এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী। শতকরা হিসাবে ঝরে পড়ার হার ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। ১০ বছর স্কুলে পড়াশোনার পর পাবলিক পরীক্ষার এমন ফলাফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত করেছে। এই জাতীয় বিপর্যয়ের দায়ভার কেবল কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের কাঁধে চাপানোর সুযোগ নেই; বরং শিক্ষার্থী, পরিবার, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসন—সবাই এই ব্যর্থতার সমান অংশীদার।
এবারের ফলাফলে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো দুই দশকে সর্বনিম্ন পাসের হার এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর একসঙ্গে ঝরে পড়া। ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজনও পাস করতে না পারার পরিসংখ্যানটি রীতিমতো আতঙ্কের।
হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ন্যূনতম অধ্যবসায় না থাকাটা মূলত তদারকিহীনতা ও পেশাদারি দায়িত্বহীনতারই সম্মিলিত কুফল। অন্যদিকে ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার কারণে মানবিক বিভাগে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পরও লাখো শিক্ষার্থী যদি ভাষা ও গণিতের মতো মৌলিক দক্ষতায় দুর্বল থাকে, তবে নিছক দায় স্বীকার করে এ ব্যর্থতা ঢাকা যাবে না।
সামগ্রিক এই অধঃপতনের শিকড় আরও গভীরে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের ‘লার্নিং পভার্টি’ বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোনো ৫১ শতাংশ শিশুই বয়সোপযোগী সাধারণ পাঠ্য পড়ে বোঝার ন্যূনতম সক্ষমতা রাখে না। আমরা শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছি ঠিকই, কিন্তু গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারিনি। শিক্ষার্থী এক শ্রেণি থেকে আরেক শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে, সিলেবাস শেষ করেছে; কিন্তু তার প্রকৃত শিখনঘাটতি কোথায়, সে প্রশ্ন আড়ালেই থেকে গেছে।
প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ জন ডিউই বলেছিলেন, ‘আমরা যদি আজকের শিক্ষার্থীদের গতকালের নিয়মে শেখাই, তবে আমরা মূলত তাদের ভবিষ্যৎ চুরি করছি।’ আমাদের সেকেলে শিক্ষাব্যবস্থায় ঠিক এই ভবিষ্যৎ চুরির কাজটিই হচ্ছে। কারণ, বাস্তবমুখী জ্ঞানার্জনের বদলে পুরো ব্যবস্থাই হয়ে পড়েছে পরীক্ষামুখী। মূল্যায়নের মাপকাঠি হয়েছে কেবল মুখস্থবিদ্যা। অবহেলিত থেকে গেছে সমস্যা বিশ্লেষণ, যৌক্তিক চিন্তন ও বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগের মতো মৌলিক দক্ষতাগুলো।
এবারের সাত লাখ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি জ্বলন্ত সতর্কসংকেত। রাষ্ট্রের এখন মূল কাজ হওয়া উচিত এই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিকল্প কর্মমুখী পথে বা ইতিবাচক মোটিভেশনের মাধ্যমে জীবনের মূল ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা।
শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের এই কাঠামোগত দুর্বলতার সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে সামাজিক অবক্ষয়, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও পারিপার্শ্বিক অস্থিরতা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দায়বদ্ধতাও কোনো অংশে কম নয়; অনেকেই এই ট্রমাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলার পথ থেকে দূরে সরে গেছে।
এই ভঙ্গুর বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের দায়সারাভাবে ক্লাসরুমে ফেরালে চলবে না। তাদের পুনরায় শৃঙ্খলায় ফেরাতে সত্যিকার অর্থেই শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মুদ্রার উল্টো পিঠে রয়েছে শিক্ষকদের চরম হতাশা ও পেশাদারি চর্চার অভাব। শিক্ষা বাজেটের অপ্রতুলতা আর সীমাহীন বঞ্চনার কারণে বছরের পর বছর ধরে শিক্ষকদের মধ্যে পেশাগত দায়বদ্ধতা বা কমিটমেন্ট জন্ম নেয়নি। এই নৈতিক ও আবেগসংক্রান্ত শূন্যতায় শিক্ষাঙ্গনে তৈরি হয়েছে ফাঁকিজুঁকির এক ঘনঘোর অন্ধকার। তবে এই সংকটের জন্য বর্তমান সরকার বা শিক্ষামন্ত্রীকে এখনই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যৌক্তিক হবে না। তাঁরা দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র কয়েক মাস হলো। তাঁদের সদিচ্ছা ও সংস্কার-ভাবনাগুলো প্রস্ফুটিত হওয়ার জন্য সময় দেওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রকে আজ সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে, দীর্ঘদিনের এই বহুমুখী ব্যর্থতার অর্থনৈতিক ক্ষতি বা ‘ইকোনমিক লস’ আসলে কত বিশাল। প্রতিবছর শিক্ষার মূল স্রোত থেকে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ছিটকে পড়া দীর্ঘ মেয়াদে বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ক্ষতির সমতুল্য। এই ক্ষতি মোকাবিলা করতে ফিনল্যান্ডের মতো ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং চীনের মতো কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার বাস্তবমুখী সমন্বিত ব্যবস্থা আমাদের প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল সনদের কারখানা হবে, আর শিল্পপ্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মী খুঁজে পাবে না—এমন বিচ্ছিন্নতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এখন আমাদের নিজস্ব বাস্তবতার উপযোগী একটি কর্মমুখী শিক্ষা মডেল তৈরি করতে হবে।
আর এই মডেল বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত হলো পর্যাপ্ত অর্থায়ন। শিক্ষা খাতে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি বরাদ্দ দিয়ে বিশ্বমানের প্রজন্ম গড়া অসম্ভব। উন্নত রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যের সঙ্গে বরাদ্দের এই নিম্নমুখী চিত্র স্ববিরোধী। এই অপ্রতুল বাজেটে শিক্ষক উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও কর্মমুখী শিক্ষার কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রকে অনুধাবন করতে হবে যে শিক্ষায় ব্যয়ই মানবসম্পদ উন্নয়নের উৎকৃষ্টতম বিনিয়োগ।
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও চিন্তাবিদ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন যথার্থই বলেছিলেন, ‘জ্ঞানে বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি মুনাফা এনে দেয়।’ সড়ক বা সেতু রাষ্ট্রকে অবকাঠামোগত আধুনিকতা দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু একটি জাতির প্রকৃত মেরুদণ্ড শক্তিশালী হয় তার প্রত্যেক মানুষের জ্ঞান, দক্ষতা ও সৃজনশীলতায়।
এবারের সাত লাখ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি জ্বলন্ত সতর্কসংকেত। রাষ্ট্রের এখন মূল কাজ হওয়া উচিত এই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিকল্প কর্মমুখী পথে বা ইতিবাচক মোটিভেশনের মাধ্যমে জীবনের মূল ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা। এখনই এমন এক মানবিক ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো পাবলিক পরীক্ষাই একটি সম্ভাবনাময় তরুণের জীবনের শেষ দরজা হয়ে দাঁড়াবে না, বরং খুলে দেবে হাজারো নতুন জানালা।
অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফ মো. আব্দুল্লাহ একজন শিক্ষা ও শিল্প উদ্যোক্তা; ৩৪ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে শিক্ষকতা করছেন। বর্তমানে তিনি নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (এনইউবি) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।