে তেল আবিবের অনেক এলাকা গাজার মতো বানিয়ে দিয়েছে। শুধু তা–ই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর বিবিধ সামরিক স্থাপনা ও রাডার ধ্বংস করে দিয়েছে।

এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না আক্রমণকারীরা। ইরানও তাদের চরমভাবে পরাজিত না করে ছাড়বে না। একটা ভিডিও দেখে ইরানিদের মানসিক দৃঢ়তা বোঝা গেল। তেহরানের রাস্তায় লাখ লাখ লোকের মিছিলের আশপাশে বোমা পড়ছে, কেউ তাকাচ্ছেও না, কেউ দৌড়ে যাচ্ছে না, মুখে আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর স্লোগান।

ইরান এই পর্যন্ত বহুবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। ইরান বলেছে, তাদের শর্ত না মানলে কোনো যুদ্ধবিরতি হবে না। এখন কথা হচ্ছে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য পাঠানো, যাকে মার্কিনরা বলে বুটস অন গ্রাউন্ড। শনিবার সকালের খবর অনুযায়ী, আড়াই হাজার মেরিন সেনা পারস্য উপসাগরের পথে রওনা হয়েছেন।

ইরানের ভৌগোলিক আকার ৬ লাখ ৩৬ হাজার বর্গমাইল (পশ্চিম ইউরোপের সমান) এবং ৯ কোটি জনসংখ্যার তুলনায় আড়াই হাজার মেরিন সেনা নিতান্ত নস্যি বটে। ইরানের সঙ্গে স্থল যুদ্ধ করতে গেলে নিদেনপক্ষে ২০ লাখ সৈন্যের প্রয়োজন (ইরানের সেনার সংখ্যা ৭ লাখের মতো, সাধারণ হিসাবে প্রতিরক্ষার ৩ গুণ সৈন্যের প্রয়োজন)।

সেই পরিমাণ সৈন্যের সমাবেশ করতে নিদেনপক্ষে এক বছর লেগে যাবে। তারপর স্থল যুদ্ধ করতে কত দিন লাগবে, কে জানে।

তত দিন যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকে, তাহলে কী হবে। ১২–১৩ দিন বন্ধ থাকার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে আঘাত লেগেছে, তা কীভাবে সামলানো হবে, তা কারোর জানা আছে বলে মনে হয় না।

এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না আক্রমণকারীরা। ইরানও তাদের চরমভাবে পরাজিত না করে ছাড়বে না। একটা ভিডিও দেখে ইরানিদের মানসিক দৃঢ়তা বোঝা গেল। তেহরানের রাস্তায় লাখ লাখ লোকের মিছিলের আশপাশে বোমা পড়ছে, কেউ তাকাচ্ছেও না, কেউ দৌড়ে যাচ্ছে না, মুখে আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবর স্লোগান।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যদি এই ভিডিও দেখেন, তাঁদের বোঝা উচিত, তাঁরা কার সঙ্গে লাগতে গেছেন। তাঁদের উচিত হবে, এখনই সটকে পড়া। যে জাতি মৃত্যুকে ভয় পায় না, তাকে কোনোভাবেই ঠেকানো যায় না।

  • তুষার কান্তি চাকমা সাবেক সামরিক কর্মকর্তা (অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার)  
    *মতামত লেখকের নিজস্ব