প্রতিবছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের অর্জিত অগ্রগতি এবং নারীদের জীবনকে এখনো বাধাগ্রস্ত করে রাখা প্রতিবন্ধকতাগুলো নিয়ে ভাবনার সুযোগ করে দেয়। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের জন্য জাতিসংঘের নির্ধারিত প্রতিপাদ্য—‘অধিকার। ন্যায়বিচার। কর্মতৎপরতা। সকল নারী ও কন্যাশিশুর জন্য’—কাঠামোগত বাধাগুলো ভেঙে ফেলা, আইনি সুরক্ষা জোরদার করা এবং বিশ্বজুড়ে লিঙ্গসমতার জন্য দায়বদ্ধতা বৃদ্ধির আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশে এটি এমন সব নারীদের নিয়ে ভাবারও এক উপলক্ষ যাঁরা ক্ষমতায়নসংক্রান্ত আলোচনায় অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যান: বিধবা, বয়স্ক মা এবং প্রতিবন্ধী নারী, যাঁদের জীবন জনপরিসরের বিতর্কের বাইরে নিভৃতে অতিবাহিত হয়। গত বছরের শেষের দিকে খালেদা জিয়ার প্রয়াণ এই উপেক্ষিত জীবনগুলো নিয়ে চিন্তা করার একটি মর্মস্পর্শী পটভূমি তৈরি করে দিয়েছে।
অনেক সাধারণ নারীর কাছে খালেদা জিয়ার পাবলিক লাইফ বা জনজীবন বাংলাদেশের এক গভীর সামাজিক পরিবর্তনের সময়পর্বের সঙ্গে মিলে যায়। তাঁর রাজনৈতিক বছরগুলো উপবৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষাকে স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল, যা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল। একই সময়ে হাজার হাজার আলিয়া মাদ্রাসা সহ-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়, যা মেয়েদের সেই ধর্মীয় শিক্ষার আঙিনায় নিয়ে আসে, যেখানে তারা দীর্ঘকাল ধরে বর্জিত ছিল। এটি সেই যুগ ছিল যখন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয় এবং লাখ লাখ তরুণী শ্রমিককে ঘরের বাইরে পারিশ্রমিকের কাজে টেনে আনে।
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া পুরুষশাসিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি প্রতীকী ভাঙনের রূপকার ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা এক প্রজন্ম—বিশেষ করে যারা মাধ্যমিক স্কুল উপবৃত্তি থেকে উপকৃত হয়েছিল—তাদের কাছে ক্ষমতার শীর্ষে তাঁর উপস্থিতি এই ধারণাটিকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করেছিল যে রাজনীতিও নারীদের জন্য একটি ক্ষেত্র হতে পারে।
তবু এই পরিবর্তন ছিল অসম। খালেদা জিয়ার নিজস্ব প্রজন্মের নারীদের জন্য এই পরিবর্তনগুলো অনেক দেরিতে এসেছিল। তাঁদের অনেকেই গৃহিণী, বিধবা বা সেবাদানকারী হিসেবে থেকে গেছেন—ইতিহাসের অংশ হয়েও তাঁরা সরাসরি এর সুবিধাভোগী হতে পারেননি। তাহলে তাঁরা তাঁকে কীভাবে স্মরণ করবেন?
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের একটি বৈপরীত্য হলো আদর্শিক বিভাজন থাকা সত্ত্বেও জোট গঠনের ক্ষমতা। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দেন এবং জোটকে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। জামায়াত ১৭টি আসনে জয়লাভ করে সরকারে যোগ দেয়। কিন্তু এই অংশীদারত্বে একটি দৃশ্যমান বৈপরীত্য ছিল: জোটের নেতৃত্বে ছিলেন একজন নারী প্রধানমন্ত্রী, যেখানে অন্যতম প্রধান শরিক দল এমন এক আদর্শ অনুসরণ করে, যা তাদের নিজস্ব দলে নারী নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমির শফিকুর রহমান আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে তাঁর মতে ধর্মীয় নীতিমালা এবং জৈবিক পার্থক্যের কারণে নারী নেতৃত্ব দলের শীর্ষ পদের জন্য অনুপযুক্ত। দলটির একটি সক্রিয় মহিলা শাখা রয়েছে এবং নারী ভোটারদের মধ্যে তাদের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে, তবু নারীদের দলের সর্বোচ্চ পদ ‘আমির’ হওয়া থেকে বারিত রাখা হয়েছে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে সিপিডি এবং ব্লাস্ট আয়োজিত এক নাগরিক ফোরামে আমি একজন আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলাম। সেখানে নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী অঙ্গীকার নিয়ে আলোচনা চলাকালে জেন্ডার অ্যাডভোকেটরা জামায়াতের অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর মহিলা শাখার নেত্রী, পেশায় একজন ডাক্তার, তাঁর অবস্থানে অনড় ছিলেন। ধর্মীয় কারণ দর্শিয়ে দলের এই নীতিকেই সমর্থন করেন যে তাঁদের দলীয় মতাদর্শ অনুযায়ী একজন নারী কেবল ‘আমির’ পদের জন্যই অনুপযুক্ত নন, বরং জাতীয় পর্যায়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্যও তিনি যোগ্য নন।
এই বৈপরীত্য আজ বাংলাদেশের সামনে এক বৃহত্তর চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় রাজনীতি সংজ্ঞায়িত হয়েছে দুই নারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে—খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। সেই যুগের অবসান ঘটেছে। ১৯৯১ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশ নিজেকে এমন এক রাজনৈতিক পটভূমিতে ফিরে পেতে দেখছে, যা প্রায় পুরোপুরি পুরুষ নেতৃত্বের আধিপত্যে চলে গেছে।
আম্মাকে যা সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল, তা খালেদা জিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং তাঁর উত্থান: ১৯৮৩ সালে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর কীভাবে একজন বিধবা কোটি কোটি মানুষের দেশ শাসন করতে এলেন। আম্মা মনে করেন, ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ানোই ছিল খালেদা জিয়ার শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক মুহূর্ত।
তবে রাজনৈতিক এই সমীকরণের বাইরেও একটি নিভৃত জনগোষ্ঠী রয়েছে—খালেদা জিয়ার নিজস্ব প্রজন্মের নারীরা। আমার মা সেই প্রজন্মের। তিনি খালেদা জিয়ার চেয়ে সামান্য ছোট। তিনি কখনোই ঘরের বাইরে কাজ করেননি। খালেদা জিয়ার মতো তাঁকে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সইতে হয়নি, কিন্তু তাঁর মতোই তিনিও একজন বিধবা।
এক বছর ধরে আম্মা প্রায় পুরোপুরি একটি বেডরুমের চারদেয়ালে বসবাস করছেন। বাড়িতে থাকাকালে প্রথম আলো তাঁর নিত্যসঙ্গী। খালেদা জিয়ার জানাজার দিন সকালে প্রথম আলোর বিশেষ ক্রোড়পত্রটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যায় আমার মনে হলো যে আমার মা ও খালেদা জিয়া একই বার্ধক্যগ্রস্ত নারী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত—যাঁদের কাছে বাইরের পৃথিবী এখন সংবাদপত্রের পাতা বা টেলিভিশনের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে পৌঁছায়।
খালেদা জিয়ার কোন বিষয়টি সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে? আমি আম্মাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি দ্বিধাহীনভাবে উত্তর দিলেন—তিনি অন্তত ‘ভোটচোর ছিলেন না।’ খালেদা জিয়ার শুরুর দিকের স্মৃতি নিয়ে প্রশ্ন করলে আম্মা স্মরণ করেন কীভাবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর স্ত্রীকে জনজীবন থেকে দূরে রাখতেন। আম্মা বললেন, ‘রাজনীতি তখন তাঁর জগৎ ছিল না।’ আম্মা সত্তরের দশকের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সিলেট সফরের কথা মনে করলেন, যখন আমার বাবা সেখানকার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন; তখন খালেদা জিয়াকে তাঁর সঙ্গে পাবলিকলি খুব কমই দেখা যেত।
আম্মাকে যা সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল, তা খালেদা জিয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়, বরং তাঁর উত্থান: ১৯৮৩ সালে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর কীভাবে একজন বিধবা কোটি কোটি মানুষের দেশ শাসন করতে এলেন। আম্মা মনে করেন, ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ানোই ছিল খালেদা জিয়ার শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক মুহূর্ত।
ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা বলার সময় আম্মার কণ্ঠস্বর বদলে গেল—বিশেষ করে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকালমৃত্যু এবং তাঁর জানাজায় শেখ হাসিনার উপস্থিত হতে চাওয়া নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছিল। যখন আমি তারেক রহমানের কথা জিজ্ঞেস করলাম, আম্মা ধীরে মাথা নাড়লেন: ‘তাঁর আরও আগেই ঢাকা ফেরা উচিত ছিল।’
সেই বাক্যটি আমার মনে গেঁথে গেল। শেষ দশকের বেশির ভাগ সময় খালেদা জিয়া তাঁর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কাটিয়েছেন। যখন শেষ পর্যন্ত তাঁদের দেখা হলো, তখন তিনি লাইফ সাপোর্টে। সেই পরিসমাপ্তির নিষ্ঠুরতা বোঝার জন্য দলকানা হওয়ার প্রয়োজন নেই।
তবে এই গল্প কেবল খালেদা জিয়াকে নিয়ে নয়। এটি দূরত্ব এবং হারিয়ে যাওয়া সময় নিয়ে। এটি সেসব বাবা-মাকে নিয়ে যাঁরা বাংলাদেশে থেকে গেছেন আর তাঁদের সন্তানেরা বিদেশে জীবন গড়েছে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ অনেক বেশি সচল, কিন্তু এই গতিশীলতা এক নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে: বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা তাঁদের শেষ জীবন একাকিত্বে কাটাচ্ছেন—আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন।
খালেদা জিয়ার গল্পটি তাঁর প্রজন্মের বিধবা এবং ফেলে আসা বৃদ্ধ বাবা-মায়েদের কাছে ক্ষমতার মহাকাব্য হিসেবে নয়, বরং ধৈর্য, বিচ্ছেদ এবং অসমাপ্ত কথোপকথনের এক স্মারক হিসেবে টিকে থাকবে। খালেদা জিয়ার জীবন এবং তাঁর শেষ অধ্যায়ের একাকিত্ব—আমাদের বয়স্ক বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়ার বিষয়ে নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করুক: তাঁদের পাশে আরও কিছুক্ষণ বসতে এবং তাঁদের কথা শুনতে।
এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ একজন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটি এবং থাইল্যান্ডের চুলালংকর্ন ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং প্রফেসর। তিনি লিঙ্গ অর্থনীতিবিষয়ক একাডেমিক জার্নাল ‘ফেমিনিস্ট ইকোনমিকস’-এর উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য।
ই-মেইল: [email protected]