খালেদা জিয়ার অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার ও সামনের পথ

খালেদা জিয়া

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছরে রাষ্ট্র নির্মাণ, রাজনৈতিক রূপান্তর ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নানা অধ্যায় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই সময়পর্বে দেশ একাধিক রাজনৈতিক মোড় অতিক্রম করেছে, এর প্রতিটিই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। সেই দীর্ঘ ইতিহাসের ভেতর বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকাল একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে।

প্রথমত, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকাল এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে বাজারভিত্তিক, রপ্তানিনির্ভর উন্নয়ন মডেলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এটি কেবল নীতিগত পরিবর্তনের সময় ছিল না। বরং এটি ছিল রাষ্ট্র, বাজার ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এই বাস্তবতায় খালেদা জিয়ার অর্থনৈতিক ভূমিকা মূল্যায়ন করতে হলে তাকে বৃহত্তর জাতীয় বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখতে হয় এবং দেখতে হয় একটি চলমান রূপান্তরের অংশ হিসেবে।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয়ত, ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার সময় বাংলাদেশ সদ্য সামরিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে এসেছে। অর্থনীতি তখনো ছিল সীমিত উৎপাদনক্ষমতা, দুর্বল রাজস্বকাঠামো ও নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির ভারে জর্জরিত। এই বাস্তবতায় খালেদা জিয়ার সরকার একটি ভিন্ন পথ বেছে নেয়, যেখানে ব্যক্তি খাতকে উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি কোনো হঠাৎ রূপান্তর ছিল না, বরং ধাপে ধাপে এগোনোর একটি প্রক্রিয়া। বাজারের ভূমিকা বাড়ানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং রাষ্ট্রকে সরাসরি নিয়ন্ত্রকের বদলে সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল এর মূল দর্শন। এই সময় থেকেই বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি দৃশ্যমান হতে শুরু করে।

অনেক ইতিবাচক অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিমালা এবং সংস্কার খালেদা জিয়ার অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার। তাঁর শাসনামলে গৃহীত নীতিগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করেছে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক হলো তৈরি পোশাকশিল্পের উত্থান। যদিও এ শিল্পের সূচনা হয়েছিল আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে, তবে নব্বইয়ের দশকে এসে এটি কাঠামোগত সহায়তা পায়। সরকারের পক্ষ থেকে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি, নগদ প্রণোদনা এবং বাণিজ্যিক সহজীকরণমূলক নীতির মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের কার্যকর সহায়তা দেওয়া হয়।

এই নীতিগুলো কোনো উচ্চাভিলাষী শিল্প কৌশল ছিল না, বরং বাস্তব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান। এর ফলে বাংলাদেশ দ্রুত বৈশ্বিক পোশাক সরবরাহ শৃঙ্খলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। এই সাফল্য পরবর্তী দশকগুলোতেও দেশের প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হয়ে থাকে।

চতুর্থত, খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ১৯৯১ সালের ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন আইন প্রণয়ন। এটি ছিল বাংলাদেশের করব্যবস্থায় একটি মৌলিক রূপান্তর। সীমিত ও অকার্যকর করকাঠামোর পরিবর্তে একটি আধুনিক, বিস্তৃত ভিত্তির রাজস্বব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়াস নেওয়া হয়। যদিও বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল এবং পরবর্তী সময়ে সংস্কারের প্রয়োজন হয়েছে, তবু এই উদ্যোগ রাজস্ব প্রশাসনের ভিত্তি শক্ত করেছে। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য এই ধরনের কাঠামোগত সংস্কার ছিল অপরিহার্য।

পঞ্চমত, খালেদা জিয়ার শাসনামলে বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। ১৯৯৪ সালে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট কনভার্টিবিলিটি চালু হয়, যা আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে তোলে। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে বাংলাদেশ ভাসমান বিনিময় হার ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। এটি বৈদেশিক বাণিজ্য ও মুদ্রানীতিতে নমনীয়তা আনে এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগকে আরও কার্যকর করে তোলে।

আরও পড়ুন

ষষ্ঠত, আর্থিক খাত সংস্কার ছিল এই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু জটিল অধ্যায়। ব্যাংক কোম্পানি আইন (১৯৯১) এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন (১৯৯৩) প্রণয়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকাঠামো জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় আর্থিক খাত সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়।

এই সংস্কারগুলোর উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো, ঋণশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং তদারকি শক্তিশালী করা। যদিও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পুরোপুরি অর্জিত হয়নি, তবু এ সময়েই কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি হয়। পুঁজিবাজারের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়তে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) গঠনও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক পদক্ষেপ, যা পুঁজিবাজার উন্নয়নের কাঠামোগত ভিত্তি তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সপ্তমত, এই সময়কালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায়। নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। অবশ্য এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই অর্জন কোনো একক সরকারের নয়, বরং এটি ধারাবাহিক নীতির ফল। তবে খালেদা জিয়ার সময়কার নীতিগত স্থিতিশীলতা এই প্রক্রিয়াকে গতিশীল করেছে।

অষ্টমত, অর্থনীতির বাইরে সামাজিক নীতির ক্ষেত্রেও খালেদা জিয়ার শাসনামল গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্যোগের জন্য স্মরণীয়। তাঁর সময়ে নারীশিক্ষা বিস্তারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি ও শিক্ষা অব্যাহত রাখার নীতির ফলে বিদ্যালয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।

দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে গ্রামীণ কর্মসংস্থান, খাদ্যনিরাপত্তা ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচির পরিসর সম্প্রসারিত হয়। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা জোরদার করার চেষ্টা করা হয়। এসব উদ্যোগ সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি শক্ত করতে ভূমিকা রাখে।

এ রকম অনেক ইতিবাচক অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতিমালা এবং সংস্কার খালেদা জিয়ার অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার। তাঁর শাসনামলে গৃহীত নীতিগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করেছে। যদিও এসব উদ্যোগ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবায়নগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল, তবু এগুলো বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

আজকের বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা এখনো কাটেনি। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল প্রয়োগব্যবস্থা সংস্কারের গতি ব্যাহত করেছে। এসব সমস্যা কাঠামোগত এবং দীর্ঘমেয়াদি। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সংস্কার কেবল নীতিনির্ধারণের বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়।

  • ফাহমিদা খাতুন নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ

    *মতামত লেখকের নিজস্ব