ক্ষমতা ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক কতটা পরিবর্তন হলো

বাংলাদেশে আমরা দেখেছি, শাসকের চরিত্র বদলায়, নিয়ন্ত্রণের কৌশল বদলায়, কিন্তু সূত্রগুলো একই থাকে। সামরিক শাসনামলে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরকারের যে সম্পর্ক ছিল, দীর্ঘ ৩০ বছর পরেও সেই সম্পর্কের খুব বেশি পরিবর্তন কি হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন রিজওয়ান-উল-আলম

আমি তখন (১৯৯১-৯২) ইউএনবির স্টাফ রিপোর্টার। কমনওয়েলথ বৃত্তি পাওয়ার সুবাদে লন্ডনের সিটি ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগে পিএইচডি করছি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত বাংলাদেশের সামরিক সরকারগুলোর সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক বোঝা ছিল আমার গবেষণার উদ্দেশ্য। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের সময় ১১ জন শীর্ষস্থানীয় সম্পাদকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। পাশাপাশি ৭৮ জন কর্মরত সাংবাদিকের ওপর একটি জরিপ চালিয়েছিলাম। একই সময়ে, সামরিক শাসনামলে গণমাধ্যমের প্রভাব সম্পর্কে কর্মরত সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে জরিপ করতে চেয়েছিলাম, যা সম্ভব হয়নি।

আজকের নিবন্ধে সম্পাদকদের সেই সাক্ষাৎকার আর কর্মরত সাংবাদিকের ওপর পরিচালিত জরিপের কিছু তথ্য তুলে ধরছি। ক্ষমতা ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে আজকের বাংলাদেশের জন্যও এতে জরুরি কিছু শিক্ষা আছে।

 যাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছিল

সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে ছিলেন সাতজন সংবাদপত্র সম্পাদক, একজন সহকারী সম্পাদক, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার দুজন ব্যুরোপ্রধান এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংবাদ পরিচালক। সবাই দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনের পরিচিত মুখ। তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানও এক ছিল না। কেউ শেখ মুজিবুর রহমানের সমর্থক, কেউ জিয়াউর রহমানের প্রতি সহানুভূতিশীল, কেউ আবার জেনারেল এরশাদের অনুরাগী। কয়েকজন কোনো পক্ষেই ছিলেন না, ছিলেন পুরোপুরি পেশাদার অবস্থানে।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

দম বন্ধ করা ১৫ বছর

১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত গণমাধ্যমের পরিবেশ কেমন ছিল, এ প্রশ্নে প্রায় সবাই একমত হয়েছিলেন। একজন সম্পাদক স্পষ্ট করে বলেছিলেন, তাঁরা প্রবল চাপের মধ্যে কাজ করেছেন। অন্য এক সম্পাদকের পর্যবেক্ষণ ছিল আরও গভীরে। তাঁর মতে, ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু করাই ছিল সামরিক শাসনের পূর্বাভাস। অর্থাৎ গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের প্রক্রিয়া অভ্যুত্থানের আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল।

তবে সব সুর এক ছিল না। শীর্ষ এক দৈনিকের সম্পাদক ভিন্নমত জানিয়ে বলেছিলেন, ওই সময়ও সরকারের নীতির বিরোধিতা করে অনেক সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তাই তখনকার গণমাধ্যম-পরিবেশকে পুরোপুরি খারাপ বলা ঠিক হবে না। এ ভিন্নমতটুকুও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সামরিক শাসনের সময়ও প্রতিবাদের কিছু জায়গা যে টিকে ছিল, এ তারই সাক্ষ্য।

গণমাধ্যমের ওপর চাপ প্রয়োগের প্রশ্নে অবশ্য কারও দ্বিমত ছিল না। সবাই স্বীকার করেছিলেন, সামরিক শাসনের সময় নানাভাবে চাপ এসেছে। একজন ব্যুরোপ্রধানের মূল্যায়ন ছিল, ভারত ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই এটি সাধারণ প্রবণতা।

কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছিল একজন সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির একটি পর্যবেক্ষণ। তাঁর মতে, দমন-পীড়নের চেয়ে সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়েই সংবাদপত্রকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সরকারি ট্রাস্টের অধীন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সাংবাদিকদের নিয়ে তাঁর মন্তব্য ছিল নির্মম, ‘তাঁদের সাংবাদিক বলাই ঠিক নয়। সরকারি কর্মচারীদের কীভাবে সাংবাদিক বলা যায়, তা আমি বুঝতে পারি না।’

এ কথার তাৎপর্য আজও ফুরায়নি। যে সাংবাদিকের বেতন, পদোন্নতি ও ভবিষ্যৎ সরকারের হাতে, তাঁর কাছ থেকে সরকারের সমালোচনা আশা করা কঠিন। প্রশ্নটা ব্যক্তির সততার নয়, কাঠামোর।

আরও পড়ুন

প্রতিরোধের গল্প কতটা সত্য

সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি ছিল তৃতীয়টি, কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ অমান্য করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ভূমিকা কেমন ছিল? এখানে এসে সম্পাদকদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা গিয়েছিল। কেউ কেউ নিজ নিজ সংবাদপত্র ও নিজেদের ভূমিকার কথা গৌরবের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু একজন সম্পাদক সে গৌরবগাথায় সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সাফ কথা, মাঝেমধ্যে সংবাদপত্রে জায়গা ফাঁকা রেখে প্রতিবাদ জানানো ছাড়া নিয়ন্ত্রণ অমান্যের উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনা তাঁর জানা নেই।

তবে ব্যতিক্রমও ছিল। ভিন্ন আরেক ব্যুরোপ্রধান জানিয়েছিলেন, জরুরি অবস্থার সময় তাঁর সংবাদ সংস্থা সরকারের একটি নির্দেশ মানেনি। নির্দেশে বলা হয়েছিল, সংবাদ প্রকাশের আগে সরকারি কর্মকর্তার মাধ্যমে তা যাচাই করাতে হবে। কিন্তু প্রকাশপূর্ব সেন্সরশিপ–সংক্রান্ত সরকারি পরিপত্রে বিদেশি সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন ব্যবহারের বিষয়ে কিছু বলার ছিল না। আইনের সেই ফাঁক কাজে লাগিয়েই তাঁরা নির্দেশ অমান্য করেছিলেন। প্রতিরোধ তাহলে একেবারে ছিল না, তা নয়। ছিল কৌশলে, ফাঁকফোকরে, সীমিত পরিসরে।

পুরোনো পত্রিকার দোকান। চানখাঁরপুল, ঢাকা, ২ জুলাই।
ছবি: দীপু মালাকার

‘দারিদ্র্যের সংস্কৃতিতে মধ্যবিত্তের ব্যাধি’

চতুর্থ প্রশ্নের উত্তরে একজন ছাড়া সবাই স্বীকার করেছিলেন, অনেক সাংবাদিক কর্তৃপক্ষের কাছ নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। এক ইংরেজি সাপ্তাহিকের এক সম্পাদক এ প্রবণতার একটি স্মরণীয় নাম দিয়েছিলেন, ‘দারিদ্র্যের সংস্কৃতিতে মধ্যবিত্তের ব্যাধি’। তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, পেশাগত লেখার দক্ষতা কমে যাওয়ায় অনেকে চাকরি ধরে রাখতে কিংবা ভালো পদ পেতে ক্ষমতাসীনদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতেন।

সামরিক শাসকেরাও এ দুর্বলতা ভালোই বুঝতেন। কোনো কোনো সাংবাদিককে তাঁরা বাড়ি, জমি ও বিভিন্ন ধরনের অনুমতিপত্র দিয়ে সুবিধা দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারদাতাদের অনেকেই সাংবাদিকদের এভাবে প্রলুব্ধ করার জন্য সামরিক সরকারকে দায়ী করেছিলেন। আর পঞ্চম প্রশ্নে সবাই একমত হয়েছিলেন যে সামরিক শাসন দেশে সুস্থ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। একজন সম্পাদক এ ক্ষতিকে বলেছিলেন মনস্তাত্ত্বিক। বিদেশি এক ব্যুরোপ্রধানের মূল্যায়ন ছিল আরও হতাশাজনক, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা তখনো সামরিক শাসনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

৭৮ সাংবাদিক কী বলেছিলেন

সম্পাদকদের কথার সঙ্গে মাঠের সাংবাদিকদের ভাবনা মিলিয়ে দেখতে ৭৮ জন সাংবাদিকের ওপর জরিপ চালিয়েছিলাম। ১০টি বাংলা দৈনিক, ৩টি ইংরেজি দৈনিক, ২টি বাংলা সাপ্তাহিক আর ২টি সংবাদ সংস্থার সাংবাদিকেরা এতে অংশ নিয়েছিলেন। উত্তরদাতাদের ৭৩ জন পুরুষ, ৫ জন নারী। অধিকাংশই ছিলেন স্টাফ রিপোর্টার ও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। বেশির ভাগ উত্তরদাতা পরিচয় গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। সে চাওয়াটাও এক অর্থে ভয়ের সংস্কৃতিরই সাক্ষ্য। পদ্ধতির সীমাবদ্ধতার কথাও এখানে স্বীকার করা দরকার। সে সময় দেশে সাংবাদিকের সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি। সেই তুলনায় ৭৮ জনের নমুনা ছোট। উত্তরদাতা নির্ধারণে সংবাদপত্রের আকার, প্রচারসংখ্যা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।

জরিপের ফল ছিল চোখ খুলে দেওয়ার মতো। ৬৯ শতাংশ সাংবাদিক মনে করতেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বর এবং ১৯৮২ সালের মার্চে সামরিক অভ্যুত্থানের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সাংবাদিকদের একাংশ ভূমিকা রেখেছিলেন। ৭৪ শতাংশের মত ছিল, সামরিক শাসনকে রাজনৈতিক বৈধতা দিতে সংবাদপত্র ও অন্যান্য গণমাধ্যম ভূমিকা রেখেছিল। আর ৯০ শতাংশ বলেছিলেন, ১৯৭৭ এবং ১৯৮২ থেকে ৮৫ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিভ্রান্তি ছড়াতে সাংবাদিকদের একাংশ সহায়ক ভূমিকা রেখেছিলেন।

রাজনীতির হাত ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। প্রখ্যাত লেখক যাযাবরের একটা উক্তি এখানে স্মরণ না করে পারছি না, ‘আমাদের সাংবাদিকরা শুধু ফার্স্ট ক্লাস সাংবাদিক না, তারা একই সাথে ফার্স্ট ক্লাস পলিটিশিয়ানও হতে চায়।’ সাংবাদিকদের অতি-রাজনৈতিকীকরণ কি আমাদের সাংবাদিকতাকে আজকের ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে নিয়ে এসেছে? সব দোষ সরকার বা অন্যের ঘাড়ে না চাপিয়ে আমাদের মালিক-সম্পাদক-সংবাদকর্মীরা কি গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ সুশাসন তৈরিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করবেন?

সবচেয়ে বিস্ময়কর সংখ্যাটি ছিল অন্য জায়গায়। সাংবাদিক ও সম্পাদকদের একাংশ সামরিক সরকারের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নিয়েছিলেন, এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছিলেন ৯৬ শতাংশ উত্তরদাতা। দ্বিমত করেছিলেন মাত্র ৪ শতাংশ। নিজেদের পেশা সম্পর্কে নিজেরাই এত নির্মম স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, এমন নজির খুব বেশি নেই।

৬৩ শতাংশ মনে করতেন, সামরিক শাসনের সময় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় সাংবাদিকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ৫৯ শতাংশের মত ছিল, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল, হতাশাজনক বা গৌরবহীন নয়। অর্থাৎ সাংবাদিক সমাজ একই সঙ্গে নিজের সহযোগিতা ও নিজের প্রতিরোধ, দুটোকেই সত্য বলে মেনে নিয়েছিল।

দ্বৈত সত্যের মুখোমুখি

এ আপাত স্ববিরোধিতাই আমার কাছে গবেষণার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ সামরিক শাসনের নিছক শিকার ছিল না, আবার নিছক দোসরও ছিল না। ছিল দুটোই, একই সঙ্গে। জরিপের বিশ্লেষণ বলছে, সাংবাদিক সমাজের একাংশের সমর্থন ও আনুগত্য সামরিক শাসকদের প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। তাঁদের লেখা ও মন্তব্য সামরিক সরকারগুলোকে রাজনৈতিক বৈধতা পেতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে আরেক অংশ ঝুঁকি নিয়ে, কৌশলে, সীমিত পরিসরে হলেও প্রতিবাদ জারি রেখেছে।

ফলাফল থেকে আরেকটি অস্বস্তিকর ইঙ্গিতও মেলে। সামরিক শাসনের বিরোধিতায় সাংবাদিকদের ভূমিকা যতটা জোরালো বলে পরে দাবি করা হয়েছে, বাস্তবে তা হয়তো ততটা দৃঢ় ছিল না। গণতন্ত্র ফিরে আসার পর প্রতিরোধের ইতিহাস কিছুটা রং চড়িয়ে লেখা হয়েছে।

দেয়ালে সাঁটা হয়েছে দৈনিক পত্রিকা। পথচারী থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষেরা কাজের ফাঁকে খবরে চোখ বোলান। রাজধানীর প্রেসক্লাবসংলগ্ন এলাকায়
ছবি: মীর হোসেন

আজকের পাঠ

তিন দশক আগের এ তথ্যগুলো আজ কেন প্রাসঙ্গিক? কারণ, ক্ষমতা ও গণমাধ্যমের সম্পর্কের মৌলিক ব্যাকরণ বদলায়নি। বাংলাদেশে সামরিক সরকারের সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্কের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমি ‘সহযোগিতা-বিরোধিতা-সহযোগিতা’র এক চক্রাকার মডেল উপস্থাপন করি। ‘সহযোগিতা-বিরোধিতা সহযোগিতা’র মডেল সামরিক শাসনের আলোকে দেওয়া হলেও এই মডেলের কার্যকারিতা বেসামরিক শাসনের মেয়াদেও পরিলক্ষিত হয়।

বাংলাদেশে আমরা দেখেছি, শাসকের চরিত্র বদলায়, নিয়ন্ত্রণের কৌশল বদলায়, কিন্তু সূত্রগুলো একই থাকে। প্রথম সূত্র, সরাসরি দমনের চেয়ে প্রলোভন বেশি কার্যকর। প্লট, পদ, বিজ্ঞাপন, বিদেশ সফর কিংবা ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশাধিকার, এসবই সেন্সরশিপের চেয়ে নীরবে ও গভীরে কাজ করে। দ্বিতীয় সূত্র, গণমাধ্যমের একাংশের সহযোগিতা ছাড়া কোনো অগণতান্ত্রিক শাসনই দীর্ঘস্থায়ী বৈধতা পায় না। তৃতীয় সূত্র, ক্ষতিটা শুধু তাৎক্ষণিক নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও দীর্ঘমেয়াদি। ভয় ও আপসের অভ্যাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছাড়িয়ে যায়।

চতুর্থ একটি সূত্রও আছে, যেটি সম্ভবত সবচেয়ে জরুরি। সম্পাদকেরা সামরিক শাসনের সমালোচনা করেছিলেন, নীতিগতভাবে এর বিরোধিতাও করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের অনেকেই সামরিক শাসনকে দেখেছিলেন ঘটে যাওয়া এবং মেনে নিতে বাধ্য হওয়া এক বাস্তবতা হিসেবে। এই মেনে নেওয়ার মনস্তত্ত্বই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, অগণতান্ত্রিক শাসন প্রথমে শরীরে আসে, তারপর ঢুকে পড়ে মনে। যখন অস্বাভাবিককে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়, তখন প্রতিরোধের প্রশ্নটাই আর ওঠে না। এটার প্রতিফলন আমরা দেখেছি ২০০৭-০৮ এর সামরিক সমর্থনপুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে।

রাজনীতির হাত ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। প্রখ্যাত লেখক যাযাবরের একটা উক্তি এখানে স্মরণ না করে পারছি না, ‘আমাদের সাংবাদিকরা শুধু ফার্স্ট ক্লাস সাংবাদিক না, তারা একই সাথে ফার্স্ট ক্লাস পলিটিশিয়ানও হতে চায়।’ সাংবাদিকদের অতি-রাজনৈতিকীকরণ কি আমাদের সাংবাদিকতাকে আজকের ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে নিয়ে এসেছে? সব দোষ সরকার বা অন্যের ঘাড়ে না চাপিয়ে আমাদের মালিক-সম্পাদক-সংবাদকর্মীরা কি গণমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ সুশাসন তৈরিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করবেন? ইতিহাসের এ আয়নায় নিজেদের মুখ দেখার সৎসাহসটুকু কতজন সম্পাদক-সাংবাদিকের রয়েছে? ভবিষ্যতে কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি যখন গণমাধ্যমকে বশ করতে চাইলে, তখন আমরা কে কোন ভূমিকায় দাঁড়াব?

২০০৯-২০২৪ মেয়াদে সরকার-গণমাধ্যমের আন্তসম্পর্ক দীর্ঘ সহযোগিতার পর্বে থাকলেও বিরোধিতার পর্ব কিন্তু রেললাইন বহে সমান্তরাল’ গানের মতো চলমান ছিল। এটাই সম্ভবত একটা আশার জায়গা, বাংলাদেশের সরকারগুলো যতই স্বৈরতান্ত্রিক হোক, তাকে একটা সময়ে গণমাধ্যমের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে পড়তেই হবে।

  • রিজওয়ান-উল-আলম সহযোগী অধ্যাপক, মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

    মতামত লেখকের নিজস্ব