১০ ডিসেম্বর পল্টন, না সোহরাওয়ার্দী উদ্যান: নাগরিক বনাম রাষ্ট্রের তর্ক

ইতিহাসের চরিত্রেরাও ঘুরে ঘুরে আসে। আমাদের সাহিত্যেও পল্টন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান (রেসকোর্স ময়দান) এমনই চরিত্র। আমাদের প্রধান কবিদের সাহিত্যেই তা এসেছে।

‘শিল্পী, কবি, দেশি কি বিদেশি সাংবাদিক,/ খদ্দের, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী, সমাজসেবিকা, / নিপুণ ক্যামেরাম্যান, অধ্যাপক, গোয়েন্দা, কেরানি,/ সবাই এলেন ছুটে পল্টনের মাঠে, শুনবেন/ দুর্গত এলাকা প্রত্যাগত বৃদ্ধ মৌলানা ভাসানী/ কী বলেন।’—‘সফেদ পাঞ্জাবি’, শামসুর রাহমান।

‘এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,/ এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না।/. . . তাহলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে/ ঢেকে দেওয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?/. . . আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল এই ধু ধু মাঠের সবুজে।’—চরণগুলো ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ কবিতায় লিখেছেন নির্মলেন্দু গুণ।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্যসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী (এ্যানি) প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চায়নি। আমরা নয়াপল্টনের জন্য অনুমতি চেয়েছি।... আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে চাই। তাই নয়াপল্টনই চাই।’

ঐতিহাসিক পল্টন মাঠ এখন স্টেডিয়াম। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ বিশেষ নিরাপত্তা জোন, মুক্তাঙ্গনে মসজিদ ও গ্যারেজ। বিএনপি আর বামপন্থীদের অফিসগুলো পল্টনে হওয়ায় মাঝেমধ্যে পল্টন জেগে ওঠে। তাই জনসভাস্থল এখন মাঠ থেকে শাহবাগে ও শাপলায়। এ দেশে একদিন নির্বিঘ্ন প্রতিবাদ করার জন্যই ঠিক সচিবালয়ের পাশেই মুক্তাঙ্গন বানানো হয়েছিল। এখন সার্বভৌম নাগরিকদের সমবেত হতে হয় পুলিশের ইচ্ছায়। পল্টন বনাম সোহরাওয়ার্দীর তর্ক তাই নাগরিক বনাম রাষ্ট্রের তর্ক।

পল্টন-সোহরাওয়ার্দীর বিতর্কে পুলিশের কর্তারা ৩৭ অনুচ্ছেদের ১ম ও ২য় পঙ্‌ক্তির ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে’ শব্দাবলিকে ব্যবহার করেছেন। ৭২-এর গণপরিষদ বিতর্কে এমএন লারমা এটি বাদ দিতে বলেছিলেন। পুলিশের এই যুক্তি আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির বিষয় নয়। এটি নাগরিকতার লড়াই, রাষ্ট্র গঠনের তর্ক। রাজনীতিবিদদের সাবালকত্ব প্রমাণের প্রশ্ন।

একটি অনলাইন টক শোতে ‘অনুমতি দেওয়া হোক বা না হোক, বিএনপি জনসভা করলে তখন পুলিশ কী করবে’ প্রশ্ন করা হলে পুলিশের সাবেক আইজি সংবিধানের ৩৭ নম্বর অনুচ্ছেদ পাঠ করে বলেন, ‘আপনি যেখানে খুশি জনসভা করতে পারেন না। আমার কাছে সংবিধান আছে। সেখানে বলা আছে...। এই আইন পুলিশের। যে জায়গায় জনসভা করবেন, সেখানে পুলিশের অনুমতি লাগবে। সেখানে বাংলায় দাঁড়ায়, জনদুর্ভোগ ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলে পুলিশের বাধা দেওয়ার অধিকার আছে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকও একই কথা বলেছেন, ‘আমরা বিবেচনা করে দেখলাম যে পার্টি অফিসের সামনে সমাবেশের অনুমতি দিলে এবং সেখানে কয়েক লাখ লোক জমায়েত হলে, তা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যাবে।...এতে রাস্তাঘাট ব্লকড হবে। নগরবাসীর কষ্ট হবে।... এসব দিক চিন্তা করে আমরা বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ ওদিকে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে নেতাদের বলেছেন, বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বাইরে সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না।

শেষ পর্যন্ত ২৬ শর্তে বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। আর নয়াপল্টনে গণসমাবেশের সিদ্ধান্তে অনড় বিএনপি।

২.

‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’ অনুচ্ছেদ-৩৭।

‘৩৭ অনুচ্ছেদের ১ম ও ২য় পঙ্‌ক্তিতে অবস্থিত ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে’ শব্দাবলি বর্জন করা হোক।
... মাননীয় স্পিকার, এই সংশোধনীর ব্যাপারে বক্তব্য হলো, জনসমাবেশের মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে, আমি স্বীকার করি; কিন্তু এটা পড়ে যে ধারণা হয়, তাতে মনে হয়, এর আগে তথাকথিত পাকিস্তান সরকারের আমলে স্বেচ্ছাচারী আইয়ুবও এমনই অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু যারা জনগণের জন্য কথা বলতে গেল, তাদের জননিরাপত্তা আইনের বলে কারাগারের অভ্যন্তরে নিক্ষেপ করে, তাদের মৌলিক অধিকারকে তারা যেভাবে হরণ করেছিল, ঠিক সেইভাবে আজকের আইনেও জনগণের অধিকার খর্ব করা হবে।

যারা মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করেছিল, যারা জালিম পাকিস্তান সরকারকে উৎখাত করার জন্য সংগ্রাম করেছিল, যারা ২১শে ফেব্রুয়ারি দিবস পালন করতে গিয়ে রক্ত দিয়েছিল, আজ তাদের কথা স্মরণ করে আমি বলি, প্রস্তাবিত শব্দগুলি বর্জন করা হোক। ১৯৬২ সালের সংবিধানে যেভাবে এই অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, আপনারা এই সংবিধানেও সেই মৌলিক অধিকারটুকু আইনের বাধানিষেধের দ্বারা কেড়ে নেবেন না—এই অনুরোধ করছি।’ কথাগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম-১ আসনের স্বতন্ত্র গণপরিষদ সদস্য এম এন লারমা ১৯৭২ সালে বলেছিলেন।

উত্তরে গণপরিষদের আইন ও সংসদীয় বিষয়াবলি এবং সংবিধান প্রণয়নমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, ‘জনশৃঙ্খলা’ ও ‘জনস্বাস্থ্য’ নিশ্চয়ই যুক্তিসংগত এবং মাননীয় সদস্যের কাছে বিষয়টি এই বলে পরিষ্কার করে দিতে চাই যে, এখানে যে ‘যুক্তিসংগত’ শব্দটি আছে, তার অর্থ হচ্ছে, আদালত বিচার করে দেখবেন, এটা যুক্তিসঙ্গত হলো কি না। ...অতএব, মাননীয় সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কর্তৃক আনীত সংশোধনী গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় নয়।

তারপর স্পিকার গণপরিষদের সামনে ভোট দেন এবং যথারীতি এম এন লারমার সংশোধনী ‘না’ ভোটে বাতিল হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

৩.

৭২ সালে আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের উত্তরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছিলেন, ‘এই সংবিধানে এমন কোনো বিধান নাই যে সব সময় আওয়ামী লীগ সরকারই গদিতে বসবে। এমন সরকারও আসতে পারে, যারা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সম্পর্কে বর্তমান সরকারের সঙ্গে একমত নন।... অতীতের যে ইতিহাস আছে, তা থেকে জানি, এই জনশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে যেকোনো সরকার পার্লামেন্টে যেকোনো আইন পাস করিয়ে নিতে পারে।... সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মানুষের মতামত প্রকাশের অধিকার খর্ব করা যেতে পারে এবং এভাবে লাখো শহীদের রক্তের প্রতি অবমাননা হতে পারে।’

কথা হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হয়ে পুলিশের কর্তারা যা বুঝলেন, আমাদের আইনপ্রণেতা ও রাজনীতিবিদেরা তা কবে বুঝবেন? ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে বঙ্গবন্ধু মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে যে বক্তব্য রেখেছিলেন, একই সংশোধনী ৭২ সালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও এম এন লারমা করেছিলেন। কিন্তু ড. কামাল হোসেন সেদিন বলেছিলেন, ‘১৯৫৬ সালে যে পরিস্থিতি ছিল, তাতে বঙ্গবন্ধুর ওই রকম উক্তি উপযোগী হয়েছে। তখন ক্ষমতার খেলা চলছিল।’

আরও পড়ুন

আজ আবার সেই বিতর্ক ফিরে এসেছে। সময় যেন সেখানেই আটকে আছে। গণতন্ত্রের প্রাণ হচ্ছে জনগণের, ব্যক্তির সার্বভৌম অধিকার। গণতন্ত্রে রাষ্ট্র বা পার্টি সার্বভৌম নয়। রাষ্ট্র নাগরিকের অনুসারী, কর্তা না। সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক নাগরিক কোথায় সমবেত হবে, এটা তার ব্যাপার। এই নাগরিকেরা রাষ্ট্র বানায় তার সুবিধার জন্য। যে রাষ্ট্রে নাগরিকের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়, তা গণতান্ত্রিক না।

পল্টন-সোহরাওয়ার্দীর বিতর্কে পুলিশের কর্তারা ৩৭ অনুচ্ছেদের ১ম ও ২য় পঙ্‌ক্তির ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে’ শব্দাবলিকে ব্যবহার করেছেন। ৭২-এর গণপরিষদ বিতর্কে এমএন লারমা এটি বাদ দিতে বলেছিলেন। পুলিশের এই যুক্তি আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির বিষয় নয়। এটি নাগরিকতার লড়াই, রাষ্ট্র গঠনের তর্ক। রাজনীতিবিদদের সাবালকত্ব প্রমাণের প্রশ্ন।

নাহিদ হাসান: লেখক ও সংগঠক
[email protected]