জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ বিয়ন্ড গুড অ্যান্ড ইভিল –এ লিখেছিলেন, ‘যে দানবের বিরুদ্ধে লড়াই করে, তাকে সতর্ক থাকতে হবে—যেন সে নিজেই দানবে পরিণত না হয়।’ নিৎশের এই আলাপ বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক।
ফ্যাসিবাদ এক রাতে গড়ে ওঠে না। ভিন্নমতাবলম্বীদের নানা অজুহাতে আটক ও হয়রানি করার মধ্য দিয়েই এর সূচনা হয়। সমাজ এসব অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে শুরু করলে একপর্যায়ে তা নিয়মিত গুম–খুনের পর্যায়ে পৌঁছায়। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে আমরা এমনই দমনের নির্মম চিত্র দেখেছি।
এই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জুলাই মাসে ছাত্র ও জনতার রক্তক্ষয়ী গণ–অভ্যুত্থানের লক্ষ্য কেবল দুঃশাসনের পতন ছিল না, মানবিক রাষ্ট্রের দাবিও ছিল। আমাদের প্রত্যাশা ছিল এমন এক বাংলাদেশের, যেখানে ভিন্নমত বা প্রতিবাদকে কোনোভাবেই দমন করা হবে না।
কিন্তু গত শনিবার রাজধানীর শাহবাগে সাত মার্চের ভাষণ বাজানোকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনা এবং এর জেরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মতো চরম নিবর্তনমূলক ধারায় মামলার বিষয়টি সেই প্রতিশ্রুত মানবিক বাংলাদেশের বার্তা দেয় না।
সাত মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ সাউন্ড বক্সে বাজানোর কারণে পুলিশ প্রথমে শহীদুল্লাহ হল শাখা ছাত্রলীগের কর্মসংস্থান সম্পাদক মো. আসিফ আহমেদকে আটক করে। বর্তমান বাস্তবতায় ছাত্রলীগ একটি নিষিদ্ধ সংগঠন এবং আসিফের নামেও চাঁদাবাজি, বিরোধীদের ওপর হামলাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ আছে। কিন্তু সেসব অভিযোগে তাঁকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, 'ওই ছেলে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাজাচ্ছিল। এটা তো নিষিদ্ধ, এজন্য নিয়ে আসা হয়েছে।' পুলিশের এই বক্তব্য শুনে আকাশ থেকে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না। ৭ মার্চের ভাষণ ঠিক কবে নিষিদ্ধ হলো? কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো? নাকি অঘোষিতভাবেই প্রশাসনে চলছে এই নিষেধাজ্ঞা?
গণতান্ত্রিক সমাজে বিরোধিতার আওয়াজ সব সময় মধুর হবে না। অনেক ক্ষেত্রে তা চরম বিরক্তিকর বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতাদর্শের পরিপন্থীও হতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে গায়ের জোর এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই আওয়াজের গলা টিপে ধরতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সাত মার্চের ভাষণ শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এই ভাষণকে কেন্দ্র করে দেশের মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এই ভাষণ প্রচারের কারণে কাউকে আটক করা জনমনে ভালো বার্তা দেয় না।
এই আটকের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি ও জহুরুল হক হল শাখা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক আবদুল আল মামুনের নেতৃত্বে কয়েকজন শাহবাগ থানার সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করেন।
প্রতিবাদ চলাকালে ডাকসুর এক নেতার নেতৃত্বে একটি রিকশায় অবস্থান করা ইমি ও মামুনকে বাধা দেয় এবং জোরপূর্বক রিকশাসহ ধরে শাহবাগ থানার ভেতরে নিয়ে যায়। থানার ভেতরেই আবদুল আল মামুনকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ আছে। একইসাথে অভিযোগ আছে, সেখানে পুলিশ তাঁদের রক্ষাকারীর বদলে গ্রেপ্তারকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়।
কোনো সভ্য সমাজে সাধারণ জনতা বা ছাত্র নামধারী কোনো পক্ষের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নেই। থানার অভ্যন্তরে যখন কাউকে মারধর করার অভিযোগ আসে, এবং পুলিশ যখন সেখানে হামলার শিকার ব্যক্তিকেই উল্টো গ্রেপ্তার দেখায়, তখন রাষ্ট্র ও আইনের শাসনের অসহায়ত্বই প্রকট হয়ে ওঠে। এই চিত্র হাসিনা আমলের চিরচেনা সেই ভয়ের সংস্কৃতিরই একটি নতুন সংস্করণ ছাড়া আর কিছু ভাবা দুষ্কর।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো এই ঘটনার আইনি প্রক্রিয়া। রোববার এই তিনজনকে পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়েছে। পুলিশের করা মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, তাঁরা মসজিদের দিকে মুখ করে লাউড স্পিকারে উসকানিমূলক স্লোগান দিচ্ছিলেন, যখন তারাবিহর নামাজ চলছিল। সেই সঙ্গে নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম সচল করার চেষ্টা, পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া এবং আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
যে বিষয়টিতে গভীরভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন তা হলো, ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’-এর প্রয়োগ। এই আইন রাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ প্রকৃত জঙ্গি বা বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমনের জন্য তৈরি। কেবল মাইকে ভাষণ বাজানো, থানার সামনে প্রতিবাদ করা বা পুলিশের সঙ্গে সাধারণ বাদানুবাদ কোনোভাবেই ‘সন্ত্রাসবাদ’ হতে পারে না।
আমরা ভুলিনি, বিগত স্বৈরতান্ত্রিক সরকার কীভাবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনকে বিরোধীদের দমনের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
সাধারণ কোনো রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা ক্ষোভ প্রকাশকে যখন ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র’ বা ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জামিন অযোগ্য ও কঠিন আইনে মামলা দেওয়া হয়, তখন তা কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার শামিল হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে কি প্রশাসন বুঝিয়ে দিতে চাইছে যে পূর্ববর্তী শাসকদের মতোই ভিন্নমতকে স্তব্ধ করার জন্য যেকোনো সময় ‘সন্ত্রাস’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র’–এর লেবেল সেঁটে দেওয়া হবে?
যে নিষিদ্ধ সংগঠন বা স্বৈরাচারী রেজিমের বিরুদ্ধে এ দেশের ছাত্র–জনতা সংগ্রাম করেছে, তাদের প্রতি ঘৃণা বা ক্ষোভ থাকাটা স্বাভাবিক। যত দিন ক্ষত শুকাবে না, তত দিন ক্ষোভ থাকবেই। কিন্তু রাষ্ট্র কোনো ইমোশন বা জনরোষ দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না। নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো সদস্য যদি রাষ্ট্রের আইন অমান্য করে, তবে তাকে দেশের প্রচলিত স্বাভাবিক দণ্ডবিধিতে বিচার করা যেতে পারে।
কিন্তু একটি ছোট প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ঠেকাতে যদি ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ বা ‘উসকানিমূলক স্লোগান’-এর ধুয়া তুলে দমন করতে হয়, তবে বুঝতে হবে শাসকশ্রেণি ও প্রশাসনের ভেতরের চরম স্বেচ্ছাচারিতা কাজ করছে। এই একই মানসিকতা কাজ করেছিল গত রেজিমের নিপীড়ক শাসকদের মনে।
গণতান্ত্রিক সমাজে বিরোধিতার আওয়াজ সব সময় মধুর হবে না। অনেক ক্ষেত্রে তা চরম বিরক্তিকর বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতাদর্শের পরিপন্থীও হতে পারে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে গায়ের জোর এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই আওয়াজের গলা টিপে ধরতে হবে। যদি ফ্যাসিবাদের বিরোধিতার নামে আরেকটি নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়, যদি নিপীড়নতন্ত্রকে প্রতিস্থাপন করে ভিন্ন মোড়কে আরেকটি নিপীড়ক প্রশাসন গড়ে ওঠে, তবে জুলাই-আগস্টের শত শত তরুণের রক্তের সঙ্গে চরম বেইমানি করা হবে।
শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি ও অন্যদের গ্রেপ্তারের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে ফ্যাসিবাদের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এখনো সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান।
নিজেদের ‘সঠিক’ প্রমাণের জন্য অন্যের বাক্স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজেদের ঢাল হিসেবে ব্যবহারের এই যে চর্চা, এটি এখনই সমূলে উৎপাটিত না হলে ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য তা চরম ভয়াবহ ফল বয়ে আনবে। সরকারকে অবশ্যই এ ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।
আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ করে, থানার ভেতরে বিচারবহির্ভূত নিপীড়ন ও সাধারণ জনতার আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার যে নৈরাজ্য—তার লাগাম টানতে হবে। তা না হলে যে মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছি, তা এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না। ফ্যাসিবাদের পুরোনো ভূত যেন কোনোভাবেই আমাদের স্বাধীন ভূখণ্ডকে গ্রাস করতে না পারে, রাষ্ট্রকেই এখন সেই প্রমাণ দিতে হবে। ইমিদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং আইনের যৌক্তিক প্রয়োগের মধ্য দিয়েই এই মানবিক রূপান্তরের সত্যিকারের যাত্রা শুরু হতে পারে।
সৈকত আমীন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
*মতামত লেখকের নিজস্ব
