১০ বছর আগে ইউরোপের রাজনীতি, ব্যবসা আর জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু মানুষ মিলে ‘নতুন ইউরোপীয় পুনর্জাগরণ’-এর কথা বলেছিলেন। ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন কীভাবে এগোবে, তার একটা পরিকল্পনাও তাঁরা করেছিলেন।
এখন আবার ইউরোপ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আর এ প্রশ্ন নেই যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বড় শক্তি হবে কি না। এটা এখন প্রায় ঠিক হয়ে গেছে যে তাদের শক্তিশালী হতেই হবে। কিন্তু আসল প্রশ্ন অন্য জায়গায়। আসল প্রশ্ন হলো, তারা কি নিজের নিয়ম মেনে, গণতান্ত্রিকভাবে, আর সময় থাকতে সেই শক্তিতে পরিণত হতে পারবে?
অবশ্য এই পরিবর্তন আরও সহজ হতো, যদি ইউরোপের ভেতরেই হাঙ্গেরির সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবানের মতো নেতারা বাধা হিসেবে না থাকতেন। কিন্তু অরবানের মতো বাধাদানকারী শক্তি যদি না–ও থাকে, তাহলেও ইউরোপের রূপান্তর শুধু তখনই সম্ভব হবে, যখন সেখানকার সাধারণ মানুষ সক্রিয়ভাবে এতে অংশ নেবে।
এ কারণেই আমরা ‘ইউরোপা পাওয়ার ইনিশিয়েটিভ’-এর সহসভাপতি হয়েছি এবং জাতীয় ও ইউরোপীয় স্তরে আরও বহু আন্তর্জাতিক নাগরিক উদ্যোগ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছি।
ইউরোপের সামনে এখন অস্তিত্বের প্রশ্ন। প্রায় ৫০ কোটি মানুষ এমন এক বিশ্বরাজনীতির মধ্যে বাস করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা ক্রমেই প্রভাব বিস্তার করছে।
এ দুই দেশই প্রযুক্তি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও ভাবাদর্শ—সবদিক থেকেই বিশাল শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে।
এ পরিস্থিতিতে ইউরোপের ঝুঁকি হলো, তারা ধীরে ধীরে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। তাদের বাজার, দক্ষ জনশক্তি ও তথ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
তবে এ পরিণতি অবধারিত নয়। কিন্তু তা বদলাতে গেলে শুধু নীতিগত কিছু পরিবর্তন বা প্রশাসনিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। এর জন্য দরকার একটি প্রকৃত নাগরিক বিপ্লব।
নাগরিক বিপ্লব ইউরোপকে অন্য একটি পথ দেখাতে পারে। সেই পথে ইউরোপ একটি গণতান্ত্রিক বিশ্বশক্তি হিসেবে উঠে আসবে, যা অন্যদের অনুকরণ করবে না, বরং নিজস্ব মডেল তৈরি করবে। এমন এক ইউরোপ, যেখানে খোলা অর্থনীতি ও সামাজিক সংহতি, প্রযুক্তিগত উন্নতি ও নৈতিক সুরক্ষা, বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক ঐক্য—সব একসঙ্গে থাকবে। তখন তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝখানে চাপে পড়ে থাকবে না।
এই ‘নাগরিক বিপ্লব’ বলতে হঠাৎ ভাঙন বা অস্থিরতা বোঝানো হচ্ছে না। বরং এর অর্থ হলো—নিজেদের মধ্যেই এক নতুন জাগরণ, যেখানে ইউরোপীয় স্তরে গণতান্ত্রিক শক্তিকে আবার জাগিয়ে তুলে নাগরিক, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি যৌথ রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে আনা হবে। তা না হলে ইউরোপ শুধু বাইরের চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতেই ব্যস্ত থাকবে, নিজে কিছু গড়তে পারবে না।
এই বিপদের লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। বিদেশি শক্তিগুলো ক্রমেই অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে ইউরোপের ভেতরের পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করছে। নিজেদের নিয়ম অন্য দেশের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে।
এ অবস্থায় ইউরোপের ভেতরের বিভাজন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা যখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়, তখন প্রভাববলয় তৈরি হয় এবং স্বাধীনতা ক্ষয়ে যায়। ইউরোপের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি শুধু রাজনৈতিক নয়, তাদের মূল মূল্যবোধ—বহুত্ববাদ, মৌলিক অধিকার এবং আইনের শাসন—এসবও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তবে ইতিবাচক দিকও আছে। ইউরোপের মানুষ এখন ক্রমেই বুঝতে পারছে পরিস্থিতির গুরুত্ব। গত দশকে জনমত বারবার যে কথা বলেছে, তা হলো—ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এমন হতে হবে, যা নিজেকে রক্ষা করতে পারে, শান্তি বজায় রাখতে পারে এবং বিশ্বমঞ্চে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। মানুষ সুরক্ষা চায়, বিচ্ছিন্নতা চায় না; তারা উন্নতি চায়, অন্যের ওপর নির্ভরতা চায় না; তারা নেতৃত্ব চায়, কিন্তু সে নেতৃত্ব হতে হবে টেকসই ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে।
সংকটের সময় এই নাগরিক অংশগ্রহণ আগেও দেখা গেছে। ব্রেক্সিটের পর ইউরোপের ঐক্য বজায় রাখা, মহামারির সময় একসঙ্গে কাজ করা, কিংবা ইউক্রেনকে সমর্থন করা—প্রতিবারই ইউরোপ এমনভাবে একজোট হয়েছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল।
এই অভিজ্ঞতাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, ধীরে ধীরে একটি ইউরোপীয় রাজনৈতিক চেতনা তৈরি হচ্ছে, যা কিনা জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখন প্রয়োজন এই চেতনাকে বাস্তব পদক্ষেপে পরিণত করা। নাগরিক বিপ্লবের অর্থ হবে ইউরোপীয় নীতিনির্ধারণকে আরও গণতান্ত্রিক করা।
এ পরিবর্তন শুধু প্রয়োজনীয় নয়, অনিবার্যও। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, নিরাপত্তার সংকট এবং অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা—এসবই জাতীয় সীমানা মানে না। নতুন প্রজন্ম ইতিমধ্যেই সীমান্ত পেরিয়ে কাজ করছে, ভাবছে, জীবন কাটাচ্ছে। কিন্তু ইউরোপীয় রাজনীতি এখনো পুরোপুরি সেই বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করতে পারেনি।
এ অবস্থায় আগের মতোই চলতে থাকা আর নিরপেক্ষ থাকা নয়, বরং পতনের দিকেই এগোনো। যদি গভীর সংহতি ও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন না হয়, তাহলে ইউরোপ অন্য শক্তির প্রভাববলয়ে ঢুকে পড়বে।
নাগরিক বিপ্লব ইউরোপকে অন্য একটি পথ দেখাতে পারে। সেই পথে ইউরোপ একটি গণতান্ত্রিক বিশ্বশক্তি হিসেবে উঠে আসবে, যা অন্যদের অনুকরণ করবে না, বরং নিজস্ব মডেল তৈরি করবে। এমন এক ইউরোপ, যেখানে খোলা অর্থনীতি ও সামাজিক সংহতি, প্রযুক্তিগত উন্নতি ও নৈতিক সুরক্ষা, বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক ঐক্য—সব একসঙ্গে থাকবে। তখন তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মাঝখানে চাপে পড়ে থাকবে না, বরং তাদের সমকক্ষ শক্তি হিসেবে দাঁড়াবে, যেখানে সম্ভব সহযোগিতা করবে, প্রয়োজন হলে প্রতিরোধ করবে এবং বিশ্বনীতিকে নিজের মূল্যবোধ অনুযায়ী প্রভাবিত করবে।
এ পরিবর্তনে যাঁরা অংশ নিতে চান, তাঁদের আমরা আমন্ত্রণ জানাচ্ছি ২১ থেকে ২৩ অক্টোবর স্ট্রাসবুর্গে অনুষ্ঠেয় ‘ইউরোপা পাওয়ার কনফারেন্স’-এ। সেখানে রাজনীতি, ব্যবসা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একত্র হবেন।
মার্গ্রেথে ভেস্টাগার ইউরোপীয় কমিশনের সাবেক সহসভাপতি, গিয়োম ক্লোসা ইউরোপীয় কমিশনের সাবেক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা ও স্লাভয় জিজেক ইউরোপীয় গ্র্যাজুয়েট স্কুলের দর্শনের অধ্যাপক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনূদিত