যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে ডেনিশ স্বশাসিত গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তাবিষয়ক নতুন যে সমঝোতা হয়েছে, তা বেশ ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে গ্রিনল্যান্ডবাসীদের গত প্রায় দুই বছরের ধারাবাহিক ভয়ভীতি প্রদর্শনের শেষ হয়তো অবশেষে ঘটতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে ভূখণ্ডের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের যে সীমারেখা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল, তা–ও হয়তো বজায় থাকবে।
সমঝোতা স্মারকে ঠিক কী রয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে সামগ্রিক যে চিত্রটি উঠে আসছে, তা ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের জন্য প্রায় একটি কাঙ্ক্ষিত বা সেরা দৃশ্যপট। বিরোধের ক্ষেত্রটি অবশেষে আবার কূটনীতির টেবিলে ফিরে এসেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন, বিনিয়োগ এবং নিরাপত্তা নীতির বিষয়গুলো সুরাহা করা সম্ভব।
একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের কাছে নিজেকে বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরতে পারছেন, যা উত্তেজনা কমানোর জন্য জরুরি ছিল। তাঁর রাজনৈতিক মিত্র এবং সমর্থক সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যেই তাঁর আলাপ-আলোচনার কৌশলের প্রশংসা শুরু করেছে। তাদের যুক্তি, ট্রাম্পের টানা চাপ প্রয়োগের কৌশল কাজ করেছে এবং গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে তারা আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। উল্লেখ্য, এ অঞ্চলটি মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এর পেছনে একটি সূক্ষ্ম হিসাব রয়েছে: ১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনেই এর বহু কিছু বাস্তবায়নের সুযোগ ছিল। ২০০৪ সালে গ্রিনল্যান্ডের হোম রুল সরকারকেও অন্তর্ভুক্ত করে চুক্তিটি হালনাগাদ করা হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যাপক সামরিক অধিকার দেয়, যার পূর্ণ সুযোগ ওয়াশিংটন স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে নিয়েছিল। তখন গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক ঘাঁটি এবং ১০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন ছিল। বর্তমানে অবশ্য সেখানে কেবল পিটুফিক স্পেস বেস অবশিষ্ট রয়েছে, যেখানে মাত্র ১৫০ জনের মতো মার্কিন সামরিক সদস্য রয়েছেন।
১৯ সেপ্টেম্বর ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের দেওয়া বার্তা যদি সত্যি ধরে নেওয়া হয়, তবে নতুন চুক্তির মাধ্যমে অন্তত দুটি বড় পরিবর্তন এসে থাকতে পারে।
কাগজ-কলমে গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে বটে। তবে বাস্তবে এই পরিবর্তনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত। আর এটিই উচ্চপর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপে থাকা ডেনিশ ও গ্রিনল্যান্ডিক প্রতিনিধিদের চমৎকার কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দেয়। তাঁরা ট্রাম্পকে তাঁর প্রয়োজনীয় ‘বিজয় দাবি করার সুযোগ’ করে দিয়েছেন, আবার নিজেদের সার্বভৌমত্বও ধরে রেখেছেন। বলা যায়, এটি মূলত একটি চাক্ষুষ বা বাহ্যিক জয়।
প্রথমত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেছেন যে চুক্তিটি একটি ‘ইনফিনিট লাইফ’ বা অসীম মেয়াদি চুক্তি, যার কোনো শেষ নেই! এর বিপরীতে মূল চুক্তিতে বলা হয়েছিল, এটি ‘উত্তর আটলান্টিক চুক্তির স্থায়িত্বকাল পর্যন্ত বহাল থাকবে।’ অন্য কথায়, পুরোনো চুক্তিটি ন্যাটোর টিকে থাকার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
নতুন চুক্তিটি হয়তো ন্যাটোর ওপর নির্ভরশীল নয়, যা ট্রাম্পের ন্যাটোর প্রতিশ্রুতিতে অনীহা এবং তাঁর দীর্ঘদিনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিরই বহিঃপ্রকাশ।
দ্বিতীয়ত, মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেছেন: ‘আমাদের লিখিত অনুমোদন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ কখনো গ্রিনল্যান্ডে ঘাঁটি তৈরি করতে, সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে বা স্পর্শকাতর বিনিয়োগ করতে পারবে না।’ সহজ ভাষায়, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একধরনের আনুষ্ঠানিক ভেটো ক্ষমতা পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে, যার ফলে রাশিয়া বা চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডে প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। তবে সাম্প্রতিক বছরের কিছু উদাহরণ তুলে ধরে যে বাস্তব ক্ষেত্রে বিষয়টি আগেও এমনই ছিল।
গ্রিনল্যান্ডে চীনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুটি ঘটনায় ডেনিশ সরকার অন্তত দুবার হস্তক্ষেপ করেছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ জড়িত ছিল: প্রথমটি ২০১৬ সালে, যখন একটি চীনা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের কাঙ্গিলিনগুইতের একটি অব্যবহৃত নৌঘাঁটি কিনতে আগ্রহ দেখায়; এবং দুই বছর পর, যখন একটি চীনা নির্মাণপ্রতিষ্ঠান গ্রিনল্যান্ডের বড় বিমানবন্দর প্রকল্পে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করে। দুবারই তাদের আটকে দেওয়া হয়।
নতুন চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে ডেনিশ সরকারের এই ধরনের হস্তক্ষেপের আর প্রয়োজন হবে না।
এই ব্যাখ্যা যদি সঠিক হয়, তবে কাগজ-কলমে গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে বটে। তবে বাস্তবে এই পরিবর্তনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত। আর এটিই উচ্চপর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপে থাকা ডেনিশ ও গ্রিনল্যান্ডিক প্রতিনিধিদের চমৎকার কূটনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দেয়। তাঁরা ট্রাম্পকে তাঁর প্রয়োজনীয় ‘বিজয় দাবি করার সুযোগ’ করে দিয়েছেন, আবার নিজেদের সার্বভৌমত্বও ধরে রেখেছেন। বলা যায়, এটি মূলত একটি চাক্ষুষ বা বাহ্যিক জয়।
তবে ট্রাম্পের বার্তার একটি বাক্য আমাদের কিছুটা ভাবিয়ে তোলে: ‘এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো খরচ হবে না,’ লিখেছেন তিনি। এটি বেশ অবাক করার মতো এক অঙ্কের হিসাব, যা সত্যি হলে ডেনিশ করদাতাদের খুব একটা স্বস্তি দেওয়ার কথা নয়।
তারপরও আমাদের মনে রাখা উচিত, মেক্সিকো কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সীমান্তদেয়ালের খরচ দেয়নি। একইভাবে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখলে মার্কিন নাগরিকেরা আদৌ সেই প্রতিশ্রুতি দেওয়া ৫ হাজার ডলার পাবেন কি না, তা-ও দেখার বিষয়। পাশাপাশি এটিও মাথায় রাখা দরকার যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়লে গ্রিনল্যান্ড তা থেকে আরও বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করতে পারে।
সমঝোতা চুক্তিতে প্রকৃতপক্ষে কী রয়েছে তা সম্পূর্ণ না জানা পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। তত দিন পর্যন্ত নুক এবং কোপেনহেগেন—উভয় শহরের জন্যই অন্তত কিছুটা সতর্ক আশাবাদ এবং স্বস্তির কারণ থাকছে।
মার্ক জ্যাকবসন রয়্যাল ডেনিশ ডিফেন্স কলেজের সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণাপ্রধান। আল–জাজিরা থেকে অনূদিত।