‘ছাতার অবস্থাখানা জরিমানা-দেওয়া/মাইনের মতো,/ বহু ছিদ্র তার’—রবি ঠাকুরের ‘বাঁশি’ কবিতার হরিপদ কেরানির মতোই তাঁর ছাতাখানার দশা। তাই খুব বেশি চড়া রোদ না হলে মেলে ধরেন না। মধ্যদুপুরে যখন কথা হচ্ছিল, রোদের আঁচ টের পাওয়া যাচ্ছিল বেশ।
তবে প্রমিল ঋষি দাশের তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। কেননা ফুটপাতের একই স্থানে খোলা আকাশের নিচে তো কাটিয়ে দিলেন চার চারটি দশক। রোদ তো রোদ, ঝড়-বৃষ্টি, শীত-গ্রীষ্ম সব সয়ে চলেছেন এখানেই, এমনকি দেশ-দুনিয়ার ‘হালচাল’ও দেখছেন এখানে বসেই।
রামপুরা বিটিভি ভবনের সামনের সড়কের উল্টো পাশে যখন চাটাই পেতে বসে ছিলেন, সেই চার দশক আগে, তখন টেলিভিশন দেখার ফুরসত মিলত না, দূরদর্শনযন্ত্রটিও বেশ দুর্লভ ছিল। এখন যখন হাতে হাতে স্মার্টফোন-দৃশ্যমাধ্যমের হরেক সুবিধা যাতে ঠাসা—তখনো তাঁর ‘বিনোদন’ শূন্যই। স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য নেই, দেখার সময়-সুযোগও নেই।
সকাল না হতেই পেটে দুটো দানাপানি দিয়ে বেরিয়ে পড়েন ‘দোকানে’র উদ্দেশে, এসে কাঠের একটা পাটাতন বিছিয়ে দোকান-জিনিসপত্র সাজান। জিনিসপত্র বলতে কাঠের একটা বাক্স, যাতে জুতার শুকতলি, চামড়াসহ নানা উপকরণ থাকে আর কাঠের পাটাতনের ওপর রাখেন জুতা পলিশ করার রং, ক্রিম, ব্রাশ ইত্যাদি। সুয্যিমামা পাটে নামার পরও রাত সাড়ে ৮টা-৯টা পর্যন্ত ক্রেতার আশায় থাকেন। এরপর গোলাপবাগের ভাড়া বাসায় ফেরা। পরদিন সকালে আবার কাজে বের হওয়া। মেরেকেটে দিনে পকেটে নিয়ে যেতে পারেন চার শ থেকে পাঁচ শ টাকা।
প্রমিল ঋষি দাশের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর বয়স ষাট, তবে অযত্নের ছাপে তা আরও বেশি বলেই মনে হয়। হার্টের অসুখ আছে। চিকিৎসকের পরামর্শ, রিং পরাতে হবে। কিন্তু তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় ‘নাই’-এর নাম ‘টাকা’। সুতরাং ‘ওপরওয়ালার’ ভরসায় দিন কাটাচ্ছেন।
অন্যদের পাদুকা সারাই-সেলাই করে তাঁদের গতিকে নির্বিঘ্ন করলেন সারা জীবন, অথচ নিজে এক ‘কদম’ও সামনে যেতে পারলেন না! গরিবি পিছু ছাড়ল না, দুটো ডাল-ভাতের জন্য এখনো লড়াই চালাতে হচ্ছে, এই বয়সেও। ‘আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক’—জয় গোস্বামীর কবিতার এই পঙ্ক্তিই যেন প্রমিল ঋষি দাশের জীবনের সার ও সারাৎসার।
এ কথাও ঠিক, দুই ছেলের একজনকে (প্রসেনজিৎ ঋষি দাশ, বড়) বিএ পাস করিয়েছেন। কিন্তু শুধু ডিগ্রিতে কি আর চাকরি মেলে? ‘মামা-কাকা’র জোর, নয়তো পয়সার ‘গরম’—একটা কিছু তো চাই! সুতরাং বিএ পাস ছেলে এখন ভাঙারির দোকান চালান। মাসে তাঁর নাকি ১০-১১ হাজার টাকা আয় হয়। ছোট ছেলে প্রণজিৎ ঋষি দাশ স্কুলের প্রাঙ্গণে পা রাখেননি। এখন মোটর মেকানিকের কাজ শিখছেন। সুতরাং উল্টো তাঁকে এখনো রাহা খরচ দিতে হয়। একমাত্র মেয়ে, আইএ পর্যন্ত পড়েছে। সে এখন শ্বশুরবাড়ি।
দুই ছেলে সোমত্ত, তাই একটু বড় বাসাই লাগে, সঙ্গে মা থাকেন। বাসা ভাড়াই লাগে ১২ হাজার টাকা। আছে খাওয়াদাওয়া, পোশাক, ওষুধপথ্য। মাস শেষে ‘ঝাড়া’ পকেট।
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের ঋষিপাড়া থেকে বাবার সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন প্রমিল ঋষি দাশ। আট ক্লাস পর্যন্ত স্কুলে পড়েছেন। দোকান যখন শুরু করেন, তখন পাশে পত্রপত্রিকা বিক্রি করতেন আরেকজন। সেই সুবাদে কাজের ফাঁকে কাগজ পড়ার একটা অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। করোনা অতিমারির সময় খবরের কাগজের দোকানটা উঠে গেছে। আর নতুন করে কেউ শুরু করেনি।
তবে এরপরও দেশ-বিদেশের খবর এখনো রাখার চেষ্টা করেন প্রমিল ঋষি দাশ—এত দিনের অভ্যাস বলে কথা। নতুন সরকার গঠন হওয়ায় খুশি, তবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে তার চেয়ে বেশি নাখোশ। খামোখা একটা দেশে কেন হামলা চালাতে হবে, এর উত্তর হাতড়ে পান না। আক্ষেপ নিয়ে বললেন, যুদ্ধের কারণে ইরানের ক্ষয়ক্ষতি তো হচ্ছেই, তেলের সংকটের কারণে সারা বিশ্বের, আমাদেরও ভুগতে হচ্ছে। জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। সব সংকটে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়ে সাধারণ মানুষ, যাদের ওই সংকটের সঙ্গে দূর-দূরতক সম্পর্ক থাকে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিংবা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নাম না নিয়ে বললেন, ‘নেতারা যদি বুঝত, যুদ্ধ করত না!’
অন্যদের পাদুকা সারাই-সেলাই করে তাঁদের গতিকে নির্বিঘ্ন করলেন সারা জীবন, অথচ নিজে এক ‘কদম’ও সামনে যেতে পারলেন না! গরিবি পিছু ছাড়ল না, দুটো ডাল-ভাতের জন্য এখনো লড়াই চালাতে হচ্ছে, এই বয়সেও। ‘আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক’—জয় গোস্বামীর কবিতার এই পঙ্ক্তিই যেন প্রমিল ঋষি দাশের জীবনের সার ও সারাৎসার।
হাসান ইমাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
ই–মেইল: [email protected]
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
