গরু নিয়ে একই রাজনীতির দুই পিঠ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুভোজ’–এর জন্য সোয়া লাখ টাকায় গরু কেনা হয়ছবি: প্রথম আলো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী মন্দিরের কাছে একটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্না করা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ওই শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করা উপলক্ষে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করেছিলেন। মন্দিরের কাছে রান্না এবং চুলা তৈরিতে মন্দিরের ইট ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। আয়োজকেরা পরে ইট সরিয়ে নেন এবং অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির তাৎক্ষণিক সমাধানও হয়েছিল।

সেখানেই ঘটনাটির সমাপ্তি হতে পারত। কিন্তু সেটিকে ‘গরুর মাংস খাওয়ার অধিকার’-এর আন্দোলনে পরিণত করা হলো। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) বিক্ষোভ করে গরু জবাই ও ভোজের ঘোষণা দিল। প্রশাসন জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার কথা বলে ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিলেও পরে দুঃখ প্রকাশ করে অবস্থান বদলায়। শুক্রবার সেই ঘোষিত কর্মসূচি পালিত হয়।

আরও পড়ুন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল স্পষ্ট ও সমানভাবে প্রযোজ্য নিয়ম নির্ধারণ করা। ক্যাম্পাসে কোথায় পশু জবাই করা যাবে, কোথায় রান্না হবে, উপাসনাস্থলের পরিবেশ কীভাবে বজায় রাখা হবে—এসব আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যেত। কিন্তু অস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে পরে রাজনৈতিক চাপে পিছু হটা সবাইকে ভুল বার্তা দেয়: যুক্তির চেয়ে চাপ বেশি কার্যকর।

এরপর শনিবার আবার গরু জবাই, ভোজ ও কাওয়ালি অনুষ্ঠানের ঘোষণা এসেছে। তবে দ্বিতীয় আয়োজনটি জকসুর নয়; বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার। প্রক্টরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমে অনুমতি দিতে না চাইলেও সংগঠনটির একজন নেতা উপাচার্যকে ফোন করার পর শর্ত সাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অসহায়ত্ব বুঝতে এর চেয়ে বেশি কিছু লাগে না। যে নির্দেশনা নিজেরাই দিয়েছিল, সেটি কার্যকর করার বদলে চাপের মুখে তার ব্যাখ্যা বদলাতে হলো। তারপর রাজনৈতিক নেতার ফোনে মিলল আরেক আয়োজনের অনুমতি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ কথাটিই সার্থক করে তুলল!

আরও পড়ুন

২.

গরুর মাংস খাওয়ার স্বাধীনতা এবং মন্দিরের কাছে একটি আয়োজন নিয়ে আপত্তি—দুটি বিষয়কে এখানে এক করে দেওয়া হয়েছে। কেউ গরুর মাংস খান বলেই তিনি সাম্প্রদায়িক হয়ে যান না। আবার মন্দিরের কাছে রান্না নিয়ে আপত্তি জানালেই কেউ অন্যের খাবার খাওয়ার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চান, এমনটা বলা যায় না।

আপত্তির কারণ ও পরিস্থিতি বিবেচনা নিতে হবে। যাঁরা শুরুতে রান্না করেছিলেন, তাঁরা ভুল বুঝে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সেই সমাধান মেনে না নিয়ে বারবার গরু জবাইয়ের কর্মসূচি ঘোষণা করার প্রয়োজন হচ্ছে কেন? প্রশ্নটি তখন খাবারের মধ্যে থাকে না; কার ইচ্ছায় ক্যাম্পাস চলবে, সেই ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল স্পষ্ট ও সমানভাবে প্রযোজ্য নিয়ম নির্ধারণ করা। ক্যাম্পাসে কোথায় পশু জবাই করা যাবে, কোথায় রান্না হবে, উপাসনাস্থলের পরিবেশ কীভাবে বজায় রাখা হবে—এসব আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যেত। কিন্তু অস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে পরে রাজনৈতিক চাপে পিছু হটা সবাইকে ভুল বার্তা দেয়: যুক্তির চেয়ে চাপ বেশি কার্যকর।

৩.

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ‘জিয়াফত’ নাম দিয়ে গরু জবাইয়ের কর্মসূচি আমরা আগেও দেখেছি। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে এমন কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো বা প্রতিবাদের বদলে গরু জবাইকে সেখানে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পরিণত করা হয়। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়েও একই প্রবণতা দেখা গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে ‘বাকশাল’ নাম দেওয়া গরু জবাই করে ‘জুলাই জিয়াফত’ হয়েছে।

প্রতিটি গরু জবাইয়ের উদ্দেশ্য এক—এমনটা নয়। কিন্তু প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করে উত্তেজনার মধ্যে গরু জবাইকে রাজনৈতিক প্রতীক বানানোর প্রবণতাকে নিছক খাওয়াদাওয়া বা নিরীহ প্রতিবাদ বলার সুযোগও নেই। এতে বিদ্বেষ ও বিভক্তি তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়; খাবার তখন উপলক্ষ; আসল বিষয় ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রদর্শন।

সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক, সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানুষ পিটিয়ে হত্যা এবং দুর্গাপূজার সময় একের পর এক গরু জবাইয়ের কর্মসূচি—এ ঘটনাগুলো একই রকম নয়, দায়ী ব্যক্তিরাও একই নন। কিন্তু এ ঘটনাগুলোর মধ্যে যে মিল লক্ষণীয় তা হলো: আমাদের সামাজিক–রাজনৈতিক মূল্যবোধ খুব দ্রুত পাল্টাচ্ছে, অসহিষ্ণুতা বাড়ছে এবং ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যসহ সহাবস্থানের যে সংস্কৃতি ছিল, তা দারুণভাবে সংকুচিত হচ্ছে।

৪.

কয়েক বছর আগে কলকাতায় প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ বামপন্থী নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। একজন ব্রাক্ষণের গরুর মাংস খাওয়ার ঘটনাটি সেখানে বিতর্কের ঝড় তুলেছিল। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য পরে একাধিকবার বলেছেন, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সংখ্যালঘু মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এটা ছিল একটি প্রতিবাদী কর্মসূচি। হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে তাঁর এই প্রতিবাদকে ‘সাহসী’ ও ‘প্রথাবিরোধী’ না বলে উপায় নেই।

কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি তো ভারতের ঠিক উল্টো। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। বাজারে-সুপার শপে দেদার গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যানটিনে প্রতিদিন গরুর মাংস খাওয়া হচ্ছে। গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে কোথাও কোনো বাধা নেই; অল্প যেটুকু সংবেদনশীলতা আছে, সেটা অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি একধরনের সম্মান বা সহনশীলতা থেকে তৈরি হয়েছে। সংখ্যালঘুদের প্রতি সহনশীলতার ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এই পার্থক্যটুকু ছিল।

নিজের ফেসবুক পেজে গরুভোজের ঘোষণা দিয়েছিলেন সালাউদ্দিন আম্মার
ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু আমাদের দেশের কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে এই সহনশীলতা বা বিবেচনাবোধটুকুই মুছে দিতে চাইছে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসকে ‘বিপন্ন অধিকার’ হিসেবে হাজির করছে। তারপর সেই কাল্পনিক বিপদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করছে।

এই অর্থে ভারতের ‘গোরক্ষকদের’ রাজনীতির উল্টো পিঠ হয়ে উঠছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশ্যে গরু জবাইকারীরা। ভারতে গোরক্ষকেরা গরুর মাংস খেতে বাধা দেয়, আর বাংলাদেশে এই গরু জবাইকারীরা বিশেষ পরিস্থিতিতে গরু খাওয়ার প্রদর্শনী করে। কাজের ধরন বিপরীত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় আবেগ দিয়ে সংখ্যালঘুকে চাপে রাখার রাজনৈতিক কৌশলে দারুণ মিল দেখা যাচ্ছে।

৫.

নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু সেই বিশ্বাস দিয়ে অন্যের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার খর্ব করা যায় না। কেউ যদি ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতির সত্যিকারের বিরোধী হন, তাহলে তাঁকে বাংলাদেশে একই ধরনের রাজনীতিরও বিরোধিতা করতে হবে। সীমান্তের ওপারের সংখ্যালঘুদের জন্য সমান অধিকার চাইব, আর নিজের দেশের সংখ্যালঘুদের অস্বস্তিতে ও চাপে রাখব—এটা খুবই স্ববিরোধী ও অসৎ অবস্থান।

সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক, সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানুষ পিটিয়ে হত্যা এবং দুর্গাপূজার সময় একের পর এক গরু জবাইয়ের কর্মসূচি—এ ঘটনাগুলো একই রকম নয়, দায়ী ব্যক্তিরাও একই নন। কিন্তু এ ঘটনাগুলোর মধ্যে যে মিল লক্ষণীয় তা হলো: আমাদের সামাজিক–রাজনৈতিক মূল্যবোধ খুব দ্রুত পাল্টাচ্ছে, অসহিষ্ণুতা বাড়ছে এবং ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যসহ সহাবস্থানের যে সংস্কৃতি ছিল, তা দারুণভাবে সংকুচিত হচ্ছে।

  • মনজুরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
    *মতামত লেখকের নিজস্ব