জরিপ ও পোস্টাল ব্যালট বিতর্ক: মূল প্রশ্নটা আস্থার

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে একুশে টেলিভিশনের ‘একুশে রাত’ টক শোতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব অধ্যক্ষ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ দাবি করেছেন, নির্বাচন জরিপকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মাঠে নামার আগে নাকি জামায়াতের নেতারা ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের ফোন করে বলেন, ‘মোড়ে মোড়ে লোক রেডি করে রাখেন’, যেন জরিপকারীরা এলে লোক দেখিয়ে ভোটের প্রবণতা বোঝানো যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই দাবি যাচাই করতে পারিনি; তবে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্য হওয়ায় বিষয়টি জন–আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

এই বক্তব্য ও প্রবাসী পোস্টাল ব্যালট নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক—দুটি ঘটনা আলাদা হলেও সমাজ-মনস্তত্ত্বে প্রশ্নটা এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়, ভোটের আগে জরিপ এবং ভোটের দিন ব্যালট—এই দুটিই কীভাবে জনমনে আস্থা তৈরি করে, আবার কীভাবে আস্থাকে নীরবে ভেঙে দেয়?

জরিপ: নিরপেক্ষ সংখ্যা নয়

অনেকেই মনে করেন, জরিপ মানেই কয়েকটি প্রশ্ন ও কিছু সংখ্যার বৈজ্ঞানিক হিসাব; কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতিতে জরিপ অনেক সময় শুধু জনমত বোঝার মাধ্যম নয়, এটি জনমত গঠনের কৌশলও হয়ে ওঠে। অর্থাৎ জরিপ ভোটারের পছন্দ মাপার পাশাপাশি ভোটারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

নির্বাচনী জরিপে সবচেয়ে আলোচিত দুটি প্রভাব হলো ‘ব্যান্ডওয়াগন’ ও ‘আন্ডারডগ’ প্রভাব। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গবেষণা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের (সেইজ) এনসাইক্লোপিডিয়া অব সার্ভে রিসার্চ মেথডস–এ মাইকেল ট্রগট দেখিয়েছেন, জরিপ প্রকাশের পর অনেক ভোটার সম্ভাব্য বিজয়ী পক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যাকে ব্যান্ডওয়াগন প্রভাব বলা হয়। এতে ‘জিতছে যে, তার পাশেই থাকা নিরাপদ’—এই মানসিকতা কাজ করে। অন্যদিকে কিছু ভোটার পিছিয়ে থাকা পক্ষের প্রতি সহানুভূতি থেকে তাঁদের সমর্থন করতে আগ্রহী হয়, এটাই আন্ডারডগ প্রভাব। এখানে যুক্তি হয়, ‘ওরা দুর্বল—ওদেরও সুযোগ দরকার।’

আরও পড়ুন

ট্রগটের বিশ্লেষণে মূলকথা হলো জরিপ প্রকাশিত হলে ভোটাররা সেটিকে সামাজিক সংকেত (সোশ্যাল সিগন্যাল) হিসেবে দেখেন, যা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এখানেই জরিপের রাজনৈতিক ক্ষমতা তৈরি হয়। এটি ফল আগেভাগে ঠিক করে না; কিন্তু কে জিতবে’ এই ধারণাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

ফলে জরিপ তিনভাবে নির্বাচনী ফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে; ১. এগিয়ে থাকা পক্ষকে ঘিরে ‘জয়ের আবহ’ তৈরি করা, ২. পিছিয়ে থাকা পক্ষকে ‘বঞ্চিত’ হিসেবে তুলে ধরে সহানুভূতি জাগানো, ৩. আদর্শভিত্তিক ভোটকে সরিয়ে কৌশলী ভোটে (স্ট্র্যাটেজিক ভোট) ঠেলে দেওয়া।

এ কারণে নির্বাচনের সময় জরিপ শুধু সংখ্যা নয়, এটি হয়ে ওঠে মানুষের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করার একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার। এখন প্রশ্ন হলো, যদি কোনো দল বা পক্ষ জরিপকে প্রভাবিত করতে চায়, তাহলে তারা কীভাবে আগেভাগেই মানুষকে ‘রেডি’ করে রাখে? এটা সম্ভব হয় জরিপের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গায় হাত দিয়ে, যেটি হলো স্যাম্পলিং (কাকে জিজ্ঞাসা করা হলো)।

আরও পড়ুন

জরিপে দেখা যেতে পারে ১০০ জনকে প্রশ্ন করা হয়েছে; কিন্তু যদি সেই ১০০ জনের বড় অংশ আগে থেকেই ‘প্রস্তুত’ থাকে বা নির্দিষ্ট দলীয় বলয়ের মানুষ হয়, তাহলে জরিপের ফল আর সমাজের গড় মতামত প্রতিফলিত করে না। তখন ফল দাঁড়ায় স্টেজড রেসপন্স অর্থাৎ সাজানো উত্তর, যেখানে মানুষ বাস্তবতা বলছে না; বরং একটি ‘দেখানো বাস্তবতা’ হাজির করছে।

অনেক দেশে জরিপকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে ‘পুশ পোলিং’–এ জরিপের নামে মূল উদ্দেশ্য মানুষের মতামত ‘মাপা’ নয়; বরং ‘বদলানো’। গবেষণা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা একে নেতিবাচক প্রচারণার একটি কৌশল হিসেবেও দেখেন।

সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন দেশের ভেতরে ব্যবহৃত পোস্টাল ব্যালটের নকশা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন পোস্টাল ব্যালটে নির্দিষ্ট আসনের প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক আরও স্পষ্টভাবে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে জরিপের ফল, মিডিয়ার ফ্রেমিং এবং শেষ সময়ের প্রচারণা মিলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে ভোটার শুধু পছন্দ অনুযায়ী নয়, ‘কে জিততে যাচ্ছে’ এই ধারণাকেও গুরুত্ব দেয়। এতে অনেক সময় স্ট্র্যাটেজিক ভোটিং বাড়ে, নিজের প্রথম পছন্দ বাদ দিয়ে ‘জেতার সম্ভাবনা আছে’ এমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া।

অন্যদিকে ভারতে গুজব, ভুল তথ্য ও ডিজিটাল প্রচারণা নির্বাচনী জনমতকে অনেক ক্ষেত্রে ‘হাইজ্যাক’ করে ফেলে। আল–জাজিরা জার্নালিজম রিভিউর ‘ইলেকশনস অ্যান্ড মিসইনফরমেশন ইন্ডিয়া কেস স্টাডি’ (৩০ এপ্রিল ২০২৪) রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালের নির্বাচনে অনলাইনের ভুল তথ্য শুধু মত গঠন করেনি, কিছু ক্ষেত্রে সহিংসতাও উসকে দিয়েছে; হোয়াটস্যাপ রাজনৈতিক মিথ্যাচার ছড়ানোর বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

এই বাস্তবতায় মানুষ জরিপকেও আর নিরপেক্ষ তথ্য হিসেবে দেখে না; অনেকের কাছে জরিপ হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অস্ত্র।

প্রবাসী পোস্টাল ভোট বিতর্ক

প্রথম আলো (৬ জানুয়ারি ২০২৬)-তে প্রকাশিত নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ১৫ লাখ ২৭ হাজার পোস্টাল ভোটার অনুমোদন পেয়েছেন, এর মধ্যে প্রবাসী ভোটার ৭ লাখ ৬০ হাজারের কিছু বেশি। অর্থাৎ বড় একটি অংশ প্রবাসে; বাকিরা দেশের ভেতরে।

দেশের ভেতরের পোস্টাল ভোটারের বড় অংশ সাধারণ ভোটার নয়; বরং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা/সেবা বাহিনী—যাঁরা দায়িত্বের কারণে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন না।

নির্বাচন কমিশনের ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপটি মূলত ভোটার নিবন্ধন ও ব্যালট ট্র্যাকিংয়ের জন্য। তবে ভোট দেওয়া এখনো ম্যানুয়াল পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে হয়, অর্থাৎ ব্যালট বিদেশে ডাকযোগে যায়, ভোট দিয়ে সেটি আবার ডাকযোগে বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্মকর্তার কাছে ফেরত পাঠাতে হয়।

এখানে ডিজিটাল ট্র্যাকিং একটি শক্তি হলেও বাস্তবে পুরো ব্যবস্থার বড় অংশ নির্ভর করছে ঠিকানা, ডাকব্যবস্থা, সময়মতো পৌঁছানো এবং মধ্যবর্তী নিয়ন্ত্রণের ওপর। ফলে এটি প্রযুক্তির চেয়ে বেশি আস্থার পরীক্ষা।

আরও পড়ুন

এই ব্যবস্থায় নিরাপত্তা হিসেবে রয়েছে ফেশিয়াল ভেরিফিকেশন এবং পোস্টাল খামের ওপর ইউনিক নম্বর/স্ক্যানিং; কিন্তু ভোটার কেবল ‘ওকে/ম্যাচ’ দেখে জানতে পারেন না, এর অনুমোদনের লগ কোথায়, অডিট রিপোর্ট কোথায়, ডেটা নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, ভুল হলে আপিল/যাচাইয়ের পথ কী। এ কারণে আস্থার সংকট শুধু প্রযুক্তিগত নয়—এটি নৈতিক ও প্রক্রিয়াগতও।

এ ছাড়া ফেস রিকগনিশন থাকলেও স্পুফিং (ছবি, ভিডিও, মাস্ক দিয়ে ফাঁকি) ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ নিয়ে ইউরোপিয়ান কমিশন জেআরসির (বিজ্ঞান ও জ্ঞান পরিষেবা নিয়ে যৌথ গবেষণা সংস্থা) টেকনিক্যাল রিপোর্ট ‘বায়োমেট্রিক স্পুফিং: আ জেআরসি কেস স্টাডি ইন থ্রিডি ফেস রিকগনিশন’ এবং তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক ম্যাগাজিন ওয়্যার্ড-এর রিপোর্টে দেখা গেছে, ফেশিয়াল ভেরিফিকেশন থাকলেই কারচুপির ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না; স্পুফিং বা প্রেজেন্টেশন অ্যাটাকের বাস্তব আশঙ্কা থেকেই যায়।

এই পোস্টাল ভোটব্যবস্থায় সবচেয়ে কম আলোচিত কিন্তু বড় ঝুঁকি হলো ব্যালট পেপারের নকশা। সাম্প্রতিক বিতর্কে প্রতীক/ঘরের অবস্থান নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক ব্রেনান সেন্টারের রিপোর্ট ‘ডিজাইন ডেফিসিয়েন্সিস অ্যান্ড লস্ট ভোটস’ দেখায়—নকশার কারণে ওভারভোট (একাধিক প্রার্থীকে ভোট) হয়ে বহু ভোট গণনায় আসে না।

এ ছাড়া ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের (ইউসিএস) রিপোর্ট ‘ইকুইটেবল ব্যালট ডিজাইন অ্যান্ড ভোটার এডুকেশন ম্যাটেরিয়ালস’–এ বলা হয়েছে, খারাপ ব্যালট ডিজাইনে বিপুল ভোট ‘গো কাউন্টেড’ হয় না। অস্পষ্ট ডিজাইনের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয় সাধারণ ভোটারের। ব্যালটে ওপরে/ডানে থাকা ঘরে চোখ আগে পড়ে। বিশেষ করে কম শিক্ষিত বা বয়স্ক ভোটার অসাবধানতায় ভুল ঘরে সিল দিতে পারেন।

ব্রেনান সেন্টার; হ্যানমার ও সহলেখকেরা রেসিডুয়াল ভোট (আন্ডারভোট/ওভারভোট) গবেষণা দেখান, অনেক সময় ভোট হারানোর কারণ ভোটারের ভুল নয়; বরং নকশা ও ব্যবস্থার ত্রুটি। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ‘বাটারফ্লাই ব্যালট’ ডিজাইন ভোটারদের বিভ্রান্ত করেছিল, এটি নির্বাচনকে আদালত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয় নকশার ভুল ছোট নয়; এটি ইতিহাস বদলে দিতে পারে।

সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন দেশের ভেতরে ব্যবহৃত পোস্টাল ব্যালটের নকশা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন পোস্টাল ব্যালটে নির্দিষ্ট আসনের প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক আরও স্পষ্টভাবে থাকে।

সব মিলিয়ে সামনে যে পরীক্ষাটি সবচেয়ে বড়, তা ‘কারা জিতবে’ সেই বিষয় নয়; বরং ভোটের প্রতি জনগণের ভরসা টিকবে কি না। কারণ, একবার যদি মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে জরিপ দিয়ে ‘মন বানানো’ হয়, আর ব্যালট দিয়ে ‘ফল বানানো’ হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি নির্বাচনের ক্ষতি নয়; সেটি পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে।

  • মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

    *মতামত লেখকের নিজস্ব