মোদি শাসনের এটাই কি শেষের শুরু

ভারতে বিরোধীরাও সোচ্চার হয়ে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেছবি: এএফপি

প্রবাদ আছে, যদি একটি মুরগির গায়ের পালক এক এক করে উপড়ে ফেলা হয়, তবে চট করে কেউ তা টের পায় না। অনেকেই এই বিভ্রান্তিতে ভোগেন যে ছোট ছোট অন্যায় বা অনিয়ম হয়তো কখনোই তাঁদের পেছনে তাড়া করে ফিরবে না।

কিন্তু এই কৌশলের প্রধান সমস্যা হলো, এক সুন্দর সকালে সব সত্য কোনো রকম ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছাড়াই একদম উলঙ্গ রূপ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়, যা আর অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকে না। এই অক্টোবরে ভারতের গণতন্ত্রকে ঠিক সেই পালক-ছেঁড়া মুরগির মতোই মনে হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা কৌতুক করে নিজেদের ‘ককরোচ’ বলে ডাকছেন, তাঁরা আজ ভারতের রাজপথজুড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে এসেছেন।

নরেন্দ্র মোদি নিজেকে আজ যেভাবে কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন, সেনা-পুলিশের ব্যারিকেডের আড়ালে আত্মরক্ষা করছেন এবং যে তরুণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখোমুখি হচ্ছেন—যাঁদের কাছে গণতন্ত্রের এই তিলে তিলে ধ্বংসের পর হারানোর আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, ভয় পাওয়ারও কিছু নেই—তার পেছনে ১২ বছর ধরে লাগাতার পালক উপড়ানোর ইতিহাস রয়েছে।

আরও পড়ুন

ভোটার তালিকা থেকে নাম ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ১০ অক্টোবর আয়োজিত বিশাল এক বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়ে মোদি নিজের ভুলগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন। তাঁর সরকার দেশজুড়ে যেসব কঠোর পদক্ষেপ জারি করেছে, তা যেন আশির দশকের সেই জরুরি অবস্থার দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়।

সমাবেশ শুরু হওয়ার আগেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজিপি) আন্দোলনের শীর্ষ ও পরিচিত মুখ—রত্না সিং, অভিজিৎ দিপকে এবং ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয়। আটক করা হয়েছে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীসহ আরও বহু স্বনামধন্য অধিকারকর্মীকে।

তা সত্ত্বেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারী দিল্লির রাজপথে নেমে আসেন এবং নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালান। পুরো ভারতজুড়ে একের পর এক শহরে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা গেছে। দিনভর পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে একপ্রকার ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলেছে। রাজধানীজুড়ে এক জায়গা থেকে হটিয়ে দিলে আন্দোলনকারীরা অন্য কোনায় গিয়ে আবার একত্র হয়েছেন—নির্ধারিত স্থান থেকে তাঁদের তাড়িয়ে দেওয়া হলেও তাঁরা কোনোভাবেই রাজপথ ছাড়তে রাজি ছিলেন না।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভের সময় আটক করা হচ্ছে আন্দোলনকারীদের। নয়াদিল্লি, ১০ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: রয়টার্স

সন্ধ্যার মধ্যে পুরো শহর থেকে অন্তত ২ হাজার ৫০০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১৫ জন সাংবাদিককে আটক করে বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে তৈরি আটককেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। অবশ্য পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনেককেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

সরকারের এসব বলপ্রয়োগ মোদির এমনিতেই নড়বড়ে হয়ে পড়া রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। তাঁর সমালোচকেরা এখন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন—প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মোদি আদৌ আর যোগ্য কি না। গত শুক্রবার রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলো রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি জমা দিয়ে বলেছে, বর্তমান সরকার ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

মোদির আমলে সমস্যাগুলো যেন জাহাজের তলায় জমে থাকা শেওলা আর পোকামাকড়ের মতো জমতে জমতে পাহাড় সমতুল্য হয়েছে। যখনই তাঁর কর্তৃত্বকে কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে, তিনি এই দেশের ভিত্তিমূল অর্থাৎ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে ততটাই দূরে সরে গেছেন।

ভোটার তালিকা হালনাগাদের নামে পরিচালিত ‘বিশেষ নিবিড় পুনর্বিন্যাস’ (এসআইআর) প্রক্রিয়াটি ছিল মূলত তাঁর উপড়ানো শেষ পালক—যাকে আমলাতান্ত্রিক ফ্যাসিবাদের এক চরম নমুনা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। এর মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি ভারতীয় নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

এই ভোটার তালিকা কারচুপি যে নির্বাচনগুলোকে প্রভাবিত করতে সাহায্য করেছে—তা নিয়ে সংশয়ের আর কোনো অবকাশ নেই। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই এসআইআর প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার লজ্জায় পদত্যাগ করছেন না, এমনকি ২০০৬ সালের একটি পুরোনো দুর্নীতি মামলা তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে সামনে আসার পরও নয়।

দিল্লির রাজপথে তরুণদের এই ক্ষোভ, বিশৃঙ্খলা আর অবাধ্যতার দৃশ্য স্রেফ এক দিনে তৈরি হয়নি—এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। মোদি ও তাঁর মন্ত্রিসভার বয়োবৃদ্ধ, হাস্যরসহীন মন্ত্রীদের ঠিক বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন এই তরুণ ও বৈচিত্র্যময় আন্দোলনকারীরা। মোদির মন্ত্রীরা এত দিন ঘৃণা ছড়ানো আর সমাজকে বিভক্ত করার কৌশলেই আস্থা রেখে এসেছিলেন। আত্ম অহংকারে মত্ত এই বয়স্ক লোকগুলো ভেবেছিলেন—জনপ্রতিনিধিদের অপরাধ নাগরিকেরা চিরকাল হজম করে নেবে এবং সমাজে ফাটল ধরিয়ে ও কৃত্রিম শত্রু তৈরি করে হয়তো সারা জীবন দেশ শাসন করা যাবে।

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে দিল্লিতে কংগ্রেসের বিক্ষোভ
রয়টার্স

আইন ভাঙনে অভ্যস্ত লোকেরা যখন দেশের আইনপ্রণেতা হয়ে বসেন, তার পরিণাম আজ পুরো ভারত প্রত্যক্ষ করছে। অপরাধমূলক মনোভাবই যেন এই শাসকদলের মূল চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে এবং এই লোকগুলোর অশুভ মূল্যবোধই মোদির শাসনকালকে সংজ্ঞায়িত করেছে। আর এই প্রক্রিয়ায় তিনি ভারতের সংবিধানকে পুরোপুরি ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন।

এখন সেই সব অতীত পাপ যখন ‘ককরোচ’ এর রূপ ধরে তাঁকে তাড়া করতে এসেছে—যাঁদের তিনি কোনোভাবেই দমন করতে পারছেন না—তখন মোদি পুরো দিল্লিকে এক দুর্গে পরিণত করেছেন এবং নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর রাষ্ট্রের সব শক্তি প্রয়োগ করছেন। এটি অবশ্য তাঁর পুরোনো নীতির সঙ্গেই পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ—তিনি সব সময় শান্তির ভান করেন কিন্তু বাস্তবে কেবল সংঘাতের জন্ম দেন; তা হতে পারে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে, কিংবা শহরের অভ্যন্তরীণ নাগরিকদের মধ্যে।

১০ অক্টোবরের এই আন্দোলন তো কেবল শুরু বা সূচনা পর্ব। আগামী কয়েক সপ্তাহে মোদির সংকট আরও গভীর হবে। সিজিপি ঘোষণা দিয়েছে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। বিরোধীরাও সোচ্চার হয়ে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে।

আরও পড়ুন

এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদির চরম অক্ষমতার বিষয়টি শেষ পর্যন্ত জনসমক্ষে পরিষ্কার হয়ে গেছে। সারা বিশ্বের সামনে ভারত যে গণতন্ত্রের ঢাকঢোল পিটিয়ে আসছিল, তার যে ভেতরের কঙ্কালসার ও ফাঁপা অবস্থা—তা এরা উন্মোচিত করে ছেড়েছে।

মোদির শাসনের সূর্য যখন অস্তমিত হওয়ার পথে—দেয়ালের লিখন অন্তত সেটাই বলছে—তখন ইতিহাস মোদিকে নিশ্চিতভাবেই সেই ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করবে, যাঁর কারণে একটি পুরো প্রজন্ম সরকার, সেনাবাহিনী, দিল্লি পুলিশ তথা পুরো শাসনব্যবস্থার ওপর থেকে শেষ বিশ্বাসটুকুও হারিয়েছে।

নয়াদিল্লি আপাতত এক দম বন্ধ করা বর্তমান এবং এক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের মধ্যবর্তী ক্রান্তিকালে ঝুলছে। সময়ের এই কঠিন ও ধূলিধূসরিত অংশটুকুও একসময় পার হয়ে যাবে।

কিন্তু এই ঝড়ের ধুলা যখন শান্ত হবে, তখন ডানপন্থী ভাবাদর্শ ও ক্ষমতার অপব্যবহারে ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে—আজ রাজপথে নেমে আসা এই তরুণদের কাছেই কেবল সেই উত্তর রয়েছে। আর এই সত্যটি আজ আন্দোলনকারী প্রত্যেক ‘ককরোচ’ খুব ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারছে। কারণ, শেষ পর্যন্ত সব ক্ষমতার উৎস জনগণই।

বিদ্যা কৃষ্ণন একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, যিনি সামাজিক বিচার ও অধিকার বিষয়ে লেখালেখি করেন। আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

  • বিদ্যা কৃষ্ণন একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, যিনি সামাজিক বিচার ও অধিকার বিষয়ে লেখালেখি করেন

    আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত