এর পাশাপাশি আমরা ফরিদপুরে দেখছি ভিন্ন চিত্র। সেখানে বিএনপির গণসমাবেশ হওয়ার কথা আজ শনিবার। ৩৮ ঘণ্টা আগে গতকাল সকাল থেকে ফরিদপুরগামী সব বাস-মিনিবাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। চলবে না বিআরটিসির বাসও। সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রীরা এত দিন বলতেন তাঁরা বিএনপির সমাবেশে বাধা দিচ্ছেন না। বাস চলাচল করতেও নিষেধ করেননি। বাসমালিক ও শ্রমিকেরা নিরাপত্তার ভয়ে যদি বাস বন্ধ রাখেন, তাঁদের কী করার আছে? আসলেই কি করার কিছু নেই? যেসব পরিবহনের মালিক ধর্মঘট ডাকেন, তাঁরা কি ভিন্ন গ্রহ থেকে এসেছেন? পরিবহনের মালিকদের দাবি, মহাসড়কে তিন চাকার নছিমন-করিমন-ভটভটি ইত্যাদি চলতে পারবে না। কিন্তু বিআরটিসির বাস কেন বন্ধ হলো? সরকার বলতে পারে, নিরাপত্তার কারণে। আমরা অতীতে দেখেছি, বিরোধী দলের হরতাল–অবরোধের মধ্যেও বিআরটিসির বাস চলেছে। প্রয়োজনে বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। হরতাল–অবরোধে যখন বেসরকারি বাসমালিকেরা বাস চালাতে অস্বীকৃতি জানাতেন, তখনো বিআরটিসির বাস চলত। সে সময় বিরোধী দল (আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি ও বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগ) ছিল মারমুখী ও বেপরোয়া। আর এখনকার বিরোধী দল একেবারে ‘নিরীহ’। আওয়ামী লীগের নেতাদের ভাষায় তাদের আন্দোলন করার মুরোদ নেই। ১৩ বছরে নাকি তারা ১৩ মিনিটের জন্যও রাজপথ দখলে রাখতে পারেনি। এই মুরোদহীন বিএনপি যেখানে সমাবেশ ডাকে, সেখানে বাস, ট্রেন, লঞ্চ বন্ধ রাখার কী যুক্তি থাকতে পারে? খেলা শুরুর আগেই কি আওয়ামী লীগ ভয় পেয়ে গেল? 

নেতারা (সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ই) কী বললেন, কার বিরুদ্ধে কে কত বড় হুংকার ছাড়লেন, সেসব নিয়ে সাধারণ মানুষের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। তাঁরা সভা-সমাবেশের ক্ষেত্রে সমতা দেখতে চান। আওয়ামী লীগের জন্য এক আইন আর বিএনপির জন্য আরেক আইন; সেটা হতে পারে না। বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগের সমাবেশ আটকাতে বাস-লঞ্চ চলাচল বন্ধ আর আওয়ামী লীগের আমলে বিএনপির সমাবেশ ঠেকাতে বাস-লঞ্চ বন্ধ থাকবে, এটি গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র হলো সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কথাটি বেশ চালু আছে। বিরোধী দলে থাকতে যারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে মরিয়া; ক্ষমতায় গিয়ে তারা সেসব বেমালুম ভুলে যায়। এ ক্ষেত্রে দুই দলই একে অপরের খারাপ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ নিয়ে কোনো কথা উঠলেই আওয়ামী লীগের নেতারা বিএনপির আমলের ফিরিস্তি তুলে ধরেন। এসব বলে বর্তমানের অন্যায্যতা জায়েজ করা যায় না।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের (২০১৮) ৩.১ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষা আইনের শাসনের মূল বক্তব্যই হচ্ছে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান; কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু সমাবেশের ক্ষেত্রে আইন সবাইকে সমান চোখে দেখছে না। যেখানে বিএনপি সমাবেশ ডাকছে, সেখানেই পরিবহনমালিকেরা ধর্মঘট ডাকছেন। আবার সমাবেশ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মঘট প্রত্যাহারও হয়ে যায়। কিছু মানুষকে কিছুদিনের জন্য বোকা বানানো যায়। কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনেরা সব সময় সব মানুষকে বোকা বানাতে চান।

গতকাল দুপুরে কথা হয় প্রথম আলোর ফরিদপুর প্রতিনিধি প্রবীর কান্তি বালার সঙ্গে। তিনি বিএনপির সমাবেশস্থলের বর্ণনা দিতে গিয়ে বললেন, বৃহস্পতিবার রাত থেকে সেখানে বিএনপির নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। স্থানীয় নেতারা আশপাশের বাড়ি থেকে রান্না করে নিয়ে তাঁদের খাওয়াচ্ছেন। অনেকে রাতে মাঠেই ঘুমিয়েছেন। অনেকে আশপাশের স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। ফরিদপুরের পাশের জেলা রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, মাদারীপুর, শরীয়তপুর থেকে আগেভাগেই মানুষ চলে এসেছেন। ফরিদপুরে বিএনপির গণসমাবেশ হচ্ছে মূল শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে কোমরপুর আবদুল আজিজ ইনস্টিটিউশন মাঠে। জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সমাবেশস্থলে পরিবেশ দেখতে কয়েকবার এসেছেন। বিএনপির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আশ্বস্ত করেছেন, সমাবেশ করতে কোনো সমস্যা হবে না।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কোন সমাবেশে কত লোক হবে, তা নিয়ে এখন বাহাস চলছে। এক দলের কোনো নেতা ১০ লাখ লোক জড়ো করার কথা বললে অন্য দলের নেতা ২০ লাখ লোক আনার ঘোষণা দেন।  নিজেদের জনপ্রিয়তা দেখাতে নেতারা এসব বলতেই পারেন। কিন্তু সমস্যা হয় যখন এক পক্ষ অন্য পক্ষকে রাস্তায় নামতে না দেওয়ার হুংকার ছাড়ে কিংবা অমুক তারিখ থেকে অমুকের কথায় দেশ চলবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। 

অনেকেই প্রশ্ন করেছেন, ১০ ডিসেম্বরের পর কী হবে? দেশে কি বড় ধরনের সংঘাত হবে? সংঘাত হলে ভঙ্গুর অর্থনীতি কি আরও ভঙ্গুর হবে? নিত্যপণ্যের দাম কি সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে যাবে না? অনেক দিন আগে বিএনপির এক নেতা বলেছেন, ১০ ডিসেম্বর থেকে খালেদা জিয়া দেশ চালাবেন। কিন্তু তিনি এর কোনো ব্যাখ্যা দেননি। এভাবে কি রাস্তায় দেশ চালানোর ঘোষণা দেওয়া যায়? আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, ডিসেম্বরে বিএনপিকে রাস্তায় নামতে দেওয়া হবে না। দেশটা তো কোনো দলের নয়। সবার। দুই দলের সমাবেশ, গণসমাবেশ, মহাসমাবেশের উপলক্ষ যা-ই হোক না কেন, লক্ষ্য একটাই—নির্বাচন। দুই দলের নেতাদের হুমকি জনমনে ভীতি সঞ্চার করে। নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা জাগায়।  

সরকারি ও বিরোধী দল বেশ কয়েকটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করেছে। আমরা আশা করব, ডিসেম্বর নাগাদ তারা যেসব কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, সেগুলোও শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে। প্রশ্ন হলো এরপর কী হবে? দুই দলই খেলার কথা বলছে। কিন্তু খেলার নিয়ম মানতে চাইছে না। একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করার মনমানসিকতা ও যোগ্যতা যাঁদের নেই, তাঁরা কীভাবে দেশ শাসনের যোগ্যতা অর্জন করবেন?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]