ইরানের তেলের বড় রপ্তানির কেন্দ্র খারগ দ্বীপ নিয়ে যখন কথা আসে, তখন মূল প্রশ্ন এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র সেটি দখল করতে পারবে কি না। যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বীপ দখল করার ক্ষমতা আছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এরপর কী হবে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের সঙ্গে ‘শর্তসাপেক্ষ’ যুক্তি ব্যবহার করে এসেছে, আর এখন সেই একই যুক্তি উল্টোভাবে মিত্রদের আচরণকে প্রভাবিত করছে। মিত্রদের অবস্থান আগের মতো নিশ্চিতভাবে ধরে রাখা যাচ্ছে না। তাই এখন আর শুধু এ প্রশ্নে আটকে থাকা যাচ্ছে না যে যুক্তরাষ্ট্র কী করতে পারে; বরং প্রশ্ন হলো মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাকার বিনিময়ে কতটা দায় ও মূল্য দিতে রাজি আছে।
একসময় মার্কিন প্রাধান্য যে সহজ সমীকরণে দাঁড়িয়ে ছিল, তা হলো, ‘আমি বেশি দিই, মূল সিদ্ধান্তও আমি নিই, মিত্ররা মেনে নাও’। এখন সেই সমীকরণ ভেঙে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের সামনে এই সংকট এসে দাঁড়িয়েছে।
খারগ দ্বীপ এমন এক লক্ষ্যবস্তু, যাকে মার্কিন সামরিক শক্তি সহজেই কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার বানাতে পারে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। এই দ্বীপ দখল করা মানে দীর্ঘমেয়াদি দায় নেওয়া, যা মিত্রদেরও নিতে হবে। আর দ্বীপ ধ্বংস করলে তাৎক্ষণিক উত্তেজনা তৈরি হবে এবং তার অর্থনৈতিক অভিঘাত সবচেয়ে বেশি পড়বে তাদের ওপর, যারা কিনা জ্বালানি রপ্তানিতে বেশি নির্ভরশীল। ফলে দুটি পথই মিত্রদের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল, অথচ মিত্ররা তাতে সহযোগিতা করবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সরবরাহের পথে বড় ধরনের বিঘ্ন হলে বিশ্বজ্বালানির বাজারে সরাসরি প্রভাব পড়ে। এতে তেলের সরবরাহ কমে, দাম বাড়ে, জাহাজ চলাচল ও বিমার
ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর মূল কারণ হরমুজ প্রণালির সংকটজনক অবস্থা। বিশ্বের বিপুল তেল সরু পথ দিয়ে যাওয়ায় সামান্য সমস্যাও বড় সংকটের আশঙ্কা তৈরি করে।
খারগ দ্বীপ ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেলের রপ্তানির কেন্দ্র। এখান থেকে প্রতিদিন এক মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি হয়। এক জায়গায় এত বড় সরবরাহ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়, দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দেয়।
যদি দ্বীপে কোনো সমস্যা হয়, তার প্রভাব শুধু ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়বে তাদের ওপর, যারা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অনেক দেশ ইতিমধ্যে মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাপে আছে, তাই নতুন ধাক্কা সামলানো তাদের জন্য কঠিন।
সম্ভাব্য লাভ ও ক্ষতি—দুটিকেই এক জায়গায় কেন্দ্র করে খারগ দ্বীপ এ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করছে। দ্বীপ দখল করলে ইরানের ওপর চাপ পড়বে ঠিকই; কিন্তু সেই চাপ টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব জোটের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে। কৌশলগত সুবিধা এনে দেওয়ার পাশাপাশি এই পদক্ষেপ একই সঙ্গে ঝুঁকি তৈরি করবে। আর তা ভাগ করে নিতে হবে অংশীদারদের।
সাম্প্রতিক ট্যাংকারের তথ্য দেখাচ্ছে, প্রতিটি দেশ চাপের সঙ্গে আলাদাভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। ইউরোপ থেকে এশিয়া—সবার ওপর সমান চাপ পড়ে না। বাড়তি খরচ ঘরোয়া অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। শিল্প ও ভোক্তার ব্যয় বাড়ায়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও প্রভাবিত হয়।
একসময় এই খরচগুলো মার্কিন জোটের ভেতরে ভাগ হয়ে যেত। সমান না হলেও ‘সম্মিলিত কৌশল’ হিসেবে এসব খরচ মেনে নেওয়া হতো।
এখন আর সেই দিন নেই। এখন কে সেই খরচ বহন করবে—এ প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে তার জোটকে দর-কষাকষির বিষয় হিসেবে দেখেছে। ন্যাটোতে দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ, পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন, এমনকি মিত্রদের প্রকাশ্যভাবে ছোট করার ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে জোটের ভেতরে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও আর নিঃশর্ত নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ প্রতিশ্রুতিতে রূপ নিয়েছে।
ফলে মিত্ররা এখন ‘সব ডিম এক ঝুড়িতে’ রাখতে চায় না। সংকটের সময়ে তারা স্বতঃসিদ্ধভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়াতে রাজি নয়। তারা নিজেদের হিসাব বুঝেশুনে তারপর সহযোগিতা করতে রাজি আছে। ধীরে ধীরে তাদের ভাবনার কাঠামো বদলেছে। কিসের ওপর নির্ভর করা যায়, সে ধারণাই বদলে যাচ্ছে।
আগে স্থায়ী প্রতিশ্রুতির ওপর জোট দাঁড়াত। এখন পরিস্থিতিভিত্তিক সমীকরণ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে সীমিত স্বায়ত্তশাসন কার্যকর হতে পারে, কিন্তু তা যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন সমন্বয় ভেঙে যায়। একেক সংকটে একেক প্রতিক্রিয়া আছে।
এটাই এখন চোখের সামনে ঘটছে। উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে কিছু মার্কিন মিত্র তাদের অংশগ্রহণ সীমিত করতে শুরু করেছে। ঝুঁকি কমাতে গিয়ে তারা অজান্তেই সম্মিলিত পদক্ষেপকে দুর্বল করছে।
সম্ভাব্য লাভ ও ক্ষতি—দুটিকেই এক জায়গায় কেন্দ্র করে খারগ দ্বীপ এ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করছে। দ্বীপ দখল করলে ইরানের ওপর চাপ পড়বে ঠিকই; কিন্তু সেই চাপ টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব জোটের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে। কৌশলগত সুবিধা এনে দেওয়ার পাশাপাশি এই পদক্ষেপ একই সঙ্গে ঝুঁকি তৈরি করবে। আর তা ভাগ করে নিতে হবে অংশীদারদের।
আরও বড় ছবিতে দেখলে যেখানে আগে জোট মানেই ছিল স্বতঃসিদ্ধ সমন্বয়, সেখানে এখন প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য দর-কষাকষি করতে হয়। ফলে যৌথ উদ্যোগের রাজনৈতিক খরচ বেড়ে যায়, আর তার কৌশলগত কার্যকারিতাও কমে। শর্তসাপেক্ষ জোট সহযোগিতার দরজা বন্ধ করে না, কিন্তু সেই সহযোগিতাকে আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে না।
এ কারণেই খারগ দ্বীপ (এক অর্থে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’) এত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মার্কিন নাগালের বাইরে বলে নয়; বরং এটি এমন এক পথের প্রলোভন তৈরি করছে, যার পরিণতির বোঝা অন্যরা বহন করতে চাইবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে।
কার্লা নরলোফ টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত