গণভোট: স্পষ্ট অবস্থানই গণতন্ত্রের দাবি

গণতন্ত্রে অর্থবহ বিতর্কের জন্য স্পষ্ট অবস্থান অপরিহার্য কেন, তা নিয়ে লিখেছেন ইমরান এ সিদ্দিক

বাংলাদেশে আসন্ন জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট ঘিরে যে আলোচনা চলছে, তা সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনার বদলে এখন প্রশ্ন উঠছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি এই সনদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে পারে? অনেকের মতে, নিরপেক্ষ থাকার স্বার্থে সরকারের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলা উচিত নয়। কিন্তু এই যুক্তি গণতন্ত্রের মূল চেতনা এবং বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও বাস্তবতাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। একটি দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় সংবিধান–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রাক্কালে সরকারের নীরবতা কাম্য নয়; বরং স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতার সঙ্গে জনগণের সামনে সরকারের অবস্থান তুলে ধরাটাই ন্যায়সংগত ।

জুলাই সনদ নিয়ে এই গণভোট কোনো সাধারণ মতামত জরিপ নয়; এটি সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বিষয়ে জনগণের অভিমত গ্রহণের একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা এবং সংবিধানকে আরও কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলা।

আরও পড়ুন
জুলাই সনদের গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে, আমরা কি আবার স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি নেব, নাকি একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক সুরক্ষা গড়ে তুলব? এই সনদকে সমর্থন করা মানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করা নয়।

এই গণভোটের মাধ্যমে জনগণই চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাঁরা এসব সংস্কার গ্রহণ করবেন কি না। জনগণ যদি প্রত্যাখ্যান করেন, সেই রায়ই মান্য হবে। তাই সংস্কারের পক্ষে সরকারের অবস্থান নেওয়া জনগণের মতামতে হস্তক্ষেপ নয়; বরং জনগণের সামনে নিজের প্রস্তাব তুলে ধরে তার গণতান্ত্রিক বৈধতা যাচাই করার একটি স্বচ্ছ উপায়। গণতন্ত্র তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন সরকার নিজের প্রস্তাবের দায় এড়িয়ে যায়।

অনেকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে এক করে দেখছেন, কিন্তু এই তুলনা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই সরকার কোনো স্বাভাবিক সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা থেকে আসেনি; এটি জন্ম নিয়েছে একটি গণ–অভ্যুত্থান থেকে, যা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যানের ফল। এই সরকারের ক্ষমতার উৎস ১৯৭২ সালের সংবিধানের কোনো বিধান নয়; বরং জনগণের গাঠনিক ক্ষমতা। বিষয়টি ২০২৫ সালের জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশেও পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

আদেশের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এটি জারি করা হয়েছে, ‘ছাত্র-জনতার সফল গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে।’ অতএব, জুলাই সনদ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াই অন্তর্বর্তী সরকারের সেই জনম্যান্ডেটের প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ। এই পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কারের প্রশ্নে সরকার নিরপেক্ষ থাকবে—এমন প্রত্যাশা করাটাই বিরাট ভুল।

অনেকে মনে করেন, সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কথা বলা মানে ভোটারদের স্বাধীনতাকে খর্ব করা। কিন্তু এখানে ‘প্রভাব’ আর ‘হস্তক্ষেপ’-এর পার্থক্যটি পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। এই সনদের পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নাগরিকদের বাধ্য করা হচ্ছে না। রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের সবাই স্বাধীনভাবে এর বিপক্ষে প্রচারণা চালাতে পারছে। গোপন ব্যালটের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করে যে ভোটাররা চাইলে নিশ্চিন্তে ‘না’ ভোট দিতে পারেন। ফলে সরকার কোনো এক পক্ষ নিলেই গণভোটের ফল নির্ধারিত হয়ে যায়, এমনটি নয়।

তা ছাড়া সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেই নাগরিকেরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে অক্ষম হয়ে পড়বে এবং চোখ বুজে সরকারের অবস্থান গ্রহণ করবে, এই ধারণা আসলে স্বৈরাচারী মানসিকতার প্রতিফলন। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নাগরিকেরা সরকারসহ সব পক্ষের যুক্তি বিচার-বিশ্লেষণ করবে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করবে, এটাই কাম্য।

বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে গণভোটের সময় সরকার নিজস্ব অবস্থান প্রকাশ ও তার পক্ষে প্রচারণা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রণীত গভর্নমেন্ট স্পিচ ডকট্রিন অনুযায়ী, সরকার তার নীতিগত অবস্থান প্রকাশ ও প্রচার করতে পারে এবং প্রয়োজনে সরকারি তহবিলও ব্যবহার করতে পারে—যতক্ষণ পর্যন্ত বিরোধী মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সরকার যখন কোনো কর্মসূচি পরিচালনা বা অর্থায়ন করে, তখন সে কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও বার্তা জনগণের সামনে তুলে ধরার অধিকার সরকারের রয়েছে।

ইউরোপের ভেনিস কমিশনের সংবিধানবিষয়ক গণভোট নির্দেশনাতেও একই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। সেখানে সরকারকে অতিরিক্ত বা একতরফা প্রচারণা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হলেও, গণভোটের প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার ব্যাপারে সরকারকে বিরত করা হয়নি। এখানে মূল দাবি নীরবতা নয়, বরং সংযম ও ন্যায্যতা।

আয়ারল্যান্ডের সুপ্রিম কোর্ট গণভোটের প্রচারণায় সরকারি অর্থ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও, সেটি সে দেশের নিজস্ব সংবিধান ও গণভোট-সংক্রান্ত আইনি কাঠামোর ফল। এটি কোনো সর্বজনীন গণতান্ত্রিক নীতি নয়। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বহু গণতান্ত্রিক দেশে গণভোটে সরকারের সীমিত পরিসরের প্রচারণা অনুমোদিত।

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূতকরণ নিয়ে জনগণের গভীর অনাস্থা রয়েছে এবং অতীতের সাংবিধানিক অপব্যবহারের স্মৃতি এখনো তাজা। এই বাস্তবতায় সংস্কার প্রশ্নে নীরব থাকা সংযমের পরিচয় নয়; বরং তা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ারই নামান্তর।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতিমধ্যেই একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করেছে এবং তাদের প্রস্তাবনা জনসমক্ষে তুলে ধরেছে। এই অবস্থায় সেই প্রস্তাবগুলোর ব্যাখ্যা ও পক্ষে অবস্থান নিতে অস্বীকার করা মানে গণতান্ত্রিক আলোচনা ও অংশগ্রহণের ক্ষেত্রকে দুর্বল করে দেওয়া। ইতিহাসও তা–ই দেখায়; মিসর, তিউনিসিয়াসহ বহু দেশে বিপ্লব-পরবর্তী উত্তরণকালীন সরকারগুলো সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে এবং সেগুলো জনগণের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, জুলাই সনদের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি করছে না; বরং এগুলোর লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা, প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য আরও সুদৃঢ় করা। নাগরিকদের জানার পূর্ণ অধিকার আছে—সরকার কেন এসব সংস্কারকে প্রয়োজনীয় মনে করছে, কেন সেগুলো বাস্তবায়ন করা উচিত এবং বাস্তবায়িত না হলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গণতন্ত্রে অর্থবহ বিতর্কের জন্য স্পষ্ট অবস্থান অপরিহার্য। মাঝামাঝি অবস্থানে দাঁড়িয়ে নীরব থাকলে কোনো সমস্যারই সমাধান হয় না।

জুলাই সনদের গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছে, আমরা কি আবার স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি নেব, নাকি একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক সুরক্ষা গড়ে তুলব? এই সনদকে সমর্থন করা মানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করা নয়। এর অর্থ হলো, সংস্কার ও পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়ানো। এই অবস্থান স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কেবল গণতান্ত্রিক অধিকারই নয়; বরং একটি নৈতিক দায়িত্বও। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকবে জনগণের হাতে—যেমনটি প্রকৃত গণতন্ত্রে হওয়া উচিত।

  • ইমরান সিদ্দিক সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন

  • মতামত লেখকের নিজস্ব