আমরা যারা ১৯৭৫ সালের পর জন্মেছি, ‘বুঝদার’ হওয়ার পর থেকে তাদের মাথায় কিছু বাস্তবতা খুব গভীরভাবে গেঁথে ছিল। ছোটবেলায় আমরা বুঝিনি, নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামী কেন ধর্মকে ‘রাজনৈতিক ব্যবসা’ হিসেবে নিত।
তখন রাজনৈতিক সচেতনতা ছিল কম, ধর্মীয় আবেগ ছিল বেশি। তা ছাড়া দীর্ঘদিন (বিশেষ করে ১৯৯৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত) জামায়াতে ইসলামী বিএনপির সঙ্গে জোট রাজনীতিতে থাকার কারণে অনেক সময় আমরা জামায়াতের ধর্মভিত্তিক প্রচারণাকে সাধারণ রাজনৈতিক রীতির অংশ ভেবে নিয়েছিলাম এবং সে সময় ধর্মীয় ব্যাপার রাজনীতিতে খুব একটা আলোচনায় ছিল না।
কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি বিষয় স্পষ্ট। সেটি হলো ধর্মকে বিকৃত করে, অপব্যাখ্যা দিয়ে রাজনীতি করার কায়দার কথা আর গোপন নেই। যাঁরা সত্যিকার অর্থে ইসলামি অনুশাসন মানতে চান এবং মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে চান, তাঁদের জন্য এটি বেদনাদায়ক। কারণ, ধর্মকে এখন এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে যে ধর্মপ্রাণ মানুষও আজ বিভ্রান্ত এবং আহত।
১০ জানুয়ারি রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কদমতলা এলাকায় একটি মতবিনিময় সভায় রংপুর মহানগর জামায়াতের আমির এ টি এম আজম খান বক্তব্য দিচ্ছিলেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রংপুর-৪ আসনের প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ানো এই জামায়াত নেতা সেখানে বলেন,‘২৮ তারিখ (ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ছয়টায় কেন্দ্র থেকে মোবাইল করল আমাকে। মোবাইল করি বলল যে “খান সাহেব, আপনাকে তো কোরবানি দেওয়া হলো।” আমি বললাম, এই কোরবানি কি ইব্রাহিম (আ.)-এর ব্যাটা ইসমাইল (আ.)-এর? তখন বললেন যে “হ্যাঁ, এর চেয়েও বড়।” তা আমি বললাম, এর ব্যাখ্যাটা দিলে ভালো হইত। তখন বললেন যে “আসলে ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করেছেন। এ জন্য মানুষ কোরবানি হয় নাই, হইছে দুম্বা। আর আপনার কোরবানি বলতে পীরগাছা-কাউনিয়ার লাখ লাখ নারী-পুরুষের কোরবানি। এ জন্যই এই কোরবানিটা বড় কোরবানি।” তা আমি বললাম, আলহামদুলিল্লাহ।’
তাঁর বক্তব্যের ১ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
এদিকে ঝালকাঠিতে জামায়াতের প্রার্থী ফয়জুল হকের বক্তব্যও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তাঁকে বলতে শোনা গেছে, ‘বিড়িতে সুখটানের মধ্যেও দাঁড়িপাল্লার দাওয়াত দিলে আল্লাহ মাফ করে দিতে পারে’। পরে দলীয়ভাবে তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে (প্রথম আলো, ১০ জানুয়ারি ২০২৬)। প্রশ্ন হলো, এগুলো কি ইসলামের ভাষার অপব্যবহার করে রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং করা নয়?
একসময় ধর্মকে ‘ব্যবসা’ বানিয়ে ভোট আদায়ের যে পুরোনো মডেল ছিল, আজকের সমাজে তা কাজ করবে না। মানুষ বদলেছে। রাজনীতি বদলেছে। ভাষা বদলেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ডিজিটাল যুগে মানুষ তথ্যের ভেতর দিয়ে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে শিখেছে। এখন আর শুধু ধর্মের স্লোগান দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করা যায় না; ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে স্বার্থ উদ্ধার করাও সহজ নয়।
ইসলামে ইবাদত, তাকওয়া, ক্ষমা, জান্নাত এসব বিষয় কোনো দলীয় প্রতীক বা নির্বাচনী মার্কার গ্যারান্টি দিয়ে বিক্রি করার মতো পণ্য নয়। বরং কোরআনে স্পষ্টভাবে নির্দেশ আছে, ‘তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে সামান্য মূল্যে বিক্রি করো না।’ (সুরা আল-বাকারা ২: ৪১)
আরও কঠোরভাবে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা নিজেদের হাতে কিতাব লিখে বলে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে, যাতে তারা সামান্য দাম পায়।’ (সুরা আল-বাকারা ২: ৭৯) অর্থাৎ ধর্মীয় সত্যকে বিকৃত করে পার্থিব লাভ-ক্ষমতা, ভোট, নিয়ন্ত্রণ হাসিল করা ইসলামি দৃষ্টিতে শুধু ভুল নয়, ভয়াবহ গুনাহ।
কিন্তু আজ আমরা দেখছি, কোনো কোনো রাজনৈতিক প্রচারে ‘দাঁড়িপাল্লায় ভোট’কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন সেটি ইমানের অংশ, এমনকি কাউকে কাউকে ‘জান্নাতের নিশ্চয়তা’ পর্যন্ত দিতে শোনা গেছে।
ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এ বিষয়ে আলেম সমাজের একাংশকে এ নিয়ে মোটেও সরব হতে দেখা যাচ্ছে না। ইসলামি ভাষ্যকে প্রকাশ্যে বিকৃত করা হচ্ছে, অপব্যাখ্যা কিন্তু তাঁদের দিক থেকে প্রতিবাদ আসছে না। অথচ কোরআনে আছে, ‘সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ো না এবং সত্য গোপন করো না।’ (সুরা আল-বাকারা ২: ৪২)
আলেমদের দায়িত্ব সত্য বলার নৈতিক সাহস দেখানো। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; অনেক সময় তা অন্যায়ের পক্ষেই দাঁড়ায়।
আর এই ধর্মের অপব্যবহার শুধু মুসলমানদের ক্ষেত্রেই নয়, অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান নষ্ট করেও হচ্ছে। চাঁদপুরে অভিযোগ উঠেছে, একটি ইউনিয়নে
জামায়াত–ঘনিষ্ঠ স্থানীয় নেতা হিন্দুদের প্রতিমার মাথার স্থানে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ছবি বসিয়ে পোস্ট করেন, এতে সামাজিক উত্তেজনা তৈরি হয় (বাংলা ট্রিবিউন, ৪ অক্টোবর ২০২৫)।
কিন্তু কোরআন অন্য ধর্মকে অপমান করতে নিষেধ করেছে, ‘(হে মুমিনগণ!) আল্লাহকে বাদ দিয়ে যাদের তারা ডাকে তোমরা তাদের গালি দিও না, কেননা তারা তাদের অজ্ঞতাপ্রসূত শত্রুতার বশবর্তী হয়ে আল্লাহকে গালি দেবে।’ (সুরা আল-আনআম ৬: ১০৮) ইসলাম অন্য ধর্মকে অপমান নয়, নৈতিক সংযম শিক্ষা দেয়। তাহলে যারা অন্য ধর্মকে আঘাত করে, তারা কীভাবে ন্যায়সংগতভাবে শরিয়াহ প্রতিষ্ঠার দাবি তোলে?
সবশেষে অনলাইনে বট বাহিনীর যে ভাষা ও প্রচার চলছে, সেটিও গভীরভাবে উদ্বেগজনক। কোরআন ‘হুমাজাহ-লুমাজাহ’, ব্যঙ্গ, অপমান, কুৎসা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা পরনিন্দা করে, কটাক্ষ করে।’ (সুরা আল-হুমাজাহ ১০৪: ১) আরও নিষেধ করেছে উপহাস, গিবত, চরিত্রহনন। (সুরা আল-হুজুরাত ৪৯: ১১-১২) অথচ দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে জামায়াত-শিবিরের ভাষা অধিকাংশ ক্ষেত্রে উসকানিমূলক, তাচ্ছিল্যপূর্ণ, বিভাজনমূলক।
শেষ কথা, একসময় ধর্মকে ‘ব্যবসা’ বানিয়ে ভোট আদায়ের যে পুরোনো মডেল ছিল, আজকের সমাজে তা কাজ করবে না। মানুষ বদলেছে। রাজনীতি বদলেছে। ভাষা বদলেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ডিজিটাল যুগে মানুষ তথ্যের ভেতর দিয়ে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে শিখেছে। এখন আর শুধু ধর্মের স্লোগান দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন প্রভাবিত করা যায় না; ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে স্বার্থ উদ্ধার করাও সহজ নয়।
● মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
* মতামত লেখকের নিজস্ব
[১৩ জানুয়ারি ২০২৬ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা ভোটের ব্র্যান্ডিংয়ে ধর্মীয় ভাষার অপব্যবহার—শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।]
