এপস্টেইন থেকে গাজা: পশ্চিমা অভিজাতদের নৈতিক মুখোশ

এপস্টেইন অভিজাতদের ভোগবিলাসকে শুধু ব্যবহার করেননি। তিনি সেটিকে অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন।কোলাজ: প্রথম আলো

যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিগুলো কেবলই কিছু কেলেঙ্কারির গল্প নয়। এগুলো মূলত দলিল। জবানবন্দি, হলফনামা, সমঝোতা চুক্তি। অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর চালানো নির্যাতন কোনো সুস্থ নৈতিক ব্যবস্থার আকস্মিক ভাঙন ছিল না। এটি ছিল পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত একটি প্রক্রিয়া। দরিদ্রতা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মেয়েদের সংগ্রহ করা হয়েছে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়া হয়েছে। অর্থ দেওয়া হয়েছে। চুপ করিয়ে রাখা হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার চারপাশে ছিল পেশাদার ব্যবস্থাপনা। ওই ব্যবস্থাপনায় আইনজীবীরা ঝুঁকি হিসাব করেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে, সামাজিক ও রাজনৈতিক খ্যাতি অক্ষুণ্ন থেকেছে। ক্ষতির বাস্তবতা অস্বীকার করা হয়নি, বরং সেটিকে স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক রুটিনে পরিণত করা হয়েছে।

এপস্টেইনের একজন ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে বলেছেন, তাঁকে ব্যবহার করার পর অন্য পুরুষদের কাছে হস্তান্তর করা হতো। আরেকজন ভুক্তভোগী মারিয়া ফার্মার বলেছেন, তিনি খুব দ্রুত বুঝে গিয়েছিলেন যে তাঁর কোনো মূল্য নেই। তিনি কেবল এমন মানুষদের কামনা পূরণের একটি উপকরণ, যাদের কোনো দিন জবাবদিহি করতে হবে না। এগুলো কোনো রূপক নয়। এগুলো ক্ষমতাবানদের সঙ্গে ক্ষমতাহীনদের সাক্ষাতের পদ্ধতিগত বর্ণনা।

ব্যাপারগুলো আমাদের খুব বেশি চমকে দেওয়ার কথা নয়। কারণ, যে অভিজাত শ্রেণি বিদেশে মানুষ হত্যা করতে অভ্যস্ত, তারা কি ঘরের ভেতরে হঠাৎ নৈতিক সীমা মেনে চলবে, এমনটা ভাবার কারণ কী?

আরও পড়ুন

দশকের পর দশক ধরে বিদেশে ধ্বংসযজ্ঞের প্রমাণ কখনো লুকানো ছিল না, সেগুলো টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে। ইরাকে নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ফলে হাজার হাজার শিশু মারা গেছে। এই সংখ্যাটি স্বীকার করা হয়েছে এবং পরে নীতির মূল্য হিসেবে সেটিকে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছে। শহর ধ্বংস করা হয়েছে। বেসামরিক জীবন নিশ্চিহ্ন হয়েছে। সবকিছু ব্যাখ্যা করা হয়েছে কৌশল, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের নামে।

আবু গারিবে বন্দীদের নগ্ন করা হয়েছে। যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। ছবি তোলা হয়েছে। উপহাস ও অপমান করা হয়েছে। তাঁদের শরীরকে ক্ষমতা প্রদর্শনের অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। সেই নির্যাতনের দলিল তৈরি হয়েছে। কিছুদিন বিতর্ক হয়েছে। এরপর সবকিছু নীরবে ‘স্বাভাবিক’ করে নেওয়া হয়েছে। ওই সহিংসতাকে দেখানো হয়েছে দূরবর্তী মরুভূমি ও দখলকৃত শহরে সীমাবদ্ধ একটি ‘ব্যতিক্রম’ ঘটনা হিসেবে। বাদামি শরীর ও নামহীন বন্দীদের ওপর ঘটে যাওয়া কিছু হিসেবে।

পশ্চিমা সমাজ যে সত্যটি দীর্ঘদিন উপেক্ষা করেছে, তা হলো এই অভিজাত শ্রেণি বিদেশে জনসংখ্যাকে অনাহারে রাখতে, শহর গুঁড়িয়ে দিতে এবং বন্দীদের যৌন নির্যাতন করতে পারে, তারা ঘরের ভেতরে যাদের তুচ্ছ মনে করে, তাদের নির্যাতন করতেও দ্বিধা করে না। বিদেশের নৃশংসতা আর ঘরের নৈতিকতার মধ্যে যে সীমারেখা টানা হয়েছিল, তা ছিল কল্পিত। দূরত্ব, বর্ণবাদ ও বয়ানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একধরনের সান্ত্বনাদায়ক গল্প। বিদেশে যা বিবৃতি, সেন্সরশিপ ও পরিমিত উদ্বেগের মাধ্যমে সামলানো হয়, ঘরের ভেতরে তা সামলানো হয় সমঝোতা চুক্তি ও গোপনীয়তার শর্ত দিয়ে।

এই একই অভিজাত শ্রেণির হাতে গাজার ধ্বংস কোনো নৈতিক ব্যতিক্রম নয়। এটি একই কাঠামোর অংশ। একই মানবমূল্যের শ্রেণিবিন্যাস। একই ধারণা যে—কিছু মানুষের জীবন পূর্ণ মানবজীবন, আর অন্যরা সহজে ত্যাগযোগ্য। হোক সেটা একটি ব্যক্তিগত ক্যারিবীয় দ্বীপে নির্যাতিত শিশু কিংবা গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া শিশু। এই দুই ক্ষেত্রের অপরাধীরা একই মানসিকতায় চালিত। তারা মনে করে, অন্যের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার তাদের আছে। ফ্লোরিডায় হোক বা গাজায়, ইচ্ছা করলেই তারা নির্মম হতে পারে।

এপস্টেইন অভিজাতদের ভোগবিলাসকে শুধু ব্যবহার করেননি। তিনি সেটিকে অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। অধিকারবোধকে চাপের উপকরণে, বাড়াবাড়িকে দুর্বলতায়, আর বিশেষাধিকারকে ফাঁদে রূপান্তর করেছিলেন।

এই একই শ্রেণি আজ বৈশ্বিক পুঁজির নিয়ন্ত্রক। প্রযুক্তি ধনকুবের, আর্থিক জগতের বড় খেলোয়াড় ও যুদ্ধ থেকে মুনাফা করা শক্তিগুলো একই অভিজাত বাস্তুতন্ত্রে ঘোরাফেরা করে, যেটি এপস্টেইন গড়ে তুলেছিলেন। এপস্টেইনের ব্যক্তিগত জগতে স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করা ব্যক্তিদের একজন ছিলেন ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে তিনি একাধিকবার এপস্টেইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং নিউইয়র্কের বাসভবনে থেকেছেন।

এপস্টেইন বারাককে প্যালান্টির টেকনোলজিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের দিকে নজর দিতে বলেছিলেন। সে সময় প্রতিষ্ঠানটি নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য ও ডেটা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে উঠছিল। এই পরামর্শটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, এপস্টেইনের জগৎ কেবল ব্যক্তিগত ভোগের জায়গা ছিল না। এটি ছিল এমন এক সংযোগস্থল, যেখানে অভিজাত ভোগবিলাস, গোয়েন্দা যুক্তি ও আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।

আরও পড়ুন

প্যালান্টির টেকনোলজিস এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার সফটওয়্যার নজরদারি রাষ্ট্র ও আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য তৈরি। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি ইসরায়েল সরকার ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে প্রকাশ্য ও আদর্শিকভাবে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। তারা তাদের প্রযুক্তিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আধুনিক যুদ্ধের জন্য অপরিহার্য হিসেবে উপস্থাপন করছে।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সক্রিয় যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তার জন্য একটি কৌশলগত চুক্তির ঘোষণা দেওয়া হয়। শীর্ষ নির্বাহীরা সরাসরি ইসরায়েলে গিয়ে এই অংশীদারত্ব চূড়ান্ত করেন। এই প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাটফর্মগুলো গোয়েন্দা তথ্য, রসদ ও লক্ষ্যবস্তুকে একত্র করে এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যাকে সামরিক ভাষায় এখন ডিজিটাল কিল চেইন বলা হয়।

এই সংযোগ কেবল প্রযুক্তিগত নয়, আদর্শিকও। প্যালান্টির প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প প্রকাশ্যে ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থানকে সভ্যতার দায়িত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যে প্রয়োজন ও নৈতিক ছাড়ের ভাষা একসময় ব্যক্তিগত নির্যাতনকে আড়াল করত, আজ সেই ভাষাই সফটওয়্যারের ভেতরে কোড হয়ে প্রকাশ্য ধ্বংসকে বৈধতা দেয়।

আরও পড়ুন

এপস্টেইন সামাজিকভাবে যা তৈরি করেছিলেন, অর্থাৎ প্রবেশাধিকার, সুরক্ষা ও পারস্পরিক জড়িত থাকা, প্যালান্টির মতো প্রতিষ্ঠান তা প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবায়ন করছে। সহিংসতা যখন এভাবে সফটওয়্যার, নীতি ও মুনাফার ভেতরে গেঁথে যায়, তখন তাকে আর লুকাতে হয় না। গর্বের সঙ্গেই তা নীতি হিসেবে ঘোষণা করা যায়। একসময় যেটাকে যুক্তি দিয়ে ঢাকতে হতো, এখন সেটাই খোলাখুলি বলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের ভাষায়, শক্তিই ন্যায্যতা। গাজায়, ভেনেজুয়েলায় কিংবা ফ্লোরিডার বন্ধ দরজার আড়ালে, এটাই নীতি। এই অভিজাত শ্রেণি কেবল ক্ষমতাবান নয়। তারা বড় হয়েছে ব্যতিক্রমী হওয়ার বিশ্বাস নিয়ে। তারা এমন এক বদ্ধ জগতে বাস করে, যেখানে নিয়ম অন্যদের জন্য, আর পরিণতি দর-কষাকষির বিষয়।

এই কারণেই এপস্টেইনের প্রতি এই শ্রেণির এত মানুষের আকর্ষণ ছিল। এত সহজে তারা তাঁর ফাঁদে পড়েছিল। এপস্টেইনের আসল প্রলোভন শুধু ভোগ ছিল না। ছিল এই নিশ্চয়তা যে সাধারণ নৈতিক নিয়ম তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তাঁর আয়োজনগুলো ছিল সদস্যপদ যাচাইয়ের পরীক্ষা। তাঁর ব্যক্তিগত বিমান ও নির্জন সম্পত্তিগুলো ছিল অন্তর্ভুক্তির আচার।

তাঁর জগতে প্রবেশের মানে ছিল একটি চিহ্ন পাওয়া। এমন এক বৃত্তে ঢোকা, যেখানে পরিণতির ভয় নেই। এপস্টেইন অভিজাতদের ভোগবিলাসকে শুধু ব্যবহার করেননি। তিনি সেটিকে অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। অধিকারবোধকে চাপের উপকরণে, বাড়াবাড়িকে দুর্বলতায়, আর বিশেষাধিকারকে ফাঁদে রূপান্তর করেছিলেন।
এপস্টেইন বুঝেছিলেন, প্রকৃত ক্ষমতাবানদের কাছে মর্যাদা ভোগের চেয়েও বেশি নেশাজনক। নিজেকে দরজার প্রহরী বানিয়ে তিনি ভোগকে দীক্ষায় এবং সীমালঙ্ঘনকে যোগ্যতায় পরিণত করেছিলেন।

সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো, এই একই শ্রেণি নিজেদের বিশ্বজুড়ে নৈতিকতার মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরে। তারা অন্য দেশকে পশ্চাৎপদ, সহিংস বা বর্বর বলে বিচার করে। তারপর সেই ভাষাকেই আধিপত্য ও দমন ন্যায্য করার অস্ত্র বানায়। গাজা ধ্বংস তাদের মূল্যবোধের ব্যর্থতা ছিল না। গাজা ছিল সেই মূল্যবোধের চূড়ান্ত প্রকাশ। এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি এই ব্যবস্থার ব্যক্তিগত মুখ উন্মোচন করেছে। গাজা তার প্রকাশ্য আচরণ দেখিয়ে দেয়।

দুটো একসঙ্গে শেষ বিভ্রমগুলো ভেঙে দেয়। প্রকাশ করে দেয় এমন এক অভিজাত শ্রেণির নগ্ন চেহারা, যারা ঘরের ভেতরে নীরবে দুর্বলদের ভোগ করে, আর বাইরে প্রকাশ্যে ধ্বংস করে মানজীবন।

  • সুমাইয়া ঘান্নুশি ব্রিটিশ তিউনিসীয় লেখক ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির বিশেষজ্ঞ
    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত