ঢাকা-৮ আসনের বয়সে তরুণ এক এমপি প্রার্থী ওই আসনের ভোটারদের মুখোমুখি হয়েছেন। একটি নবীন দলের মনোনয়ন পাওয়া ওই প্রার্থী, তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজন এবং সাধারণ ভোটাররা জটলার মতো করে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন।
প্রার্থীর সঙ্গে একজন ভোটারের আলাপ হচ্ছে। উৎসুক লোকেরা তাঁদের কথা শুনছেন। কেউ কেউ মুঠোফোনে আলাপটি ভিডিও করছেন। প্রার্থী এবং ভোটার দুজনেরই গায়ে পাঞ্জাবি। মাথায় টুপি।
একই আসনে একটি বড় দলের টিকিট নিয়ে অন্য একজন প্রভাবশালী নেতা নির্বাচন করছেন। সেই নেতার লোকজনের কারণে এলাকার লোক কতটা অতিষ্ঠ, তাই নিয়ে দুজনের কথা হচ্ছে।
ভোটার বলছিলেন, বড় দলটির প্রভাবশালী ওই নেতার অনুসারীরা সমানে দুর্নীতি-চাঁদাবাজি করে যাচ্ছেন।
নবীন দলের তরুণ প্রার্থী বললেন, ‘তাঁর (প্রতিপক্ষ প্রার্থীর) লোকজন এসব করছেন, তাহলে উনি এত ভদ্র সাজেন কেন?’
তখন ভোটার তাঁকে যথেষ্ট শ্লেষ মেশানো গলায় খোঁচা মেরে বললেন, ‘ভদ্র মানে, আমার আপনার মতো ভদ্র। আমি আপনি ভদ্র না! এই যে আপনি নির্বাচনের কারণে টুপি পরছেন, এত দিন কিন্তু আপনার মাথায় টুপি ছিল না! এখন আপনার মাথায় টুপি।’
ভোটার মুখের ওপর এমন কথা বলবেন, তা তরুণ প্রার্থীটি আশা করেননি। তিনি থতমত খেলেন, তারপর বেশ জোরের সঙ্গে বললেন, ‘দ্যাখেন, আমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করছি...।’
ভোটার বললেন, ‘আপনি মাদ্রাসায় পড়ছেন, আমি কিন্তু মাদ্রাসায় পড়ি নাই। আমি জেনারেল লাইনে পড়ছি।’
ভোটারের দীর্ঘ শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখের অনুযোগমিশ্রিত অভিব্যক্তি যেন অব্যক্ত ভাষায় প্রার্থীকে বলল, ‘আমি জেনারেল লাইনে পড়েও ভোটের জন্য মাথায় টুপি দিইনি, আমি আগে থেকেই টুপি পরি।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভোটার ও প্রার্থীর এই কথোপকথনের ভিডিওটি ভাইরাল হলেও ভোটের আগে প্রার্থীর পোশাক–পরিচ্ছদে আঁতকা পরিবর্তন আসাটা নতুন কিছু না। ভোটের সময় পুরুষ প্রার্থীর মাথায় টুপি ও নারী প্রার্থীর মাথায় হিজাব পরার ঐতিহ্য অতি সাধারণ। টুপি-পাঞ্জাবি পরে তোলা ছবিসহ পোস্টার সাঁটানো পুরোনো রেওয়াজ।
ভোটের পর যথারীতি নেতাদের বেশির ভাগেরই আগের ‘চেহারা-সুরতে’ ফিরে যাওয়ার ঘটনাও নতুন কিছু না। কারণ, এই দেশে নির্বাচন মানে শুধু ভোট না, এটি আসলে একধরনের বাস্তব জীবন-নাটকের ‘সামাজিক রিহার্সাল’। এখানে ভোট এলে রাজনীতিবিদ আর শুধু নাগরিক প্রতিনিধির ভূমিকায় থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন অভিনেতা।
যে মানুষটিকে বছরের পর বছর ধর্মচর্চা নিয়ে উদাসীন ও নির্বিকার থাকতে দেখা যায়, ভোটের মঞ্চে উঠে সেই তাঁকেই হঠাৎ পোশাকে-আশাকে ‘ধার্মিক’ হয়ে উঠতে দেখা যায়; ঠিক যেমন নাটকের পর্দা উঠলে যাত্রাদলের অভিনেতারা কস্টিউম পরে ‘রাজা’ বা ‘সন্ন্যাসী’ হয়ে যান।
ভোটের আগে রাজনীতিকদের এই পোশাক পরিবর্তনে ধর্ম আর বিশ্বাসের প্রকাশ থাকে না, তা হয়ে ওঠে কৌশলের উপাদান। ধর্ম এখানে নৈতিক অনুশীলন থাকে না, তা হয়ে ওঠে ভোটের ভাষা। এই ভাষা দিয়ে ভোটারকে বলা হয়, ‘আমি তোমাদেরই লোক।’
২.
সাধারণ মানুষ বাস্তবতাকে সরাসরি যতটা না বোঝেন, তার চেয়ে বেশি বোঝেন প্রতীক, মিথ ও চিহ্নের মধ্য দিয়ে।
ধর্মীয় পোশাক (টুপি, হিজাব, গেরুয়া বসন, ক্রস, তিলক) কিংবা প্রতীক (চাঁদ-তারা, ক্রস, ত্রিশূল) ব্যক্তি বা দলের সম্পর্কে তিনটি বার্তা একসঙ্গে দেয়—১. নৈতিক শুদ্ধতা (‘আমি ধার্মিক, আমাকে বিশ্বাস করো’) ২. পরিচয়ের নিশ্চয়তা (‘আমি তোমাদেরই লোক’) ৩. অতীতের সংযোগ (‘আমি তোমাদেরই ইতিহাস ও বিশ্বাস বহন করি’)।
এই ধর্মীয় চিহ্ন বা সংকেত ব্যবহারের মনস্তত্ত্ব খুব সরল। প্রার্থী জানেন, ভোটার যুক্তির চেয়ে পরিচয়ে বেশি সাড়া দেন। তাই তিনি নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করতে চান আচরণ দিয়ে নয়, চিহ্ন দিয়ে। তিনি টুপি, দাড়ি, নামাজ, ধর্মীয় শব্দ—এসব অনুষঙ্গকে সংকেত হিসেবে ব্যবহার করেন।
এই ধর্মীয় পোশাক ও চিহ্ন যুক্তির চেয়ে আবেগের ওপর বেশি তাড়াতাড়ি কাজ করে। ভোটার যখন জটিল অর্থনীতি বোঝেন না, দীর্ঘ নীতিনথি পড়েন না কিংবা রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে ভাবার সময় পান না, তখন তিনি সহজ প্রশ্নে আশ্রয় নেন: ‘এই লোকটা কি আমার মতো?’ বা ‘লোকটা কি আমার ধর্ম-সংস্কৃতির লোক?’
ভোটার যাতে শর্টকাটে বুঝতে পারেন, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, সে জন্যই এই চিহ্ন-প্রতীকের আশ্রয় নেওয়া হয়। রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় কগনিটিভ শর্টকাট।
এই পরিচয়গুলো টেকসই নয়, কিন্তু কার্যকর। এগুলো টেকসই বিশ্বাস তৈরি করে না, বিভ্রম তৈরি করে।
অনেক সময় ভোটার বুঝে যান, প্রার্থীর এই টুপি পরার মধ্যে কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক দায় নেই, আছে কেবল ভোট হাতিয়ে নেওয়ার মতলব। তখন তিনি বিরক্ত হয়ে বলে ফেলেন, ‘এই যে আপনি নির্বাচনের কারণে টুপি পরছেন, এত দিন কিন্তু আপনার মাথায় টুপি ছিল না!’
প্রার্থী তখন অস্বস্তিতে পড়েন। কারণ, এতে তাঁর সাজানো পরিচয় প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। তখন তিনি খেপে গিয়ে বলেন, ‘আমি মাদ্রাসায় পড়েছি।’
তাঁর এই বক্তব্য আসলে আত্মপরিচয়ের ঘোষণা নয়, এটি আত্মরক্ষার চেষ্টা। যেন বলা হচ্ছে, ‘আমি এই পোশাক পরার অধিকার রাখি।’ কিন্তু ভোটার ততক্ষণে বুঝে গেছেন, অধিকার আর আন্তরিক অভ্যাস এক জিনিস নয়।
ভোটার তখন বুঝে যান, এই টুপি বিশ্বাসের নয়, এই নামাজ আত্মা পরিশুদ্ধির নয়, এই জান্নাতের প্রতিশ্রুতির পেছনে আছে ক্ষমতার উদগ্র বাসনা। নির্বাচন তখন আর যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া থাকে না, এটি হয়ে ওঠে সমষ্টিগত আত্মপ্রতারণার উৎসব।
প্রার্থী যখন ‘আমি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছি’ বলে পরিচয়ের অস্ত্র বের করেন, তখন ভোটারের জবাব হয় আরও নির্মম। ভোটার তখন জবাব দেন, ‘আমি মাদ্রাসায় পড়িনি, তবু আগে থেকেই টুপি পরি।’ এটি তাঁর নিঃশব্দ কিন্তু তীব্র প্রতিক্রিয়া। তিনি জানিয়ে দেন, তিনি মাদ্রাসায় পড়েননি, তবু আগে থেকেই টুপি পরেন। অর্থাৎ তাঁর টুপি পরার ইচ্ছা নির্বাচনের হাওয়া দেখে জাগ্রত হয় না।
ভোটারের এই প্রতিক্রিয়াকে শুধু প্রত্যাখ্যান বলা যায় না। একই সঙ্গে তা প্রতারণামূলক ভোট কৌশলের বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী দার্শনিক রায়।
আমরা নির্বাচনের আগে টুপি ও হিজাব পরার এবং ভোটের পর তা খুলে ফেলার অসংখ্য ঘটনা দেখেছি। অনেক নেতাকে তাঁর মার্কায় ভোট দিলে জান্নাত পাওয়া যাবে বলে নিশ্চয়তা পর্যন্ত দিতে দেখা গেছে।
এই অবস্থায় ভোট আর নাগরিকের সচেতন সিদ্ধান্ত থাকে না; তা হয়ে ওঠে পরকালীন প্যাকেজ ডিল। ব্যালট পেপার রূপ নেয় আমলনামায়, সিলমোহর হয়ে ওঠে সওয়াবের সনদ।
পোশাক যে চরিত্রের প্রমাণ নয়, প্রতীক যে নীতির বিকল্প নয়, এই সহজ যুক্তিকেও ধর্মীয় পোশাক ও প্রতীক আবেগের আঘাতে দুর্বল করে দেয়। রাজনীতিকেরা এই দুর্বলতাকে কৌশলে ব্যবহার করেন। তাঁরা জানেন, এ ধরনের পোশাক ও প্রতীক দিয়ে ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন তৈরি করা সহজ হয়; নিজেকে নৈতিক দিক থেকে উচ্চ শ্রেণির দাবি করা যায় এবং বিরোধীদের ‘অধার্মিক’ বা ‘শত্রু’ বানানো যায়; সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এসব দিয়ে দিন শেষে জবাবদিহি এড়ানো যায়।
প্রতীক প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রতীক যখন রাজনীতিকে গ্রাস করে যুক্তির জায়গা দখল করে নেয়, তখনই বিপদ। যে সমাজ ভোট দেয় পোশাক দেখে, সে সমাজ একসময় নীতি যাচাইয়ের ক্ষমতা অধিকার হারিয়ে ফেলে। যখন ধর্মীয় পোশাক ও প্রতীক রাষ্ট্রক্ষমতার সিঁড়ি হয়ে ওঠে, তখন সচেতন নাগরিক অচেতন ভক্তে পরিণত হয়। ভক্তের ভোট থাকে, প্রশ্ন থাকে না।
সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, ভোটে এই পোশাক ও প্রতীকের অপব্যবহার ধর্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করে নীরবে, আর রাজনীতিকে দুর্বল করে ধীরে। পাঞ্জাবি-টুপি-হিজাব যখন ভোট আকর্ষণের টোপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন ধর্মের নৈতিক শক্তির আবেদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর রাজনীতি যখন অভিনয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার জবাবদিহি হারিয়ে যায়। দিন শেষে দুটোই টিকে থাকে, কিন্তু দুটোই হয়ে ওঠে ফাঁপা।
ভোটার তখন বুঝে যান, এই টুপি বিশ্বাসের নয়, এই নামাজ আত্মা পরিশুদ্ধির নয়, এই জান্নাতের প্রতিশ্রুতির পেছনে আছে ক্ষমতার উদগ্র বাসনা। নির্বাচন তখন আর যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া থাকে না, এটি হয়ে ওঠে সমষ্টিগত আত্মপ্রতারণার উৎসব।
সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
ই-মেইল: [email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব
