ইরান যুদ্ধ উন্মুক্ত করেছে আমাদের আবেগ, দ্বিধা ও নানা প্রশ্ন

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা। বিস্ফোরণের পর ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী। মধ্য তেহরানেছবি: এএফপি

কোন দিকে তাকাব, কাকে সমর্থন করব? মন ভাবছে একদিকে, চোখ দেখছে অন্যদিকে। মন বলছে, ইরানের পরাজয় মানে ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতার মৃত্যুঘণ্টা। কিন্তু চোখের সামনে ভেসে ওঠে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত আমাদের শ্রমজীবী মানুষের জীবন-মরণ উৎকণ্ঠা।

মন আবেগে টানে ইরানের দিকে, কিন্তু চোখ দেখে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বিস্ফোরণের আলো। ইরানিরাই দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামকে নানাভাবে সমর্থন দিয়ে জীবিত রেখেছে—এমন বিশ্বাস বহু মানুষের মনে আছে। আবার অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখো বাংলাদেশি বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছেন। আজ সেই মানুষগুলোর অনেকেই ড্রোন আর বোমার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

সমর্থন ও সহানুভূতি নিয়ে এই দ্বন্দ্বের শেষ নেই। অবশ্য যুদ্ধে যারা সরাসরি জড়িত, তারা মুখে যা-ই বলুক, বাংলাদেশিদের সমর্থন নিয়ে তাদের খুব একটা মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। আমাদের কাছে নেই কোনো মিসাইলভান্ডার, নেই বড় কোনো অস্ত্রাগার। তবু যুদ্ধ শুরু হলেই সমর্থনের প্রশ্ন সামনে চলে আসে। যুদ্ধ যেন ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো—আপনাকে কোনো না কোনো দলকে সমর্থন করতেই হবে। দেশে নির্বাচনও শেষ হয়েছে; ফলে অনেক মানুষের অবসর আলোচনার বড় অংশজুড়ে এখন যুদ্ধ।

এই যুদ্ধ শুরু করেছে মার্কিনিরা—এমনটাই অনেকের ধারণা। তারা ভেবেছিল, খামেনিকে হত্যা করা গেলে ইরান মাথা নত করে ইসরায়েলের কাছে ক্ষমা চেয়ে শান্ত হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি; বরং যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়েছে। আর তাতে মার্কিন সেনাদেরও প্রাণ দিতে হচ্ছে। যুদ্ধ যখন বড় আকার নিতে শুরু করল, তখনই মার্কিন প্রশাসনের ওপর প্রশ্নের চাপ বাড়তে লাগল—ট্রাম্প এই যুদ্ধ কেন শুরু করেছিলেন? ট্রাম্প প্রশাসনও এর খুব সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। কারণ, হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ছিল এবং অনেকের ধারণা ছিল, দুই দেশের মধ্যে কোনো না কোনো সমঝোতা হতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনার মধ্যেই শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ।

আরও পড়ুন

যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন ট্রাম্প বলেছিলেন, এ অভিযান ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার জন্য। দুই দিন পর তিনি নতুন যুক্তি দিলেন—ইরান শিগগিরই এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও আঘাত হানতে সক্ষম হবে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাখ্যাটি দেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তাঁর বক্তব্য ছিল, যুক্তরাষ্ট্র জানত ইসরায়েল ইরানে হামলা চালাতে যাচ্ছে, যার ফলে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা ও হতাহতের আশঙ্কা তৈরি হবে। তাই ঝুঁকি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

ওয়াশিংটন পোস্ট এক নিবন্ধে লিখেছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানে আক্রমণের পেছনে নানা যুক্তি দেখালেও যেসব মার্কিন কর্মকর্তা গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেখেছেন, তাঁরা এমন কোনো ইঙ্গিত পাননি যে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আসন্ন হুমকি হয়ে উঠেছিল। ৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে ট্রাম্পের ইরানবিরোধী হামলা বন্ধের একটি প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটি হয়। কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ পরিচালনার বিরোধিতা করে এ প্রস্তাব আনা হয়েছিল। প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট পড়ে ২১৯টি, আর পক্ষে ২১২টি। কংগ্রেসে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। মাত্র সাত ভোটের ব্যবধানে প্রস্তাবটি নাকচ হয়, অর্থাৎ মাত্র চারজন কংগ্রেস সদস্যের ভোট এদিক-ওদিক হলেই যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবটি পাস হতে পারত।

ইরানের ওপর ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র হামলা বাংলাদেশের মানুষের বিবেককেও নানাভাবে নাড়া দিয়েছে। আবার সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। এই দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের আবেগের সম্পর্ক যেমন আছে, তেমনি অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে আছে গভীরভাবে।

এর আগে একই ধরনের একটি প্রস্তাব সিনেটেও উত্থাপিত হয়েছিল। সেখানেও মাত্র পাঁচ ভোটের ব্যবধানে তা নাকচ হয়। এতে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও এই যুদ্ধ নিয়ে গভীর দ্বিধা রয়েছে। অনেকেই হয়তো যুদ্ধের বিরোধী, কিন্তু ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রকাশ্যে ভিন্ন অবস্থান নিতে পারছেন না।

বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ খুব জনপ্রিয় নয়। যুদ্ধ শুরুর পর এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন। এই সংঘাতের আরেক বড় চরিত্র ইসরায়েল। যুদ্ধ নিয়ে যতই জোরালো বক্তব্য দিক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই অনেকে এই যুদ্ধের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সামরিক সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি ইসরায়েলকে ‘বর্ণবাদী রাষ্ট্র’ বলেও উল্লেখ করেছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক সহায়তা বন্ধ করার কথাও বলেছেন।

গ্যাভিন নিউসমকে ২০২৮ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এত দিন যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার কোনো বড় দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এভাবে কথা বলবেন, এটা প্রায় অকল্পনীয় ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলপন্থী সবচেয়ে প্রভাবশালী লবিগুলোর একটি হলো আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এইপ্যাক)। দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেস বা সিনেটের নির্বাচনে প্রার্থীরা এইপ্যাকের সমর্থন ও অর্থসহায়তা পাওয়ার জন্য আগ্রহী থাকতেন। কিন্তু সময় বদলাচ্ছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে এইপ্যাকের সমর্থনকে উল্টো নেতিবাচক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি নিউ জার্সির প্রাইমারি নির্বাচনে কংগ্রেসম্যান টম ম্যালিনোস্কি এইপ্যাক থেকে অর্থ নেওয়ার কারণে প্রগতিশীল প্রার্থী অ্যানালিলিয়া মেজিয়ার কাছে পরাজিত হন।

আমার এক বিদেশি বন্ধু আছে, ট্রাম্পের বড় সমর্থক। বাংলাদেশের রাজনীতির খবরও সে সম্ভবত আমার চেয়ে বেশি রাখে। যুদ্ধ নিয়ে আমাদের মাঝেমধ্যে কথা হয়। সে একদিন আমাকে বলল, ‘তুমি তো ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পছন্দ করো না, তাহলে ইরানি নেতাদের প্রতি তোমার সহানুভূতি কেন?’

আরও পড়ুন

আমি কিছু একটা যুক্তি খুঁজে তাকে বলেছিলাম। কিন্তু মনে মনে ভাবছিলাম, ফিলিস্তিনি মানুষের সংগ্রামের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নটাই হয়তো আমাকে এ অবস্থানে নিয়ে আসে। কিন্তু আমার ট্রাম্পপন্থী বন্ধুকে ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকার অধিকারের কথা বোঝানো খুব একটা সহজ নয়। সে আবার প্রশ্ন করল, ‘বাংলাদেশের মানুষ তো এখন একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তাহলে তোমরা কেন খামেনিকে সমর্থন করছ?’

আবারও আমার মনে একই দ্বিধার উত্তর ভেসে উঠল।

আসলে এই দ্বন্দ্ব অনেকের মনেই আছে। তবু বিশ্বের বহু মুসলিম দেশের মানুষের ‘ফিলিস্তিনি আবেগ’ এই যুদ্ধে সহানুভূতির পাল্লা অনেক ক্ষেত্রেই ইরানের দিকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছে।

ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর প্রতিবাদে পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। পুলিশের গুলিতে অন্তত ৩০ জন নিহত হন এবং বহু শহরে কারফিউ জারি করতে হয়। অথচ পাকিস্তানে শিয়া নাগরিকদের বিরুদ্ধে বৈরিতা সুপরিচিত। কয়েক সপ্তাহ আগেই দক্ষিণ ইসলামাবাদের এক শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় ৩২ জন নিহত এবং প্রায় ১৭০ জন আহত হয়েছিলেন। সেই পাকিস্তানই আজ শিয়া নেতা খামেনির হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল।

ইরানের ওপর ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র হামলা বাংলাদেশের মানুষের বিবেককেও নানাভাবে নাড়া দিয়েছে। আবার সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। এই দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের আবেগের সম্পর্ক যেমন আছে, তেমনি অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে আছে গভীরভাবে।

এই যুদ্ধে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। শুধু বাংলাদেশিদের জন্য নয়, সারা বিশ্বের প্রবাসীদের কাছেও এই অঞ্চল ছিল একধরনের নিরাপদ আশ্রয়। যুদ্ধ সেই নিরাপত্তাবোধকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

ফলে সমীকরণ বদলাচ্ছে; শুধু ভূরাজনীতিতে নয়, আমাদের মনোজগতেও। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে দ্বন্দ্ব, প্রশ্ন ও অস্থিরতা।

  • সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    ই-মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব