আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণ
লুলার বিজয় ইউরোপের আন্দোলনে যে কারণে উদ্দীপনা ছড়াল
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলার বিজয় ইউরোপের আন্দোলনে যে কারণে উদ্দীপনা ছড়াল তা নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ
গত দুই মাস ইউরোপের দেশে-দেশে তুমুল বিক্ষোভ চলছে। সেপ্টেম্বরে শুরু হয়ে অক্টোবরের শেষেও সেটা অব্যাহত ছিল। এই বিক্ষোভকে ‘তারুণ্যের হঠাৎ সৃষ্ট বিদ্রোহ’ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক গভীরতা ও ব্যাপ্তি সামান্যই বোঝা যায়। যদিও বাংলাদেশে অনেকে সেভাবে একে ব্যাখ্যা করছেন।
এই বিক্ষোভের মধ্যেই ব্রাজিলে বামপন্থী নেতা লুলা ডি সিলভা নির্বাচনে জিতে ইউরোপের আন্দোলনে যে বাড়তি জ্বালানি জোগালেন, সেটা উভয়ের রাজনৈতিক কর্মসূচিগত কারণেই।
বিশ্বে প্রতিবছর সুখী দেশগুলোর যে তালিকা হয়, তার ওপরের দিকে সংখ্যাগরিষ্ঠই থাকে ইউরোপের দেশ। সে রকম অনেক দেশে দুই মাস ধরে লাগাতার রাজনৈতিক বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যদিও সংখ্যায় বেশি দেখা যাচ্ছে তরুণদের—তবে অন্য বয়সীরাও আছেন তাতে। প্রশ্ন উঠেছে, সামাজিক এই অসন্তোষের রাষ্ট্রীয় কারণ কী এবং কেন ব্রাজিলের নির্বাচনের ফল এখানে প্রভাব ছড়াবে।
রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতির বিরোধিতা
ফ্রান্স ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি। সেখানে বিক্ষোভের উত্তাপ বেশি হলেও দ্রুত সেটা বেলজিয়াম, ইতালি, জার্মানিতে ছড়িয়েছে। গ্রিস, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, আলবেনিয়াসহ অনেক জায়গাতেও মিছিল-সমাবেশ হচ্ছে। বিক্ষোভে ব্যাপক জ্বালাও-পোড়াও এবং ভাঙচুর হয়েছে কয়েকটি দেশে, যা পুরোনো ধাঁচের ‘সামাজিক চুক্তি’র প্রতি মানুষের অশ্রদ্ধা প্রকাশ করছে। এই অশ্রদ্ধার ভিত্তি সম্পদের অসম বণ্টন।
ফলে একে স্রেফ সাধারণ ভাঙচুর বা লুটকেন্দ্রিক বিদ্রোহ হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক তাৎপর্যটুকু অজানা থেকে যায়। অন্তত ইউরোপের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লুট ও আগুন লাগানোর ঘটনাগুলোকে সেভাবেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
শুরুতে শিক্ষাকেন্দ্রিক দাবিদাওয়া বিক্ষোভের কারণ হিসেবে দেখা গেলেও ক্রমে বহু ধরনের ব্যানার এসে মিশছে তাতে। ইউরোপজুড়ে নানা বিষয়ে আন্দোলনের সলতে জ্বলছিল অনেক দিন ধরে—এখন তাতে বাড়তি জোর পড়েছে। বিক্ষোভকারীদের মূলকথা, আমরা এমন সব সংকটের মুখে, যা গত প্রজন্মগুলো দেখেনি। সেই ‘মূলকথা’গুলো রাজনৈতিক-অর্থনীতি নিয়ে। ফলে এখানে ‘তারুণ্যে’র চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘বিষয়’।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। মূলত শিক্ষকস্বল্পতা ও স্কুলের নানা অসুবিধা নিয়ে অসন্তোষের শুরু। বাংলাদেশে গত এপ্রিলে আমরা এক খবরে দেখেছিলাম, প্রাথমিক পর্যায়ের ৬৫ হাজার প্রধান শিক্ষকের মধ্যে ৩৪ হাজার পদই খালি। এ নিয়ে এখানে কেউ বিক্ষোভ করেনি। কিন্তু প্যারিসের ১৭ সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভের পরদিনই সেটা পাশের শহরে ছড়ায়।
দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রায় এক হাজার স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে এই বিক্ষোভ। শিক্ষক ইউনিয়নগুলো এবং শ্রমজীবীরা তাতে শরিক হয়। ক্রমে অন্যান্য পেশার অসন্তুষ্ট মানুষও আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছেন ফ্রান্সে। অর্থাৎ সমাজ এই ধরনের আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হয়ে ছিল।
ফ্রান্সের শ্রমজীবীদের জোট ‘ইয়েলো ভেস্ট’ গ্রুপ এই আন্দোলনে যুক্ত হলো সম্প্রতি। তাতে স্পষ্ট, অর্থনৈতিক চাপই মানুষকে রাজপথে নিয়ে আসছে এবং এদের মধ্যে শ্রমজীবী শ্রেণির লোক বেশি। অর্থনৈতিক দাবিদাওয়ার পাশাপাশি এবার ইয়েলো ভেস্টের একটা বড় চাওয়া নাগরিক স্বাধীনতার পরিসর বাড়ানো। এই দাবি মূলত দক্ষিণপন্থীদের বিরোধিতা হিসেবে।
কোনো দাহ্য বস্তু পেলে আগুন যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে, আন্দোলন অনেকটা সেভাবেই ছড়াচ্ছে। ব্রাজিলে প্রায় একই রকম দাবিদাওয়া নিয়ে রাজনীতি করা লুলা ট্রাম্পের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জিতে যাওয়ায় ইউরোপের আন্দোলনকারীরা নতুন করে চাঙা বোধে করছে এখন। অন্তত সেখানকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সে রকমই বলছে। ফলে আগামী সপ্তাহে চলমান আন্দোলন আরও স্পষ্ট রাজনৈতিক চেহারা নেবে ও জোরদার হবে বলে মনে হচ্ছে।
দেশে দেশে সংহতি—যদিও দাবি বিচিত্র
যেহেতু অনেক দেশের অনেক শহরে বিক্ষোভ চলছে—এ কারণে অসন্তোষের কারণ এবং দাবিদাওয়াও বহু ধরনের। তবে যোগসূত্রও গোপন নেই। মূলত রাষ্ট্র ও সরকারের অর্থনৈতিক নানা নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হচ্ছে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কোথাও গৃহায়ণ নীতি, কোথাও নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছে মানুষ। ইউরোপীয় দেশগুলোর প্যালেস্টাইন নীতির বিরুদ্ধেও অনেক ব্যানার নেমেছিল। অনেক স্থানেই মিছিল থেকে ফ্যাসিবাদ এবং উগ্র-দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে স্লোগান উঠছে।
ইতালিতে ১৬ অক্টোবর ছিল বিক্ষোভকারীদের ‘নো মেলোনি ডে’। সেখান থেকে সমর খাতে মেলোনি সরকারের ব্যয় বরাদ্দের বিরোধিতা করা হয়। মেলোনি স্কুলে অ-ইতালীয়দের সংখ্যা কমানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতেও আপত্তি উঠেছে। রোমে আন্দোলনের ওপর দমন–পীড়ন হয়েছে অত্যধিক।
বার্লিনে দেখা গেছে, বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষার বিরোধিতা করছে শিক্ষার্থীরা। স্পেন ও পর্তুগালে বিক্ষোভে বড় হয়ে উঠেছে বাসস্থান–সংকটের দিক। সেখানে বাড়িভাড়ার সমস্যা নিয়ে আগে থেকে রাজনৈতিক কথাবার্তা চলছিল। ইউরোপে সম্প্রতি বসতবাড়ির খরচ অনেক বেড়ে গেছে। স্পেনে সেপ্টেম্বর থেকে এ নিয়ে আন্দোলন চলছিল। এবারের বিক্ষোভের তোড়ে প্রধানমন্ত্রী ২৯ নভেম্বর নতুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেন।
আলবেনিয়াতে শিক্ষা শেষে কাজের স্বল্পতা ছিল বড় বিষয়। সেখানে আন্দোলনের আরেকটি প্রধান প্রসঙ্গ হলো উন্নয়নের নামে একটা দ্বীপ ধ্বংসের বিরোধিতা। ট্রাম্প পরিবারকে সরকার সেখানে বিলাসবহুল রিসোর্ট বানাতে দিতে চেয়ে জনক্ষোভের মুখে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইদি রামার বিরুদ্ধে আগে থেকে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ছিল।
আন্দোলন এখন রামার পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিচ্ছে। বেলজিয়ামে বিক্ষোভ হয়েছে মুখ্যত ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের সমর্থনে। তবে সরকারের কৃচ্ছ্রতার নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণে এই সংহতি। ফ্রান্সের মতোই জার্মানিতে ৩১ অক্টোবর বড় বিক্ষোভ হবে বলে ধারণা করা হয়েছে।
নতুন সামাজিক চুক্তির কথা উঠছে
ইউরোপজুড়ে বিগত বছরগুলোতে অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণী জায়গায় একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদল ঘটছিল। রাজস্ব বরাদ্দের অগ্রাধিকার সরে যাচ্ছিল সামরিক খাতে। সামাজিক সুরক্ষার জায়গাগুলোতে খরচ কমছে, যা তাদের কল্যাণধর্মী রাষ্ট্রের চরিত্র নষ্ট করছে।
প্রায় সব দেশে সম্পদের পুঞ্জীভবন ঘটছে গুটিকয় ব্যক্তি বা করপোরেশনের হাতে। একই সময় ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে অর্থনীতিতে যে চাপ পড়েছে, সেটাও জনগণের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে। আবার দক্ষিণপন্থার উত্থান ইউরোপীয় সমাজের গণতান্ত্রিক অধিকারের নানা দিক সংকুচিত করছে। এসব নিয়ে ক্রোধের মিলিত তরঙ্গ বইছে মূলত এ মুহূর্তে, যা ক্রমাগত রাজনৈতিক মেরুকরণ স্পষ্ট করছে।
ইউরোপকে নিয়ন্ত্রণ করছে এ মুহূর্তে তিন শক্তি—সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদক, বড় বড় আর্থিক সংস্থা এবং বৃহৎ বাণিজ্যিক সংস্থা। এরা বিভিন্ন দেশে তাদের মনোরঞ্জনের জন্য বিভিন্নপন্থী সরকার বসিয়ে রেখেছে। বিক্ষুব্ধ তরুণেরা সব ধরনের সরকারের বিরুদ্ধেই বলছে। ফ্রান্সে যখন মধ্যপন্থীদের বিরুদ্ধে জ্বালাও–পোড়াও চলছে, ইতালিতে সেটা হচ্ছে ডানপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে। সব জায়গায় বিক্ষুব্ধদের আসল প্রতিপক্ষ পর্দার আড়ালে থাকা ওপরে উল্লিখিত তিন শক্তি। সরকার যে রকমই হোক—সর্বত্র সমাজে কাজ করছে অর্থনৈতিক অস্বস্তি ও ভীতি। মধ্য ও নিম্নবিত্ত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ-সুবিধা কেবল কমতে দেখছে। সে কারণে নতুন করে সামাজিক চুক্তি চাইছে তারা।
এ রকম বিক্ষোভ ইউরোপে অভিনব নয়। এ শতাব্দীর শুরুর দশকে অর্থনৈতিক মন্দার সময় ব্যয় সংকোচন নীতির বিরুদ্ধেও মানুষ এভাবে রাস্তায় নেমেছিল সেখানে। এবারও বিক্ষোভ দীর্ঘায়িত হবে বলে লক্ষণ বলছে। বিক্ষোভের চতুর্থ সপ্তাহে ফ্রান্সে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কোন কোন শক্তি বিক্ষোভকে অ-শ্বেতাঙ্গমুখী করতেও তৎপর। দক্ষিণপন্থী প্রধান বিরোধী দল ন্যাশনাল র্যালি পার্টিও বিক্ষোভকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাতে রাস্তায় নেমেছে। বামপন্থীরা তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা সমাবেশ ডেকেছে।
যারা মুখ্য সংগঠক
ইউরোপের আন্দোলনকারীরা ব্রাজিলের লুলার বিজয়ে কেন খুশি, সেটা বোঝা যায় প্রথমোক্ত সাংগঠনিক পরিচয়ে। ফ্রান্সে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন ইউএনইএফ। তাদের সঙ্গে আছে সিজিটি ও ইয়েলো ভেস্টস। তিনটি সংগঠনই বামপন্থী ধাঁচের। এদের রাজনীতি এবং লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনীতি একই ধাঁচের। এ রকম সংগঠনগুলোর বৃহত্তর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও একই।
ইতালিতে আন্দোলনের প্রধান সংগঠক যে সিজিআইএল—তারা ইতালির বৃহত্তম বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন। রাজনীতিতে এসব সংগঠন আন্তর্জাতিক মিত্র। জার্মানিতে শিক্ষার্থীদের যে সংগঠনের নেতৃত্ব ‘জেন–জি রেগেন্ট’ আন্দোলন চলছে, তাদের কোনো দলীয় পরিচয় না থাকলেও শিক্ষা এবং অন্যান্য খাতে সরকারের বাজেট ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে তারা। সমগ্র ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকায় বামপন্থীরাই মূলত এ রকম ইস্যুতে কথা বলছে।
ইউরোপের এসব বিক্ষোভের পাশাপাশি ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া ককরোচদের আন্দোলনও চলছে এখন। বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ভারতের এই বিক্ষোভ বিশ্বের নজর কাড়ছে। স্বভাবত আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভাষ্যকারেরা এখন গণ–অসন্তোষের বৈশ্বিক এই নতুন তরঙ্গের পরিণতি নিয়ে ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ করতে শুরু করেছে।
আন্দোলনের পরিণতি কী দাঁড়াবে
ফ্রান্স সরকার তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষা সংস্কারে নেমেছে। অন্যান্য দেশেও বিক্ষোভের একটা স্বাভাবিক ফল হচ্ছে শিক্ষা খাতে এবং মজুরি নীতি সংশোধনে বাড়তি নজর দিচ্ছে সরকারগুলো। হাউজিংয়েও বাড়তি রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে সামনে। এসব করতে গেলে প্রয়োজনীয় অর্থের খোঁজে কর বাড়াতে হবে বা সমর বাজেট কাটছাঁট করতে হবে। সরকারগুলো কোন দিকে যাবে, সেটাই বড় প্রশ্ন!
ঠিক এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চলতি আন্দোলনের তাৎক্ষণিক একটা ফল হয়েছে ইউরোপজুড়ে কট্টর ডানদের বিপরীতে বামপন্থীদের মেরুকরণ। ফ্রান্সে একদিকে যখন লি পেনের র্যালি পার্টির উত্থান ঘটছে, ঠিক একই সময় চলতি বিক্ষোভে যুক্ত তিনটি সংগঠনই বামপন্থী। ইতালিতে ক্ষমতায় ডানপন্থী মেলোনি। আর আন্দোলন করছে সিজিআইএল।
এ রকম সংঘাত নিশ্চিতভাবে ইউরোপীয় রাজনীতির একটা মোড়বদল। ঠিক এই সময় ৮০ বছর বয়সী লুলা যেভাবে দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে কট্টর ডানপন্থী বলসোনারোকে হারাতে পারলেন, সেটা ইউরোপীয় ডানদের জন্য এবং তাদের এখনকার মদদদাতা ট্রাম্পের জন্য বড় এক মনস্তাত্ত্বিক আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সার্বিয়ায় নির্বাচনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের জোট ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্টকে হারিয়ে দিয়েছে। এই নির্বাচনে ইউরোপীয় আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল।
ব্রাজিল যে কারণে অনুপ্রেরণা ছড়াল
লুলার বিজয়ের বড় তাৎপর্য হলো তাঁকে অনেকটা ওয়াশিংটনের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জিততে হয়েছে। আবার, তিনি যেভাবে জনকল্যাণধর্মী অর্থনৈতিক মডেল সামনে রেখে এই রাজনৈতিক যুদ্ধটা করলেন এবং তথাকথিত কৃচ্ছ্র সাধনের নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন, সেই রাজনীতির আবেদন এখন আশপাশের অঞ্চলের পাশাপাশি ইউরোপেও বাড়তে পারে। এ রকম অনুমান কতটা সঠিক, সেটা যাচাই করতে বেশি সময় লাগবে না। ফ্রান্সের আগামী বছরের নির্বাচন এ ক্ষেত্রে তুমুল এক পরীক্ষাগার হবে।
দূরবর্তী দেশ হলেও ব্রাজিলে বলসোনারোর পরাজয় দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে এবং জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক নীতির জন্য সক্রিয় ইউরোপীয় সংগঠনগুলোর জন্য যে উৎসাহের ব্যাপার হয়েছে, সেটা অনেক কারণে।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ব্রাজিলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আবার, লুলা নিজে একজন শ্রমিক ছিলেন। লুলা বলছেন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোতে তিনি অন্তত ১৫ শতাংশ খরচ বাড়াবেন। এসব দাবি নিয়ে লড়ছে ইউরোপের চলতি আন্দোলনের অনেক সংগঠন।
জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, সামাজিক সুরক্ষা ও মজুরি বাড়ানোর দাবিতে সোচ্চার চলতি আন্দোলনে শামিল ইউরোপের শ্রমিক সংগঠনগুলোর জন্য লুলার বিজয় স্বভাবত অনুপ্রেরণাদায়ী ঘটনা হয়েছে। আবার, ইউরোপের ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী থেকে পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠকদের অনেকে মনে করছেন (সুইডেন, ফ্রান্স, ইতালির) লুলার দেখানো পথে দক্ষিণপন্থার সুনামি থামানো সম্ভব।
অনেক ভাষ্যকার অবশ্য এ-ও জানাচ্ছেন, ইউরোপের চলতি বিক্ষোভের পরিণতি পুরোটা এখনই দেখা যাবে না। এতে হাউজিং অধিকার, শিক্ষায় বিনিয়োগসহ অনেক সামাজিক দাবি সবে জনপ্রিয় হয়েছে। দশকের পর দশক এসব ছিল বামপন্থী ছাত্রসংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনের দাবি—সবে কেবল এসব বিষয় মোটাদাগে জাতীয় রাজনীতি পরিমণ্ডলে এল। এতে এত দিনকার পুরোনো রাজনীতির চরিত্রে পরিবর্তন আসবে বটে—কিন্তু সেটা সময় নেবে।
আলতাফ পারভেজ গবেষক ও লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব
