প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ২৭৩ জন আসামি কনডেমড সেলে অন্তরিন আছেন। একইভাবে বিভিন্ন মামলায় মিলিয়ে এ ধরনের আসামির সংখ্যা ২ হাজার ৭০৭। এই অপেক্ষাটা বিচার আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পর হাইকোর্ট বিভাগ মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণ বা আপিল নিষ্পত্তির জন্য ঘটছে। উল্লেখ্য, হত্যা বা নারী ও শিশু নির্যাতনের কিছু কারণে দায়রা জজ পর্যায়ে বিচারকাজ চলে। দোষী সাব্যস্ত হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয় মৃত্যুদণ্ড।
দায়রা আদালতে বিচারকাজেও দীর্ঘসূত্রতা চলে। তেমনি অতিবিলম্বিত হয় কিছু তদন্তকাজও। তবে বিবেচ্য আলোচনাটি শুধু কনডেমড সেলে অন্তরিনদের নিয়ে সীমিত থাকবে।
আলোচিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৫ সালে যৌতুক না পেয়ে এক কিশোরীকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ১৩ বছর পর ২০১৮ সালে বিচার আদালতে স্বামী জাফরসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগে দণ্ড নিশ্চিত কিংবা আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখনো আদেশ কার্যকর হয়নি। এই সাজাপ্রাপ্তদের ব্যবস্থাপনা কারাকর্মীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও বিড়ম্বনাকর। তাঁরা, কারা নিয়মকানুন পালনে প্রায়ই অনীহা দেখান। ফাঁসির দণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন কারাবাসে তাঁদের বেপরোয়া হওয়া স্বাভাবিক।
এমনটা আমি লক্ষ করেছি ডিসি থাকার সময়। সে সময় কারাগারে নৈমিত্তিক পরিদর্শনের সময়ে কোনো কোনো আসামি তাঁদের গুলি করে মেরে ফেলতেও অনুরোধ করতেন। কেউবা গালমন্দ করতেন।
পল্লবীর শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যায় ঢাকায় এমনকি সারা দেশে একটি আলোড়নের সৃষ্টি হয়। সরকারপ্রধান তাঁর একাধিক সহকর্মীসহ সেই শিশুর বাড়িতে গিয়ে পিতামাতাকে সান্ত্বনা ও দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। এর ফলে অকল্পনীয় দ্রুতগতিতে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। তেমনি একই গতিতে শেষ হয় বিচারকাজও। উভয় আসামি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। সেই দণ্ড কার্যকর করতে হলে নিশ্চিত করতে হবে হাইকোর্ট বিভাগকে।
এ বিষয়ে বহু বছরের জট খুলতে অ্যাটর্নি জেনারেল প্রকাশ্য আদালতে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করেন। প্রশংসনীয়ভাবে গঠিত হয় একটি বিশেষ বেঞ্চ। এ বেঞ্চটি শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলার দণ্ডিতদের রেফারেন্স ও আপিল নিষ্পত্তি করবে। এ ধরনের মামলায় এর মাঝেই ২৭৩ জন আসামি কনডেমড সেলে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার সংখ্যা কত তা জানা যায়নি। তেমনি মামলার সংখ্যা জানা যায়নি সব মামলায় কনডেমড সেলে অন্তরিনদেরও। ধারণা করা হয় কয়েক শ মামলা হতে পারে।
জানা যায়, দায়রা জজ কর্তৃক দণ্ডাদেশ দেওয়ার পর হাইকোর্ট বিভাগ রেফারেন্স পেয়ে মামলার প্রাসঙ্গিক সব রেকর্ডপত্র ছাপা ও বাঁধাই করে পেপারবুক তৈরি করতে হয়।
এ ধরনের পেপারবুক তৈরিতেও সময়ক্ষেপণের অভিযোগ রয়েছে। এখনকার বিরাজমান পরিপ্রেক্ষিতে কম্পিউটার কম্পোজ করতে জানা হাজার হাজার জনবল বেসরকারি সেক্টরে কর্মরত রয়েছেন। হাইকোর্ট বিভাগে পেপারবুক তৈরির নিজস্ব ব্যবস্থাপনা না থাকলে সরকারি মুদ্রণালয়ের একটি অংশকে শুধু এ ধরনের কাজের জন্য চিহ্নিত করা যায়। প্রয়োজনে নিয়োগ দেওয়া যায় অতিরিক্ত জনবল।
কাজগুলো নির্ভুলভাবে করতে হবে, এটা সত্য। হয়তো এসব কাজের জন্য গভীর মনোনিবেশ কিংবা দুই বা তিন স্তরে তদারকির প্রয়োজন হতে পারে। তবে এর জন্য বছরের পর বছর সময় লাগবে এমন হওয়ার কথা নয়। পেপারবুক তৈরির কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করলে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারের জন্য অপেক্ষাকাল কমে আসার কথা। পাশাপাশি এতসব জটবাঁধা মামলা রাতারাতি নিষ্পত্তি হবে এমনটাও আমরা আশা করি না।
ন্যায়বিচারের স্বার্থে আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ থাকা দরকার। তেমনি গভীর মনোনিবেশের সুযোগ থাকা দরকার সংশ্লিষ্ট বিচারক ও আইনজীবীদের।
পেপারবুক তৈরি হলেও মামলা নিষ্পত্তিতে অখণ্ড মনোযোগসম্পন্ন হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ আবশ্যক। নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলায় প্রাণদণ্ডে দণ্ডিতদের এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠন করা প্রশংসনীয়।
ডেথ সেলে অন্তরিন মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত কোন কোন ব্যক্তির দণ্ড অপেক্ষমাণ, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। হাইকোর্ট বিভাগ বা আপিল বিভাগে ভিন্ন আদেশও হতে পারে। কেউবা মুক্তি পেতে পারেন। কারও দণ্ডাদেশ হ্রাস করাও হয়। সে ক্ষেত্রে এসব ব্যক্তিকে ডেথ সেলের নরক যন্ত্রণায় দীর্ঘদিন রেখে আমরা তো অন্যায়ই করে চলছি। আমরা দ্রুত বিচার চাই। তবে চাই না কোনো সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়া।
তবে দেখতে হবে এসবের জন্য শুধু একটি বেঞ্চ যথেষ্ট কি না। এটা সবার জানা যে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা বহুবিধ মামলার শুনানি গ্রহণ ও আদেশ দানে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকেন। শুধু ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের জন্য বেশ কয়েকটি বেঞ্চ গঠন করা সম্ভবত এখনকার সময়ের দাবি।
বিদ্যমান বিচারকদের মধ্য থেকে আরও কয়েকটি এ ধরনের বেঞ্চ গঠনের বিষয়েও বিবেচনা করা যেতে পারে। তেমনি প্রয়োজনে আরও কয়েকজন বিচারক নিয়োগ দিয়েও এমনটা করা যায়। সরকারি আইন কর্মকর্তার সংখ্যাও প্রয়োজনে বৃদ্ধি করতে হবে। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত এ ধরনের আসামির সংখ্যাই এখন ২ হাজার ৭০৭। এর সঙ্গে ক্রমান্বয়ে আরও নতুন নতুন মামলায় দণ্ডিতদের রেফারেন্স ও আপিল আসতে থাকবে।
এ অবস্থায় পুরো বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রী অ্যাটর্নি জেনারেলসহ আলোচনা করতে পারেন। প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্ট বারের নেতাদের আলোচনায় আহ্বান জানানো যায়। এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে পুরো বিষয়টি সম্পর্কে বক্তব্য ও আবেদন পেশ করতে হবে।
শুধু বিচার নয়, দ্রুত বিচার সবাই চায়। আর এসব ক্ষেত্রে বছরের পর বছর বিচার বিলম্বিত হয়ে এর চেতনাই লুপ্ত হতে বসেছে। বিচারপ্রার্থীরাও হতাশ। অপরাধী চক্র হয়তোবা উৎফুল্ল। দ্রুত বিচার না করার ফলে আমাদের স্মৃতিতে থাকা কয়েকটি মামলায় বিচার আদালতে দণ্ডিত আসামিরা দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছে।
উল্লেখ করতে হয় ২০০৭ থেকে ২০০৯ সময়কালে রসু খাঁ নামের এক ব্যক্তি একের পর এক নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে কুখ্যাতি লাভ করেন। স্বীকারোক্তি অনুসারে তিনি ১১ জন নারীকে ধর্ষণ ও খুন করেন। দুটো হত্যাকাণ্ডে তাঁকে ২০০৮ ও ২০১৮ সালে বিচার আদালত প্রাণদণ্ডের আদেশ দেন। তিনি এখনো কারা অভ্যন্তরে আছেন।
নারায়ণগঞ্জে ২০১৪ সালে কয়েকজন র্যাব সদস্য দিবালোকে ৭ জন ব্যক্তিকে অপহরণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে হত্যা করে তাঁদের লাশ নদীতে ফেলে দেন। ২০১৭ সালে বিচার আদালত এ ধরনের ২৬ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সে আদেশের ভাগ্যও আজ অবধি অনিশ্চিত। ২০২০ সালে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কে সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজরকে চেকপোস্টে কর্মরত পুলিশ অফিসার বিনা প্ররোচনায় গুলি করেন। স্থানীয় ওসি এসে তাঁর গলায় পা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। ২০২৪ সালে কক্সবাজারের দায়রা জজ এ দুজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
জানা গেছে, হাইকোর্ট বিভাগে দণ্ডটি নিশ্চিত হয়েছে। এখন হয়তোবা অন্য কোনো স্তরে চলছে সময়ক্ষেপণ। বিষয়গুলো অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় অনুসন্ধান করে দেখতে পারে।
ডেথ সেলে অন্তরিন মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত কোন কোন ব্যক্তির দণ্ড অপেক্ষমাণ, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। হাইকোর্ট বিভাগ বা আপিল বিভাগে ভিন্ন আদেশও হতে পারে। কেউবা মুক্তি পেতে পারেন। কারও দণ্ডাদেশ হ্রাস করাও হয়। সে ক্ষেত্রে এসব ব্যক্তিকে ডেথ সেলের নরক যন্ত্রণায় দীর্ঘদিন রেখে আমরা তো অন্যায়ই করে চলছি। আমরা দ্রুত বিচার চাই। তবে চাই না কোনো সংক্ষিপ্ত প্রক্রিয়া।
মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে অতি অবশ্যই সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত বিষয়গুলো খুঁটিয়ে দেখা দরকার। আমরা তাড়াহুড়া চাই না, আবার দীর্ঘ কালক্ষেপণও চাই না। আপিল বিভাগের রিভিশন পর্যায়েও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তি খালাস পেয়েছেন। সেখান থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন, এমন নজিরও আছে। চুলচেরা বিশ্লেষণ হোক এমনটাই আমরা চাই। ঠিক তেমনি অপরাধীদের সাজা প্রদান প্রক্রিয়া কোনো না কোনো কারণে যেন থেমে না থাকে, সেটাও চাই।
পল্লবীর শিশুটি প্রাণ দিয়ে আমাদের বিচারব্যবস্থার অর্গল নতুনভাবে উন্মুক্ত করবে, সে আশা আমরা করতেই পারি।
আলী ইমাম মজুমদার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
*মতামত লেখকের নিজস্ব
majumderali 1950 @gmail.com
