ইরান যুদ্ধ: মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলের পরিকল্পনা

স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বাসভবনের চত্বরে কালো ধোঁয়া ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখা যাচ্ছে। আজ শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর। তেহরান, ইরান  ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ছবি: রয়টার্স

শনিবার ভোরে তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের প্রথম আঘাত হানার পর ইসরায়েলের অনেক মানুষ এবং কিছু প্রবাসী ইরানি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বহু শীর্ষ ব্যক্তি নিহত হন।

এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে এক ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে। জেনেভা ও ওমানে তখন ইরান ও পশ্চিমাদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। ইরান প্রস্তাব দিয়েছিল, তারা তাদের সব উচ্চমাত্রাসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে কমিয়ে দেওয়ার। যাতে তা আর পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য না থাকে।

এই প্রস্তাবের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেন। ফলে অনেকের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, আলোচনা আসলে শুরু থেকেই একটি প্রহসন ছিল। গত জুনেও একই ধরনের আলোচনা চলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়েছিল।

ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গত এক দশকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইসরায়েল সফর সেই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। গবেষক ও লেখক আজাদ এসার মতে, পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে ইসরায়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র এখন ভারত।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কয়েক মাস ধরে খামেনির গতিবিধি নজরদারি করছিল। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব এক জায়গায় জড়ো হওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় ছিল তারা। শনিবার সেই সুযোগ আসে। পাশাপাশির দুটি ভবনে দুই বৈঠকে শীর্ষ নেতৃত্ব উপস্থিত থাকতেই ইসরায়েল হামলা চালায়।

হামলার পর ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রায় একই ভাষায় ইরানের জনগণকে রাস্তায় নেমে সরকারবিরোধী আন্দোলনের আহ্বান জানান, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি; বরং কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে।

খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর ইরানের মানুষ রাস্তায় বের হলেও তাঁরা প্রতিবাদ করতে নয়, শোক প্রকাশ করতে বের হয়েছিলেন। তেহরানের একবাতান এলাকার কিছু মানুষ নিজেদের বাসা থেকে উল্লাস করেছিলেন। কিন্তু শহরের অন্য অংশে শোনা গেছে কান্না ও আতঙ্কের চিৎকার। আবার অনেকেই ভবিষ্যতের ভয় নিয়ে নীরব ছিলেন।

প্রথম থেকেই স্পষ্ট, এই যুদ্ধ শুধু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নয়। মূল লক্ষ্য শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন। অদ্ভুত বিষয় হলো, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের এই নীতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে এসেছে। ২০২৩ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডেরিতে এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ রাজনীতিবিদদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেবেন।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে দেওয়া এক ভাষণেও ট্রাম্প বলেছিলেন, তথাকথিত ‘ন্যাশন বিল্ডাররা’ যত দেশ গড়েছে, তার চেয়ে বেশি দেশ ধ্বংস করেছে। কিন্তু এখন ট্রাম্প নিজেই উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি বড় যুদ্ধ শুরু করেছেন।

এই যুদ্ধের কারণ হিসেবে ট্রাম্প কখনো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, কখনো ক্ষেপণাস্ত্র, কখনো শাসন পরিবর্তনের কথা বলেছেন। পরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, এই হামলা ছিল প্রতিরোধমূলক। যুক্তরাষ্ট্র জানত, ইসরায়েল হামলা চালাতে যাচ্ছে, তাই আগে থেকেই তারা আঘাত হেনেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি আসলে ইসরায়েলের কৌশলের অনুসারী হয়ে গেছে?

এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, উল্টো তিনিই নাকি ইসরায়েলকে হামলা করতে বাধ্য করেছেন। কিন্তু নেতানিয়াহুর অবস্থান বরাবরই পরিষ্কার। বহু বছর ধরে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে বড় আঘাত হানার পক্ষে ছিলেন। প্রায় চার দশক ধরে তিনি এই দিনের অপেক্ষা করেছেন।

আরও পড়ুন

হামলার লক্ষ্যও ছিল ইরানের সব রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সংস্কারপন্থী, বামপন্থী, সাবেক প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী পর্যন্ত আঘাতের শিকার হয়েছে।

এতে বোঝা যায়, লক্ষ্য শুধু শাসকগোষ্ঠী বদল নয়। লক্ষ্য হলো ইরানকে একটি দুর্বল, বিভক্ত রাষ্ট্রে পরিণত করা।

নেতানিয়াহুর বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে এই লক্ষ্য যুক্ত। ইসরায়েলের বহু নেতার মুখে এখন একটি ধারণা শোনা যায়। তা হলো ‘গ্রেটার ইসরায়েল’।

এই ধারণা অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রভাব মিসরের নীল নদ থেকে ইরাকের ফোরাত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

সম্প্রতি ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরায়েল যদি নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে, তাতেও সমস্যা নেই।

ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইহুদিদের নিরাপদ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে হলে ভূখণ্ড বিস্তৃত হওয়াও গ্রহণযোগ্য।

এই বৃহত্তর কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে ভারত। ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গত এক দশকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইসরায়েল সফর সেই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। গবেষক ও লেখক আজাদ এসার মতে, পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে ইসরায়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্র এখন ভারত।

এই সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়, সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ওপরও দাঁড়িয়ে আছে। ভারত ইতিমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে বিভিন্ন অস্ত্র উৎপাদন করছে। ফলে ভারত ধীরে ধীরে ইসরায়েলি সামরিক শিল্পের একটি বড় উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

এই সহযোগিতা ইসরায়েলের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এতে তারা অস্ত্র উৎপাদন, প্রযুক্তি এবং শ্রমশক্তির ক্ষেত্রে একটি বিকল্প অংশীদার পাচ্ছে। গাজা যুদ্ধের পর বহু ফিলিস্তিনি শ্রমিককে ইসরায়েলে কাজ করতে দেওয়া হয়নি। সেই শূন্যস্থান পূরণে ভারত থেকে শ্রমিক নেওয়ার পরিকল্পনাও হয়েছে। মোদি তাঁর সাম্প্রতিক সফরে আরও প্রায় ৫০ হাজার ভারতীয় শ্রমিক ইসরায়েলে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; অর্থাৎ ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি, বাজার এবং শ্রমশক্তি মিলিয়ে একটি নতুন কৌশলগত জোট গড়ে উঠছে।

এই মিত্রতার লক্ষ্য শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতা নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি প্রচেষ্টা। নেতানিয়াহু মনে করেন, ইরানই এই পরিকল্পনার শেষ বড় বাধা।

ইরান দুর্বল হয়ে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ক্ষমতার কাঠামো তৈরি হতে পারে, যেখানে ইসরায়েল হবে প্রধান সামরিক শক্তি। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলও দ্রুত অস্থির হয়ে উঠেছে।

ইরান ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, দুবাইয়ে হামলা চালিয়েছে এবং সৌদি আরবের বড় তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কাতারের গ্যাস রপ্তানিও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।

এই যুদ্ধ এখন শুধু ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। এখন ইরানের সামনে দুটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে।

একটি হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়বে এবং শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটবে। অন্যটি হলো, ইরান নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে যুদ্ধটিকে একটি সমঝোতায় নিয়ে যাবে।

যদি ইরান ভেঙে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য নতুন অস্থিরতার মুখে পড়বে। লাখ লাখ শরণার্থী ইউরোপের দিকে যেতে পারে এবং অঞ্চলজুড়ে নতুন সংঘাত শুরু হতে পারে। কিন্তু যদি ইরান টিকে থাকে, তাহলে এই যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।

কারণ, তখন স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যার প্রয়োজন ছিল না। এই বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নতুন করে আঁকতে গিয়ে একটি বড় সংঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব।

  • ডেভিড হার্স্ট মিডল ইস্ট আই-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক

    মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত