দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫০ শতাংশের বেশি আসে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। এখন সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৫ টাকা ২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪ টাকা করার ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, ফলে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে ইতিমধ্যেই ঘাটতিতে থাকা পিডিবির ঘাটতি আরও বাড়বে, ফলে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে।
বিদ্যুৎ, শিল্প, ক্যাপটিভ ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ মূল্যে এলএনজি আমদানি করে বর্ধিত চাহিদা মেটানোর কথা বলা হয়েছে। (গ্যাসের দাম বাড়ল কেন, ব্যাখ্যা দিল মন্ত্রণালয়, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৮ জানুয়ারি ২০২৩) গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে জনগণের পকেট থেকে সরকারি সংস্থার কাছে বাড়তি টাকা গেলেও তাতে করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বাড়তি দামে এলএনজি কেনা সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, এলএনজি আমদানির জন্য প্রয়োজন ডলার।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত খাতের পরিকল্পনা আমদানিনির্ভর হলে জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করা যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি, কয়লা কিংবা তেলের দাম সব সময়ই অস্থিতিশীল। এ কারণে বাংলাদেশের মতো বাণিজ্যঘাটতির দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনার সময় স্থানীয় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি (আমাদের ক্ষেত্রে গ্যাস) ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। যত দ্রুত দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিকল্পনায় বিদেশমুখিনতা থেকে স্থানীয় সক্ষমতার দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে, তত দ্রুত আমরা এই সংকট থেকে মুক্তি পাব।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের মধ্যে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বাবদ পাওয়া বাড়তি টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় ডলার পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।
কারণ প্রথমত, ডলার–সংকটের কারণে সময়মতো কয়লা আমদানি করতে না পারার কারণে কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। (ডলার–সংকটে কয়লার আমদানি নেই, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৫ জানুয়ারি ২০২৩) ব্যাংকগুলো ডলার–সংকটের কারণে কয়লা আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খুলতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে কয়লাচালিত ১৩২০ মেগাওয়াট পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রমও বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। (কয়লা–সংকটের কারণে ১৩২০ মেগাওয়াট পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম বন্ধের আশঙ্কা, ইউএনবি, ১৭ জানুয়ারি ২০২৩) এ ছাড়া মার্কিন ডলারে আমদানি মূল্য পরিশোধ করতে না পারায় রমজান মাসকে সামনে রেখে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা তিনটি জাহাজের প্রায় ৫৪ হাজার টন চিনি ও ভোজ্যতেলের খালাস আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। (রোজার পণ্য জাহাজে আটকা, প্রথম আলো, ১৮ জানুয়ারি ২০২৩) তাহলে ডলার–সংকটের কারণে হাতে বাড়তি টাকা থাকলেও সরকার যে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ডলার দিয়ে বাড়তি এলএনজি ক্রয় করতে পারবে, তার কি নিশ্চয়তা!

দ্বিতীয়ত, এর আগে বাড়তি এলএনজি আমদানির কথা বলে গত চার বছরে দুইবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও এলএনজি আমদানি বাড়েনি বরং ডলার–সংকটের কারণে আরও কমেছে। ২০১৯ সালে দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানির কথা বলে গ্যাসের দাম ৩২ শতাংশ বাড়ানো হলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গ্যাস আমদানি হয়নি। যে কারণে বাড়তি আমদানির কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে বাড়তি আদায় করা ৯ হাজার কোটি টাকা গ্রাহকদের ফেরত দিতে পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দিয়েছিল জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

তবে পেট্রোবাংলা সেই টাকা ফেরত দেয়নি। এরপর ২০২২ সালের জুনে আবারও দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানির কথা বলে গ্যাসের দাম প্রায় ২৩ শতাংশ বাড়ানো হয়। কিন্তু বাড়তি আমদানির কথা বলে গ্যাসের দাম বাড়ানোর ঠিক এক মাসের মাথায় জুলাই মাসে খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে এলএনজি সরবরাহ কমে দৈনিক ৩৮ কোটি ঘনফুটে নেমে যায়। দেখা যাচ্ছে, দৈনিক ৮৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহের কথা বলে চার বছরে দুইবার গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও এখন দিনে এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে মাত্র ৪২ কোটি ঘনফুট। (সংকটের মধ্যেই দাম বাড়বে গ্যাসের, প্রথম আলো, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৩) এবারও যে একই ঘটনা ঘটবে না, তার কি নিশ্চয়তা!

যদি গ্যাসের দাম বাড়ালেই গ্যাস–সংকটের সমাধান হয়ে যেত, তাহলে সাড়ে তেরো বছরে ছয়বার মোট ৪০০ শতাংশ গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কোনো ফল গ্যাস সরবরাহের মধ্যে দেখা যায় না কেন! গ্যাসের দাম ২০০৯ সালের জুলাইয়ে গড়ে ১১.২২%, ২০১৫ সালের আগস্টে ২৬.২৯%, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২২.৭০%, ২০১৯ সালের জুলাইয়ে ৩২.০৮% এবং ২০২২ সালের ৫ জুন ২২.৭৮% বাড়ানো হয়। (এবার গ্যাসের ‘ঘা’, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৩, সমকাল) আর এবার বাড়ানো হলো ৮২.১০ শতাংশ। এভাবে গ্যাস–সংকট সমাধানের কথা বলে ছয়–ছয়বার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে ২০০৯ সালের ঘনমিটারপ্রতি ৪ টাকা ৩৪ পয়সা থেকে ২১ টাকা ৬৭ পয়সা করা হয়েছে, কিন্তু সমাধান মেলেনি। কারণ হলো গ্যাস–সংকটের সমাধান দেশের ভেতরে গ্যাসের দাম বাড়ানোর মধ্যে নয়, দেশের ভেতরে গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যেই নিহিত।

দেশের স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরে স্থলভাগে এবং সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দেওয়ার আহ্বান জানালেও এলএনজি লবির স্বার্থে সরকার দেশের ভেতরে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে গুরুত্ব না দিয়ে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির অবকাঠামো নির্মাণেই জোর দিয়েছে। এখন দেশে দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করার সক্ষমতা থাকলেও আমদানি কম হওয়ার কারণে এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে দৈনিক মাত্র ৪২ কোটি ঘনফুট।

আর এভাবে সক্ষমতার অর্ধেকের চেয়েও কম ব্যবহারের কারণে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনকারী কোম্পানিকে দৈনিক অন্তত ২ লাখ ডলার বা ২ কোটি টাকার মতো ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। (দৈনিক গচ্চা যাচ্ছে দুই কোটি টাকা, সমকাল, ১৪ আগস্ট ২২) কিন্তু তারপরও এলএনজিনির্ভর পরিকল্পনা বন্ধ হচ্ছে না, নতুন আরও এলএনজি টার্মিনাল বানানোর তৎপরতা চলছে। (আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চুক্তির পথে পেট্রোবাংলা, বণিক বার্তা, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২২)

এভাবে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের চেয়ে এলএনজি আমদানির ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় কী বিপুল ক্ষতি হচ্ছে, তা বোঝা যায় সাম্প্রতিক একটা তথ্য থেকে। গ্যাস–সংকট তীব্র হওয়ার পর ২০২২ সালে ৮১২ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে ৭২৩ বিসিএফ (বিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাসের মজুত আবিষ্কার করেছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স। এই পরিমাণ গ্যাস এলএনজি আকারে আমদানি করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে ব্যয় হতো ৯৬ হাজার কোটি টাকা আর স্পট মার্কেট থেকে কিনতে গেলে ব্যয় হতো ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা! অথচ বাপেক্সের সক্ষমতা না বাড়িয়ে এত দিন বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির ওপরেই জোর দিয়েছে সরকার। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ এই চার বছরে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির জন্য ব্যয় করা হয় ৮৫ হাজার কোটি টাকা! (৮১২ কোটি বিনিয়োগে ১ লাখ কোটি টাকার এলএনজি ব্যয় সাশ্রয় করেছে বাপেক্স, বণিক বার্তা, ৫ জানুয়ারি, ২০২৩) প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে মাত্র ৮১২ কোটি টাকা বিনিয়োগে যদি লাখো কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে, তাহলে এলএনজি আমদানি বাবদ ব্যয় করা ৮৫ হাজার কোটি টাকার ১০ ভাগের ১ ভাগও যদি দেশের স্থলভাগ ও সাগরের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে ব্যয় করা হতো, তাহলে গ্যাসের এই সংকট হতো কি না!

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত খাতের পরিকল্পনা আমদানিনির্ভর হলে জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জন করা যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি, কয়লা কিংবা তেলের দাম সব সময়ই অস্থিতিশীল। এ কারণে বাংলাদেশের মতো বাণিজ্যঘাটতির দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনার সময় স্থানীয় পরিবেশবান্ধব জ্বালানি (আমাদের ক্ষেত্রে গ্যাস) ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। যত দ্রুত দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিকল্পনায় বিদেশমুখিনতা থেকে স্থানীয় সক্ষমতার দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে, তত দ্রুত আমরা এই সংকট থেকে মুক্তি পাব।

  • কল্লোল মোস্তফা বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবেশ ও উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক লেখক, প্রকাশিত গ্রন্থ: বাংলাদেশে উন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতি
    ই–মেইল: [email protected]