বাংলাদেশ কি খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা করতে গিয়ে নিজেকে পানিনিরাপত্তার ঝুঁকিতে ফেলছে? ধান চাষ আমাদের বাঁচায়; কিন্তু তার বর্তমান সেচপদ্ধতি কি ভবিষ্যৎকে শুষ্ক করে দিচ্ছে?
এই প্রশ্ন আজ শুধু কৃষি অর্থনীতির নয়; বরং দেশের পানিনিরাপত্তা ও জলবায়ু অঙ্গীকারের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ধান আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য এবং খাদ্যনিরাপত্তার মূল ভিত্তি। দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৭৮ শতাংশজুড়ে ধানের চাষ হয়। বর্তমানে এক কেজি বোরো ধান উৎপাদনে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হচ্ছে, যার একটি বিশাল অংশ অপচয় হয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ ও পরিবেশের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
বিজ্ঞানসম্মতভাবে ধানের জমিতে কেবল রোপণ ও ফুল আসার সময়টুকু পানি ধরে রাখা প্রয়োজন, যা পুরো মৌসুমের এক-চতুর্থাংশ সময় বা তারও কম। অথচ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময়জুড়ে আমাদের ধানিজমিগুলো পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। এতে বিপুল পরিমাণ পানির অপচয় হয় এবং দেশে পানিসংকট বাড়ে। উল্লেখ্য, দেশের ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত পানির প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় ধান চাষের সেচে।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বহু জেলায় গত দুই দশকে শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ০.৫ থেকে ১ মিটার নেমে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন হাইড্রোলজিক্যাল জরিপে দেখা গেছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে কিছু স্থানে বোরো মৌসুম শেষে পানির স্তর ২৫ থেকে ৩০ মিটার নিচে নেমে যায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় (২০২৩-২৫) দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে (যেমন গোদাগাড়ী, নিয়ামতপুর, মোহনপুর) বার্ষিক গড় হারে পানির স্তর ০.০৯ থেকে ০.৩৯ মিটার পর্যন্ত নামছে, যার মধ্যে গোদাগাড়ীতে সবচেয়ে বেশি (০.৩৯ মি/বছর)।
এতে সেচ ব্যয় বাড়ছে, ক্ষুদ্র কৃষক ঝুঁকিতে পড়ছেন এবং গ্রামীণ পানীয় জলের নিরাপত্তাও দীর্ঘ মেয়াদে হুমকির মুখে পড়ছে। শুধু গভীরতা নয়, পানির মানও হুমকির মুখে পড়ছে; বাড়ছে আর্সেনিক ও লবণাক্ততার ঝুঁকি। ইতিমধ্যে দেশের চারটি অঞ্চলকে ‘পানিসংকটপূর্ণ’ ঘোষণা করা হয়েছে, যার অন্যতম কারণ এই অত্যধিক সেচনির্ভর ধান চাষ।
অন্যদিকে দীর্ঘসময় জমিতে পানি ধরে রাখলে ধানের গোড়া পচে মিথেন গ্যাস তৈরি হয়, যা কার্বন ডাই–অক্সাইডের চাইতেও ক্ষতিকর একটি গ্রিনহাউস গ্যাস। দেশের মোট মিথেন নিঃসরণের প্রায় ৬৩ শতাংশ আসে অতিরিক্ত সেচনির্ভর ধান চাষ থেকে। ফলে পানি ও জলবায়ু—দুই সংকটই আমাদের ধান চাষের সঙ্গে জড়িত।
ধান চাষের এই দ্বৈত সংকট মোকাবিলার কার্যকর একটি উপায় হতে পারে বিরতিভিত্তিক সেচ (অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রায়িং বা এডব্লিউডি) পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে জমিতে টানা পানি ধরে না রেখে বেশ কিছু সময় জমি শুকানো হয়।
একবার সেচ দেওয়ার পর অপেক্ষা করা হয়, যেন জমির পানি মাটির প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার নিচে নেমে যায়। এতে ধানের শিকড় পানির সন্ধানে আরও গভীরে প্রবেশ করে, ফলে গাছ মজবুত হয় এবং শস্য ঝরে পড়া কমে। পানি ১৫ সেন্টিমিটার নিচে নামলে পুনরায় জমিতে সেচ দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) গবেষণায় দেখা গেছে, এই পর্যায়ক্রমিক ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতি অনুসরণ করে ধান চাষে ২০ থেকে ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত সেচের পানি সাশ্রয় সম্ভব এবং অনুকূল ব্যবস্থাপনায় মিথেন নিঃসরণ ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যায়। এসব করা যায় ফলনে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ছাড়াই।
সাম্প্রতিক মেটা-অ্যানালাইসিস (২০২৫) অনুসারে, এডব্লিউডিতে এ মিথেন নিঃসরণ গড়ে ৬৪.৫ শতাংশ কমে এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং পটেনশিয়াল ৪২.১ শতাংশ হ্রাস পায়। যদিও নাইট্রোজেন অক্সাইড নিঃসরণ সামান্য বাড়তে পারে। যেমনটি ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামে দেখা গেছে, যেখানে এডব্লিউএ নীতি পর্যায়ে গ্রহণের পর সেচের ব্যয় ২৫ শতাংশ কমেছে এবং মিথেন নিঃসরণ উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
আমাদের দেশের প্রায় ৪০ লাখ হেক্টর বোরো জমিতে এডব্লিউডি চালু করা গেলে শুধু পানি সাশ্রয়ই নয়, কার্বন ক্রেডিটের মাধ্যমেও উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব বছরে প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার। ভিয়েতনাম ইতিমধ্যেই এই পদ্ধতি তাদের ধান চাষে সফলভাবে বাস্তবায়ন করে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে কার্বন ক্রেডিট সংগ্রহ শুরু করছে।
২০০৪ সালে বাংলাদেশের ধান চাষে এ পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছে; কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ পদ্ধতিটির কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণ এখনো সম্ভব হয়নি; দেশের ৫ শতাংশের কম বোরো ধানের জমিতে এডব্লিউডি বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এত কম সম্প্রসারণের প্রধান কারণ আমাদের নীতির দুর্বলতা। কৃষিনীতিতে এডব্লিউডি এখনো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে কৃষি সম্প্রসারণের নিয়মিত সেবায় এটি কার্যকরভাবে অনুপস্থিত।
মূলত দাতা সংস্থা-অর্থায়িত প্রকল্পের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সীমিত এবং বিচ্ছিন্নভাবে কৃষকদের এডব্লিউডির ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
পরিবেশনীতিতে এডব্লিউডির উল্লেখ থাকলেও বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছায়নি।
আরেকটি বড় বাধা দেশের বিদ্যমান সেচব্যবস্থা। কৃষিসেচে ব্যবহৃত বিদ্যুতের বড় অংশ ভর্তুকিনির্ভর। পানিসাশ্রয় মানে বিদ্যুৎসাশ্রয়। আর বিদ্যুৎসাশ্রয় মানে সরকারের ভর্তুকির চাপ কমানো।
ফলে এডব্লিউএ কেবল পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিই নয়, এটি আর্থিকভাবে টেকসই কৃষি সংস্কারেরও একটি উপায়; কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাম্পমালিক তাঁর স্কিমের জমিগুলোতে প্রয়োজনীয় সেচ দেন এবং মৌসুম শেষে কৃষকদের থেকে একটি নির্দিষ্ট হারে সেচ খরচ আদায় করেন।
এ ব্যবস্থায় পানির ব্যবহার কমলেও কৃষকের সেচের খরচ কমে না, ফলে পানিসাশ্রয়ী পদ্ধতিতে কৃষকদের আগ্রহ তৈরি হয় না।
উপরন্তু অনেক কৃষক আশঙ্কা করেন, ধানের জমি পানিতে ডুবিয়ে না রাখলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, যদিও এই ধারণা পুরোপুরি বিজ্ঞানসম্মত নয়।
প্রকৃতপক্ষে ধান কোনো জলজ উদ্ভিদ নয়, এটি কেবল পানি সহ্য করতে পারে; অতিরিক্ত পানি বরং গাছের শিকড়কে মাটির গভীরে যেতে বাধা দেয়। তো এই পরিস্থিতির পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?
মাঠপর্যায়ে এডব্লিউডি বাস্তবায়ন জটিল বা ব্যয়বহুল নয়। একটি গ্রামের প্রায় সব কৃষক ও পাম্পমালিককে একসঙ্গে ধানের সেচব্যবস্থা এবং এডব্লিউডির ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে ও নিয়মিত মনিটর করে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে সম্ভব। নীতিগত দায়িত্ব পেলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তা করতে সক্ষম।
প্রথমত, ধান চাষে পানি ও মিথেন সাশ্রয়কে নীতিগত অগ্রাধিকার দিতে হবে। এতে নিয়মিত সম্প্রসারণ সেবায় এডব্লিউডি অন্তর্ভুক্ত হবে এবং কৃষি সম্প্রসারণ, সেচ, পরিবেশ ও পানিসম্পদ অধিদপ্তরের সমন্বয় ত্বরান্বিত হবে, যেমনটি ভিয়েতনামে হয়েছিল।
২০১১ সালের নীতিগত অগ্রাধিকারের মাধ্যমে ভিয়েতনাম তাদের দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও এডব্লিউডি সম্প্রসারণে সফল হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সেচ ব্যবস্থায় প্রণোদনার পরিবর্তন প্রয়োজন, যার জন্যও নীতির অগ্রাধিকার জরুরি। সেচের জন্য কৃষকদের প্রিপেইড বিদ্যুৎ কার্ড দেওয়া হলে তারা নিজে থেকেই সেচ কমাতে ও পানিসাশ্রয়ী পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহিত হবেন।
গত দশকের মাঝামাঝি বরেন্দ্র অঞ্চলে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা শুরুর দিকে এডব্লিউডি সম্প্রসারণে ইতিবাচক ফল দিয়েছিল। গবেষণায় দেখা যায়, ওই অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে যাঁরা প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করেছিলেন, তাঁরা এডব্লিউডি গ্রহণে বেশি আগ্রহী ছিলেন।
তবে নীতিগত অগ্রাধিকার ও শক্ত মনিটরিংয়ের অভাবে এটির সম্প্রসারণ স্থায়ী হয়নি।
বর্তমানে বিশ্বব্যাংক-অর্থায়িত ‘পার্টনার’ প্রকল্পটি দেশে এডব্লিউডি সম্প্রসারণে কাজ করছে। এ ছাড়া এডিবির সাম্প্রতিক পাইলট প্রকল্প (২০২৪-২৫) নওগাঁর নিয়ামতপুরে এক হাজার কৃষকের মধ্যে এডব্লিউডি প্রচার করছে। আইডব্লিউটি প্রকল্পে (২০১৮-২৫) বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রায় তিন হাজার হেক্টরে এডব্লিউডি চালু হয়েছে এবং এর মাধ্যমে কৃষকের আয় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
পাশাপাশি ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ বোরো জমিতে এডব্লিউএ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি আমরা জাতিসংঘের কাছে দিয়েছি আমাদের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) ৩.০ (২০২৫)–এর মাধ্যমে।
এ লক্ষ্য অর্জনে নীতিগত অগ্রাধিকার অপরিহার্য, যার মাধ্যমে আন্তঃ অধিদপ্তর সমন্বয় বাড়বে, নিয়মিত কৃষি সম্প্রসারণ সেবায় এডব্লিউডি যুক্ত হবে এবং দীর্ঘ মেয়াদে ও ব্যাপক পরিসরে কৃষকদের কাছে পদ্ধতিটি পৌঁছানো সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রিপেইড কার্ডের মতো কার্যকর সেচব্যবস্থা প্রবর্তন ও টেকসই করাও সহজ হবে।
আশার কথা, বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ধান চাষে এডব্লিউডি সম্প্রসারণের কথা এসেছে। এ ছাড়া তাদের কৃষক কার্ড উদ্যোগে শস্যবিমা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা এডব্লিউডির মতো নতুন কৃষিপদ্ধতি গ্রহণে কৃষকদের আস্থা বাড়ায় বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
এখন আগের মতো শুধু ছোটখাটো প্রকল্প করে না রেখে সরকারের উচিত হবে ধান চাষে পানি বাঁচানো ও মিথেন গ্যাস কমানোকে জাতীয় নীতির অগ্রাধিকার হিসেবে নেওয়া। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব অধিদপ্তরকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং সারা দেশে এডব্লিউডি পদ্ধতি ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে, যখন ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়।
খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা—লক্ষ্য দুটিকে আলাদা করে দেখার আর সুযোগ নেই। ধান চাষে এডব্লিউডির সম্প্রসারণ দুই লক্ষ্যকেই একসঙ্গে পূরণ করতে পারে, যদি এটিকে প্রকল্পের সীমায় না রেখে নীতির কেন্দ্রে আনা হয়।
প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, প্রশ্নটি নীতির। আমরা কি ভূগর্ভস্থ পানি নিঃশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঝুঁকিতে ফেলব, নাকি বিজ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষার পথ বেছে নেব?
এডব্লিউডি কোনো পরীক্ষামূলক ধারণা নয়, এটি একটি প্রমাণভিত্তিক কৃষি সংস্কার। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সমন্বয়। প্রশ্নটি এখন আর ‘কী করা উচিত’-এর নয়, বরং ‘কখন করা হবে’ তার।
ড. সোহেল রানা, কৃষিপ্রযুক্তি গবেষক, বন বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানি
ড. এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম, অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
সুবাইল বিন আলম, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সেন্টার ফর সায়েন্স টেক পলিসি অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি
মতামত লেখকদের নিজস্ব