সরকারের প্রথম চেষ্টা আইএমএফ থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়ার। আইএমএফ যদি দেয়ও, তাদের অনেক শর্ত মেনে নিতে হবে। এর মধ্যে টাকার মূল্যমান ঠিক করা, সব ক্ষেত্রে ভর্তুকি কমানোসহ অনেক কঠিন শর্ত থাকতে পারে। ফলাফল হিসেবে আরও বেশি মূল্যস্ফীতি আসতে পারে।

বিভিন্ন ফোরকাস্টিং ওয়েবসাইটও আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের পর একটা বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বলছে। আরইইআর যত বেশি হয়, আমদানি পণ্যের দাম তত বাড়ে এবং রপ্তানির দাম কমতে থাকে। ফলে দেশের ক্রয়ক্ষমতা কমতে থাকে। এ জন্য আইএমএফ সব সময় দুটো এক্সচেঞ্জ রেটকে এক রাখতে বলে। আর আরইইআরকে রাখার চেষ্টা করতে বলে ১০০–এর নিচে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন টাকার অবমূল্যায়ন করে এই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করছে।

ফলাফল যা হওয়ার, তা–ই হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি রপ্তানির রেকর্ড গড়েও আমাদের আমদানিও নতুন রেকর্ড করে ফেলেছে। আমাদের রিজার্ভ কমছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। আর তার ফলাফল সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, একটা অস্থিরতা। সরকারি হিসেবে আমাদের রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন ডলার হলেও, আইএমএফের মতে সেটা ৩২ বিলিয়নের বেশি নয়, যা মোটামুটি আমাদের চার মাসের খরচ। তিন মাসের খরচে এলেই বিপৎসংকেত বেজে উঠবে। এখনো কিন্তু সব ধারের সুদের টাকা ফেরত দেওয়া শুরু হয়নি।

গত বছর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হারানো টাকার অবমূল্যায়ন মে-২০২২ পর্যন্ত হয়েছে ৯ দশমিক ২ শতাংশ, যেটা এখন আরও বেড়েছে। এই অবমূল্যায়ন কি মূল্যস্ফীতিতে যুক্ত হয়নি? আমাদের পাচার হওয়া টাকা আর অবমূল্যায়ন—দুটোই কিন্তু মূল্যস্ফীতির একটা অংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের মে মাসের মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা মেনে নেওয়া কঠিন, যেখানে অবমূল্যায়ন হয়েছে ৯ শতাংশের বেশি। বাস্তবে ৯০ দশকের পর বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে, যা কোনোক্রমেই ১২ শতাংশের নিচে নয় (২০১১ সালে ছিল ১১ দশমিক ৪ শতাংশ) যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি এখন ৯ দশমিক ১ শতাংশ। আবার আইএমএফের মতে এ বছর গড় মূল্যস্ফীতি হবে ৮ শতাংশের ওপর। কিন্তু বিবিএস কখনোই ঠিক উপাত্ত দিতে পারেনি।

আগেও এক লেখায় জনসংখ্যার সঠিক গণনার গুরুত্ব নিয়ে লিখেছিলাম। এবারও জনসংখ্যার গণনা নিয়ে সংশয় আছে, ফলাফল—এবারও ঠিক উপাত্ত আমরা পাব না।
করোনার সময় আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল কৃষি। কিন্তু এবার সময়ও প্রতিকূল। বন্যা, অনাবৃষ্টি, দাবদাহ, পানির স্তর নেমে যাওয়া, সরঞ্জামের দাম বৃদ্ধি—এসব কারণে এবার আশানুরূপ ফলন হবে না। বিশ্ব খাদ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই বিপৎসংকেত জারি করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, তেলের দাম বৃদ্ধি, কোভিড, জলবায়ুর জন্য প্রায় ৮২ কোটি মানুষ সারা বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় আছে। ফলে অনেক দেশ খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, আমরা অনেক কিছুর জন্যই বাইরের দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আর কেবল তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর ভরসা করে আমরা বিলাসিতা দেখিয়েছি। কিন্তু সব ব্যবসারই উন্নয়নের পর মন্দা পর্যায় আসে, আরও খারাপ হলো ডিপ্রেশন। আমাদের দেশ এখন যদি খারাপ দিকে যায়, মন্দা পর্যায়ে যাবে, শ্রীলঙ্কা আছে ডিপ্রেশনে।

সরকার এখনো চেষ্টা করছে, কিন্তু সেই চেষ্টা সেই কোভিডের মতো—এলোমেলো পরিকল্পনা আর ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেওয়া। সরকারের প্রথম চেষ্টা আইএমএফ থেকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়ার। আইএমএফ যদি দেয়ও, তাদের অনেক শর্ত মেনে নিতে হবে। এর মধ্যে টাকার মূল্যমান ঠিক করা, সব ক্ষেত্রে ভর্তুকি কমানোসহ অনেক কঠিন শর্ত থাকতে পারে। ফলাফল হিসেবে আরও বেশি মূল্যস্ফীতি আসতে পারে। ব্যাংক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও তারা ডলারের প্রবাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। প্রণোদনা ও বিভিন্ন সুযোগ দিয়ে আনার চেষ্টা করছে বাইরে থেকে রেমিট্যান্স আর পাচার করা টাকা ফেরত আনার মাধ্যমে। এগুলোতে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ হলেও বেশি সময় নিয়ে টিকিয়ে রাখা কঠিন।

এখন সময় সবার ঐক্যের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা, সঠিক তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা। কৃষিতে গুরুত্ব দেওয়া, বিলাসপণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা, অদরকারি খরচ বাদ দেওয়া, অপচয় কমানো, নতুন রপ্তানির খাত খুঁজে বের করা, তার চেয়ে বেশি দরকার বিভিন্ন বিষয়ের সরকারি, বেসরকারি এক্সপার্ট আর একাডেমেশিয়ানদের নিয়ে কমিটি করে সম্ভাব্য বিপদের আগেই যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রাখা। আমরা সাধারণ মানুষ শুধু অপচয় আর খরচটাই কমাতে পারি, বাকি সব সরকারের হাতেই। যেকোনো বিপদ নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করে, কথা হচ্ছে আসন্ন বিপদ থেকে আমরা সুযোগ বের করে নিতে পারব কি না!

সুবাইল বিন আলম একটি বিদেশি কোম্পানির কান্ট্রি ডিরেক্টর, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট এবং সাবেক রিসার্চ ফেলো।
ই–মেইল: [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন