সেই চনপাড়ায় ফারদিন কি স্বেচ্ছায় গিয়েছিলেন? না তাঁকে কোনো ফাঁদে ফেলে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? কে বা কারা তাঁর হত্যাকারী? কেন তাকে হত্যা করল?

কাজী নূর উদ্দিনের করা মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ৪ নভেম্বর বেলা তিনটার দিকে ফারদিন নূর ডেমরার কোনাপাড়া এলাকার বাসা থেকে বুয়েটের উদ্দেশে বের হন। পরদিন ৫ নভেম্বর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বাসায় ফিরে মায়ের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা ছিল তাঁর। পরবর্তী সময় তাঁরা (মা-বাবা) জানতে পারেন, ফারদিন নূর পরীক্ষায় অংশ নেননি এবং তাঁকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বুয়েটের শিক্ষক ও ফারদিনের সহপাঠীরা তাঁর মুঠোফোনে চেষ্টা করেও তাঁকে পাচ্ছেন না, তা বন্ধ পাওয়া যায়। বিষয়টি জানতে পেরে ৫ নভেম্বর বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁরাও (মা-বাবা) মুঠোফোনে কল করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ছেলের সন্ধান পাননি তাঁরা। এই মামলার ফারদিনের বান্ধবী আয়াতুল্লাহ বুশরাসহ কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, ফারদিন নূর হত্যাকাণ্ডে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের চনপাড়াকেন্দ্রিক অপরাধী চক্রের সদস্যরা জড়িত থাকতে পারেন, এমনটা ধরে নিয়ে তদন্ত চলছে। তবে এ মামলার তদন্ত ও ছায়া তদন্তের সঙ্গে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ফারদিন চনপাড়ায় খুন হয়েছেন, এখন পর্যন্ত এমন কোনো জোরালো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ফারদিন হত্যার তদন্ত বিষয়ে দুই সংস্থা দুই ধরনের কথা বলছে। মানুষ কোনটি বিশ্বাস করবে? ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা রক্ষায় সরকার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী দিয়ে থাকে। দেশের ১৭ কোটি মানুষকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা দেওয়ার চেয়েও জরুরি হলো, যাদের হাত থেকে রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থা, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। তাহলে ফারদিন–আবরার ও সনিদের বেঘোরে প্রাণ দিতে হতো না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, প্রযুক্তিগত তদন্তে মনে হচ্ছে, ফারদিনকে হত্যার পর চনপাড়াসংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। চনপাড়ার সঙ্গে ফারদিন হত্যার যোগসূত্র থাকতে পারে। ফারদিন হত্যায় এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই বলে গত রোববার প্রথম আলোকে জানান ডিবির খিলগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহিদুর রহমান।

ফারদিন নিহত হয়েছেন দুই সপ্তাহ হতে চলল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একেক সংস্থা একেক তথ্য দিচ্ছে। ফলে হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটিত না হয়ে আরও ধোঁয়াশা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমেও নানা রকম বিভ্রান্তিকর খবর আসছে। র‌্যাব কর্মকর্তাদের দাবি,  শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রায়হান গ্যাং ফারদিন হত্যার নেপথ্যে কাজ করেছে। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রায়হানসহ বেশ কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে তদন্তের দায়িত্বে নিয়োজিত ডিবি বলেছে, ফারদিন হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়নি। গত সোমবার নৌ পুলিশের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘ফারদিন হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত এমন কোনো অকাট্য প্রমাণসহ কোনো তথ্য আসেনি, যা আপনাদের জানানো যায়।’ ডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ফারদিন হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো বলা যাচ্ছে না, তদন্ত চলছে।

কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই লিখে দিয়েছে, ফারদিন মাদকসেবী ছিলেন। চনপাড়ায় মাদকসেবীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে খুন হতে পারেন তিনি। এই খবরে ফারদিনের মা–বাবা ভীষণ ব্যথিত। ফারদিন হত্যার বিচারের দাবিতে সোমবার বুয়েট শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করেন তাঁর সহপাঠীরা। সেই মানববন্ধনে যোগ দিয়ে কাজী নূর উদ্দীন বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো দিন সিগারেট পর্যন্ত খায়নি। যেই ছেলে একের পর এক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েছে, সে মাদকসেবী হতে পারে না।’ তিনি বলেন, এটি পরিকল্পিত হত্যা। এই হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন কঠিন হলেও তদন্তকারীদের প্রতি তাঁর আস্থা আছে। তারা ফারদিন হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটিত হবে। ফারদিনের বাবা কাজী নূর উদ্দীন কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন।

মা–বাবা ফারদিনকে আর ফিরে পাবেন না, কিন্তু তাঁর হত্যার বিচার হলে সেটিই তাঁদের জন্য একমাত্র সান্ত্বনা হবে।

আমাদের মেধাবী ছেলেরা কেন এভাবে হারিয়ে যায়? ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের একটি ছাত্রাবাসে নিহত হন আবরার ফাহাদ নামের আরেক শিক্ষার্থী। আবরার হত্যার দায়ে যাঁদের মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন হয়েছে, তাঁরা সবাই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী। এর আগে বিএনপির আমলে ২০০২ সালের জুনে ছাত্রদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত হন সাবিকুন্নাহার সনি। আবরার ও সনির হত্যার ঘটনা ছিল রাজনৈতিক। এর বিচারও হয়েছে। কিন্তু ফারদিন হত্যার বিচার হবে কি? বিচার হতে হলে আগে হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে হবে। অপরাধীদের চিহ্নিত করতে হবে।

নূর উদ্দীন তাঁর মামলার এজাহারে ফারদিনের বান্ধবী বুশরাকে আসামি করেছেন। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে ও  রিমান্ডেও নিয়েছে। কিন্তু কোনো সূত্রে ফারদিন হত্যার সঙ্গে বুশরার সম্পর্কের কথা জানা যায়নি। বন্ধুত্বের কারণেই কোনো মেয়েকে গ্রেপ্তার করার ঘটনা কেবল অস্বাভাবিক নয়, মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন।

মামলার বিষয়ে ফারদিনের বাবা বলেন, বুশরার সঙ্গে ফারদিন সব শেষে দেখা করেছেন। এ জন্য কাউকে হত্যা মামলার আসামি করা যায় কি না, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। ফারদিন হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও বিচার করলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

ফারদিন হত্যার তদন্ত বিষয়ে দুই সংস্থা দুই ধরনের কথা বলছে। মানুষ কোনটি বিশ্বাস করবে? ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা রক্ষায় সরকার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী দিয়ে থাকে। দেশের ১৭ কোটি মানুষকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। ভিভিআইপিদের নিরাপত্তা দেওয়ার চেয়েও জরুরি হলো, যাদের হাত থেকে রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থা, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। তাহলে ফারদিন–আবরার ও সনিদের বেঘোরে প্রাণ দিতে হতো না।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]