মাঠে ডিম পাড়া হাট্টিমাটিম টিম যদি ছোটদের বই থেকে কই মাছের মতো করে ধরে ধরে ফার্মের খাঁচায় ভরে ভরে পোলট্রি মুরগির মতো পালা যেত, তাহলে আজকে খালি খালি ডিমের হালি সত্তর–আশি টাকা হতো না।
কপাল খারাপ। বাজারে খাড়া দুটি শিংওয়ালা হাট্টিমাটিম টিমের ডিম নাই। ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’ নাই। আছে ঘোড়ার ঘাস কাটা বাজার মনিটরিং টিম। সরকারি নজরদারি দলের আধবোজা চোখের ঝিম দেখে থেকে থেকে ডিমের দাম ডিমডিমাডিমডিম করে ভীমগতিতে বাড়ছে।
খুচরা বাজারে এখন যে দাম, তাতে ভাংতি টাকায় ডিম মেলে না। দাম শুনে টুকটাক কাজকাম করা মজুর-চাষা ভাষা হারিয়ে ডিমের বদলে শিম-টিম-আলু-ফালু কিনে বাসায় ফিরছে।
দেশি হাঁসের এক হালি ডিম আশি টাকায় আর ফার্মের মুরগির ডিম সত্তর টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হংসডিম্ব-কুক্কুটান্ডের এই কাণ্ড চিন্তাবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ না ফেললেও গরিব মানুষকে কায়দা করে বেকায়দায় ফেলেছে।
এমনিতেই গরুর মাংস এখন আর গরিবের সদাইপাতির অংশ না। মাঝেমধ্যে পাতে মাছ জুটলেও তাতে প্রোটিনের ঘাটতি মেটে না। ডিমই ছিল ভরসা। সেই ভরসার বাতিও এখন ডিমলাইটের মতো টিমটিম করছে।
ডিমের এই সূক্ষ্ম একটা দুঃখ নিয়েও ফেসবুকে ফচকে ফাজিল ছেলেপেলে ‘লোল!’ বলে ট্রোল করছে। আন্ডা নিয়ে ট্রোল করতে গিয়ে ঠান্ডা মাথা গরম করে ফেলছে।
ফেসবুকে আন্ডা নিয়ে এক পান্ডা লিখেছে, ‘ডিম নাই: হারুন ভাতের হোটেল বন্ধ’। রক্ত হিম করা ডিমথেরাপির ভয়ডর না করে আরেকজন লিখেছে, ‘রিমান্ডে না যাওয়া পর্যন্ত গরিবের ডিম দেখা বন্ধ’।
এদিকে আমাকে এক বন্ধু গত রাতে ‘তোমার সন্তান যেন থাকে ডিমে-ভাতে’ লেখা টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছেন।
তাহলে উপায়? উপায় আপাতত নাই। যাঁদের হাতে উপায় আছে, তাঁদের হাতে এবং পায়ে পড়লেও তাঁরা উপায় বাতলাবেন না, পাছে তাঁদের আয় কমে যায়। একবার চাল, একবার ডাল; একবার তেল, একবার জেল; একবার চিনি-আটা-নুন; একবার দেশি আদা-পেঁয়াজ-রসুন নিয়ে ‘খেলা হবে’। এভাবেই চলবে। এভাবেই চলে।
ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্তারা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আগে হস্তক্ষেপ করে মুখস্থ কথা ঝাড়ছেন: ডিমের ডিমান্ড বেড়েছে, সাপ্লাই কমেছে; তাই দাম চড়া। সাপ্লাই বাড়াতে তাঁরা কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছেন। অচিরেই নাকি আন্ডার দাম আন্ডারকন্ট্রোলে চলে আসবে।
পাবলিক সে কথা মানছে না। তারা বলছে, সিন্ডিকেটের কলকাঠি সব উদ্যোগ মাটি করে দিচ্ছে। একটি পোর্টালের রিপোর্টে দেখলাম, দুটি বড় কোম্পানি ডিমের কৃত্রিম সংকট ঘটিয়ে বাজার হট করেছে। টক শোতে বিশেষজ্ঞরা বকবক করলেও তাদের নিয়ে কোনো ‘টক’ করছেন না। পুলিশও তাদের ফট করে কট করছে না। ফলে তলেতলে তারা টুকটুক করে কোটি কোটি টাকা পকেটস্থ করছে।
তাহলে উপায়? উপায় আপাতত নাই। যাঁদের হাতে উপায় আছে, তাঁদের হাতে এবং পায়ে পড়লেও তাঁরা উপায় বাতলাবেন না, পাছে তাঁদের আয় কমে যায়। একবার চাল, একবার ডাল; একবার তেল, একবার জেল; একবার চিনি-আটা-নুন; একবার দেশি আদা-পেঁয়াজ-রসুন নিয়ে ‘খেলা হবে’। এভাবেই চলবে। এভাবেই চলে।
সিরিয়ালি দেহ সাধনার দম বাড়ানোর খেলার মতো দাম বাড়ানোর খেলা একদিকে চলে; অন্যদিকে পাবলিক জ্বলে।
এখন আধা সেদ্ধ ও পুরো সেদ্ধ ডিমের জ্বালানোর পালা। পাবলিকের পালানোর পথ নেই। আপাতত তার ‘ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাগডাশে’ টাইপের উদীচীয় গণসংগীত গেয়ে একটা নাতিশীতোষ্ণ প্রতিবাদী ডিমে তা দেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নাই।
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
ই-মেইল: [email protected]