জাতীয় সংসদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের জন্য গাড়ির ‘আবদার’ ও উপজেলায় বসার জায়গা নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা নাগরিক হিসেবে আমাদের কিছুটা বিষণ্ন করে। জ্বালানি সংকটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত এখন অত্যন্ত দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
এর মধ্যে দেশের কোনো কোনো প্রান্তে হামের মতো জনস্বাস্থ্যসংকটও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্যরা যদি সরকারি গাড়ির অভাবকে' কিংবা সেই 'অভাব' নিয়ে কথা বলাকে 'লজ্জা’ হিসেবে অভিহিত করেন, তখন লজ্জার সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাববার অবকাশ তৈরি হয়।
সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সংসদে জানিয়েছেন, একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিংবা উপজেলা চেয়ারম্যানের গাড়ি থাকলেও সংসদ সদস্যদের ভাড়া গাড়িতে চলতে হয়, তাদেরও গাড়ি থাকলে ভালো হয়।
তাঁর বক্তব্যের রেশ ধরে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান ছোটদের আবদারে ‘না’ বলতে সরকারকে মানা করেছেন। রাজনৈতিক সৌজন্যের এই বয়ান শুনতে মধুর হলেও রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিস্থিতির সঙ্গে এর দূরত্ব যোজন যোজন।
নির্বাচনের আগে হেঁটে হেঁটে নিজ আসনের মানুষের কাছে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ ভোট চেয়েছেন, জনগণের অন্তরে পৌঁছেছেন, ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তখন তাঁর গাড়ির প্রয়োজন হয়নি। নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের কাছে পৌঁছাতে কেন গাড়ির প্রয়োজন হবে?
আমাদের সংবিধানে ও সংসদীয় গণতন্ত্রের দর্শনে সংসদ সদস্যের পদটি মূলত সেবার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক আগেই এটি আভিজাত্য ও আধিপত্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। অনুমান করা যায়, হাসনাত আবদুল্লাহর ‘লজ্জা’ মূলত প্রটোকল বা পদের আড়ম্বর নিয়ে।
অথচ জনপ্রতিনিধির প্রকৃত লজ্জার কারণ হওয়া উচিত তাঁর নির্বাচনী এলাকায় যখন কোনো শিশু চিকিৎসার অভাবে মারা যায়, কিংবা যখন একজন গর্ভবতী মা সময়মতো হাসপাতালে যাওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স পান না।
বর্তমানে দেশে ‘হাম’ বা মেছলসের প্রাদুর্ভাব একটি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলো বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের অগ্রাধিকার কোথায় হওয়া উচিত।
হাসনাত আবদুল্লাহ যখন মানুষের কাছে যাওয়ার জন্য একটি সরকারি গাড়ির আবেদন জানাচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই হয়তো তাঁর আসনের কোনো সাধারণ মানুষকে মাইলের পর মাইল পথ স্থানীয় যানবাহনে চড়ে ধুঁকতে ধুঁকতে ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে।
সংসদ সদস্যদের অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশই বিত্তবান ও সফল ব্যবসায়ী। নিজেদের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেন গাড়ি ব্যবহার করতে হবে? হাসনাত আবদুল্লাহর আবদারের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুশাসনের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন যে ‘এমপিরা শুল্কমুক্ত গাড়ি নেবেন না।’
এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক বার্তা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল ‘শুল্কমুক্ত’ সুবিধা না নেওয়াটাই কি যথেষ্ট? যেখানে রাষ্ট্র বাজেটের ঘাটতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, পরিচালনা ব্যয় কমাতে মন্ত্রী-সচিবদের বিদেশ সফর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আপ্যায়নেও কাঁচি চালানো হচ্ছে, সেখানে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন সংসদ সদস্যকে আলাদা করে গাড়ি দেওয়া কি কোনো যুক্তিসংগত আলাপের মধ্যে পড়ে?
একজন সরকারি কর্মকর্তা বা স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি যাতায়াতের সুবিধা পান কারণ, সেটা তাঁর কর্মপ্রক্রিয়ার অংশ। সংসদ সদস্যদেরও নিশ্চয়ই কাজ আছে। সংসদে জনগণের কথা তুলে ধরতে নিশ্চয়ই জনগণের কাছে যেতে হয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো, দেশের বেশির ভাগ মানুষের বাড়িতেই এসইউভি ধরনের সরকারি গাড়ি ঢোকার রাস্তা নেই। আর ঐতিহাসিকভাবে দেখলে বোঝা যায়, গাড়িতে চড়ে হয়তো জনগণের কাছে যাওয়া যায়, কিন্তু গাড়িতে চড়ে জনগণের অন্তরে পৌঁছানো যায় না।
নির্বাচনের আগে হেঁটে হেঁটে নিজ আসনের মানুষের কাছে গিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ ভোট চেয়েছেন, জনগণের অন্তরে পৌঁছেছেন, ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তখন তাঁর গাড়ির প্রয়োজন হয়নি। নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের কাছে পৌঁছাতে কেন গাড়ির প্রয়োজন হবে?
বরং গাড়ির বদলে যদি এমপিরা নিজ আসনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স চাইতেন, সেটা বরং হতে পারত জনগণের অন্তরে পৌঁছানোর সহজ রাস্তা। এখানে ‘অ্যাম্বুলেন্স’ শব্দটিকে একটু গভীরে তলিয়ে দেখা প্রয়োজন। বহু বছর ধরেই আক্ষরিক অর্থে জেলা শহরগুলোতে আধুনিক অ্যাম্বুলেন্সের হাহাকার চলছে। আবার রূপক অর্থেও এই রাষ্ট্রের অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন। রাষ্ট্র এখন এক গুরুতর সংকটে। আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আমাদের শিক্ষা অবকাঠামো থেকে শুরু করে দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে পিষ্ট সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা অর্থনীতি—সবই যেন একটি মুমূর্ষু রোগীর মতো। রাষ্ট্রকে এই মুমূর্ষু অবস্থা থেকে টেনে তুলতে রাজনৈতিক অ্যাম্বুলেন্স বা কার্যকর সংস্কারের প্রয়োজন সবার আগে।
সরকারদলীয় মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ স্মরণ করিয়ে দিলেও চূড়ান্তভাবে বিরোধী ও সরকারি দল উভয়েই গাড়ি নেওয়ার ব্যাপারে যেভাবে ‘আলাপ-আলোচনা’ বা ‘বিহিত-ব্যবস্থা’র দিকে ঝুঁকছেন, তাতে নাগরিকদের শঙ্কা বাড়াটাই স্বাভাবিক। বিরোধী দলের সদস্যরা এর আগে শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার নীতিগত ঘোষণা দিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত বিলাসের মোহমুক্ত হয়ে সেই প্রতিশ্রুতি এখন রক্ষার দায় তাঁদের।
জনগণকে প্রাধান্য দেওয়ার দাবিটি শুধু ভাষণে নয়, কাজের ম্যান্ডেটে প্রকাশ পাওয়া উচিত। সংসদ সদস্যরা জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী আলাদা কোনো বিশেষ সুবিধা নেবেন না—প্রধানমন্ত্রীর এই অনুশাসনটি কেবল ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নয়, সামগ্রিক মানসিকতার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হওয়া দরকার। গাড়ি কোনো ‘লজ্জার’ সমাধান নয়। মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া আর নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই হওয়ার কথা জনপ্রতিনিধির প্রকৃত গরিমা।
এমপি মহোদয়দের ব্যক্তিগত চলাফেরার অভাববোধ ঘোচানোর আগে দেশের ভঙ্গুর জনস্বাস্থ্যের চাকা যেন মেরামত হয়। তাঁরা যেন জনগণের প্রতিনিধি হয়ে অ্যাম্বুলেন্স চাইতে ভুলে না যান। রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধ সম্পদের বরাদ্দ যেন সেসব সম্ভাবনার কাছে পৌঁছায়, যে সম্ভাবনাগুলো পরিচর্যার অভাবে প্রায় নিভু নিভু অবস্থায় চলে গেছে।
মনে রাখা দরকার, বর্তমান সংসদ এই দেশের সিংহভাগ দরিদ্র মানুষের ১৭ বছরের সংগ্রাম ও একটি গণ-অভ্যুত্থানের ফল। এই সংসদকে হতে হবে মানুষের ত্যাগের স্মারক, আরাম-আয়েশের আড্ডাখানা নয়। সংসদ সদস্যদের বিলাসিতা গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। স্বাভাবিকভাবেই, তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের ইতিহাসের পাতা কখনোই জনসেবকদের বিলাসিতার দায় সইতে চাইবে না।
সৈকত আমীন, প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
*মতামত লেখকের নিজস্ব
